Search

অনুবাদ সাহিত্যে তাপস গুপ্ত


তাপস গুপ্ত


ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি কবিতার অনুবাদ এবং অনুবাদ সংক্রান্ত দু চার কথা:--



মূল ভাষা জানা থাকলে অনুবাদের প্রয়োজন পড়ে না -- অমিয় দেবে র এই মন্তব্যের সূক্ষ্ম বিচারে মান্যতা লাভ ঘটলেও বলা যায় সাহিত্য রস পিপাসু কৃতি পাঠকের পক্ষেও সব সময় মূল ভাষা জেনেও অভিপ্সিত সাহিত্য পাঠ ও তার রসাস্বাদন অসম্ভব প্রায়।শুধু তাই নয়, এমত ধারা মান্যতা পেলেও বিশ্ব সাহিত্যের আস্বাদ থেকে বঞ্চনা প্রাপ্তি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।এমনকি বিশ্ব বিদ্যালয় গুলির তুলনা মূলক সাহিত্য বিভাগ তাদের জ্ঞান গরিমা ও সৌকর্যে র অধিষ্ঠান ভূমি থেকে সন্দেহাতীত ভাবেই বিচ্যুত হয়।তাই মূল থেকে অনুবাদ হোক অথবা অনুবাদের অনুবাদ হোক রসা শ্রয়ী সাহিত্য প্রেমীর কাছে কবিতার অন্তর্নিহিত ভাবের বিদুৎ গর্ভ হিরণ্ময় ছোঁয়া টিই আসল। সেই মাস্টার মশাই দের মত করে বলা যায়, একটা বিদ্যুৎ গর্ভ পরিস্থিতি বা অভিজ্ঞতা আলোকদৃপ্ত চাবুকের মত আমাদের চিন্তা বা চেতনা কে চকিত করে তুলবে।

প্লেটো সফো ক্লিস পড়তে গেলে গ্রীক ভাষা জানতে হবে, কাফকা,রিলকে, গ্যেটে বা ব্রেখট পড়তে গেলে জার্মান ভাষায় পণ্ডিত হতে হবে, দস্ত ভয়েস্কি, টলস্টয়,পুশকিন, চেকভ, পাস্তের নাক পড়তে গেলে রাশিয়ান ভাষাবিদ হওয়া প্রয়োজন,মুরাকামি বা দ্যুমাস পড়তে গেলে জাপানি বা ফরাসি ভাষা জানা অপরিহার্য, অথবা নেরুদা, মার্কোস বা দক্ষিণ আমেরিকার সাহিত্য পাঠে ল্যাটিন বা স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষই হতে হবে…( আরও অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে)এরকম দাবি শুদ্ধ কাঠামো বাদী কয়েকজন করে থাকলেও সাহিত্য রসিক বিশ্ব সাহিত্যের আগ্রাসী পাঠকের কাছে এ প্রস্তাব বাতুলতা মাত্র।

একটি কবিতা সেটা যে ভাষাতেই রচিত হোক না কেন নিজের অভিজ্ঞতা লব্ধ চেতনায় তা যখন রঞ্জিত ছাপ ফেলে তখন কোনো সৃষ্টি কামী আবেগজাত তাড়না থেকেই এর ' ভাষা বদল ' ঘটিয়ে খুব বড় রকম অপকর্মের দল ভুক্তির মধ্যে পড়বে না সেরকম আশা অথবা দুরাশা মন মৃত্তিকার ক্ষুদ্র অংশে বীজ বপন করে ফেলা খুব একটা অবাস্তব চিত নয়। বলার কথা এই যে,কবিতার সমগ্রতা ভাষা ও চিত্রপুঞ্জের সম্মিলিত ইমপ্যাক্ট মনে মননে ছাপ ফেলে দেয় অবধারিত ভাবেই। এবং যেহেতু এইসব কবিতা অন্য দেশ সমাজ সংস্কৃতি জল হাওয়ায় লালিত তাই তাকে নিজের ভাষায় নিজের মাটিতে নিজের সাধ্য অনুযায়ী রোপণ করার এক দুর্দমনীয় লোভ এবং সাহস অদৃশ্য অথবা দৃশ্যত পরিকল্পিত ভাবেই অনুবাদ কিংবা ভাবানুবাদ এর পথে নিয়ে যেতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা গ্রস্ত হয় না, অন্তত আমার ক্ষেত্রে।

'অন্য দেশের কবিতা ' গ্রন্থের শুরুর দিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যা জানিয়েছিলেন তা এখানে আমার বক্তব্য ও মানসিকতার সঙ্গে যথাযথ পারম্পর্য ও সাযুজ্য রক্ষিত করেছে:


প্রথমেই জানিয়ে রাখতে চাই যে,এই বইতে যাঁরা বিশুদ্ধ কবিতার রস খুঁজতে যাবেন,তাঁদের নিরাশ হবার সম্ভাবনা ই খুব বেশি। এ বইতে কবিতা নেই,আছে অনুবাদ কবিতা।অনুবাদ কবিতা একটা আলাদা জাত, ভুল প্রত্যাশা নিয়ে এর সম্মুখীন হওয়া বিপজ্জনক। অনুবাদ কবিতা সম্পর্কে নানা ব্যক্তির নানা মত আছে,আমি এত গুলির কবিতার অনুবাদক,তবু আমার ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাস, অনুবাদ কবিতার পক্ষে কিছুতেই বিশুদ্ধ কবিতা হওয়া সম্ভব নয়, কখনো হয় নি। কোলরিজ বলেছিলেন, একটি কবিতার সে টুকুই বিশুদ্ধ কবিতা, যার অনুবাদ সম্ভব নয়।-- সেই বিশুদ্ধ ব্যাপারটি কি তা বুঝতে হলে, আর একটি বিশুদ্ধ কবিতা পড়তে হবে, আজ পর্যন্ত কোনো সমালোচক তার বর্ণনা করতে পারেন নি। কবিতার সংজ্ঞা , ব্রহ্মের মতন, অনুচ্ছিষ্ট। সংজ্ঞা না হোক,এই সরল সত্য টি সর্ব বিদিত যে,কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য তার শব্দ ব্যবহার, বিংশ শতাব্দীর কবিতা সঙ্গীতের প্রভাব কাটিয়ে শব্দের গভীর অর্থের প্রতিই বেশী মনোযোগী,এবং এক ভাষার শব্দ চরিত্র অপর ভাষায় হুবহু প্রকাশ করা একেবারে অসম্ভব।




গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল( 1889-- 1957)


দক্ষিণ আমেরিকার চিলির কবি গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল।তিন বছর বয়সে কবির বাবা তাঁদের ছেড়ে চলে যান। পনেরো বছর বয়সে তিনি পড়ানো শুরু করেন স্হানীয় একটি স্কুলে। কয়েক বছর পর তিনি এক যুবকের প্রেমে পড়েন। কিছুদিন পরে যুবক টি আত্মহত্যা করে। মহিলা আর বিয়ে করেন নি। সাহিত্য চর্চাকেই জীবনে বেছে নিয়েছিলেন তিনি ।পরবর্তীকালে তাঁর কবিতা লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে যুগান্তকারী স্হান নেয়। তাঁর মৃত্যুর পর চিলিতে তিন দিন রাস্ট্রীয় শোক পালন করা হয়েছিল। তাঁর কয়েকটি কবিতা অনুবাদ করেছি। তাঁর পাইন ফরেস্টকবিতা টি পড়ার সময় রবীন্দ্রনাথের "বলাই" গল্প টি মনে পড়ে যাচ্ছিল । যেখানে গাছ গুলি কে বলাই -এর মনে হত পুরনো দিনের ঠাকুর্দা যেন ।



Pine Forest

Let us go now into the forest.

Trees will pass by your face,

and I will stop and offer you to them,

but they cannot bend down.

The night watches over its creatures,

except for the pine trees that never change:

the old wounded springs that spring

blessed gum, eternal afternoons.

If they could, the trees would lift you

and carry you from valley to valley,

and you would pass from arm to arm,

a child running

from father to father


পাইন ফরেস্ট

গাব্রিয়েলা মিস্ত্রেল (1889...1957)


এসো ছুঁয়ে আসি উপত্যকার পাইন অরন্যানী

গাছের গন্ধ ছুঁয়ে যায় আমার শহুরে মুখখানি

নীচু হয়ে তুলে নাও আমায়, জানাই বিনত মিনতি

সাড়া দিলে না পাইন, খুব কি করেছি ক্ষতি ?

রাতের জ্যোত্স্না খেলা করে পাইন জুড়ে

চঞ্চল রাতের আলোয় পাইন শুধু স্থানু হয়ে থাকে

বসন্তের হাওয়া বয়ে আনে আহত প্রেমের ক্ষত

গোধূলির আশীর্বাদে অস্তরাগ থাকে শাশ্বত।

যদি পারা যেত পাইনের মাথায় চড়ে

উড়ে যেতে পাহাড় থেকে পাহাড়ে

অধরা উপত্যকায় অচেনা সবুজ গালিচায়

শিশু যেভাবে কোলে ফেরে বারবার

পিতা থেকে পিতামহ , প্রপিতামহের কোশ, মেদ,রক্ত,অনুচক্রিকায়।





The Tellers of Tales


When I am walking,evrything

On earth gets up

And stops me and Whispers to me

And what they tell me is their story.


And the people walking

On the road leave me their staries,

Pick them up where they fell

Cocoons of silken thread.


Stories run through my body

On sit purring in my lap.

So many they take my breath away,

Buzzing,boiling, humming.

Uncalled they come to me,

And told,they still won't leave me.



গল্পওলার গল্প

গাব্রিয়েলা মিস্ত্রেল


আমার চারণায় বসুন্ধরা জেগে ওঠে

থেমে থেমে ফিসফিসিয়ে গল্প শোনায় কম্পিত ঠোঁটে

চলমান মানুষের বিরামহীন গতি

শুধু কাহিনি রয়ে যায় নিঃসঙ্গ ধূলায়

রেশমি সুতোয় গেঁথে কথামালায়

গুটি থেকে রূপ পায় রূপকথা প্রজাপতি ।

ধমনি শিরায় বাহিত রক্তস্রোতে

গল্পওলা হারায় ঘুমন্ত চেতনায়

জ্বলন্ত অথবা দহিত ঘূর্ণিতে

গল্প পাক খায় নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে

অজানা অনু-পরমাণুকত কাহিনি-কথন

কোলের বালিশে শুয়ে করে রাত্রিযাপন।







চকিতের দেখা, অনুভূতি অথবা কোনো অভিজ্ঞতা, দর্শন মননের জারণ বিজারণ এ আমাদের ঋদ্ধ করে। এই লব্ধ অভিজ্ঞতা আমাদের সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে আমাদের চেতনায় সঞ্চিত হয়ে যায়। জীবনকে উপলব্ধি করার এই প্রবণতা নেশার মত। উপলব্ধি জাত এই অভিজ্ঞতা হল কথকের সঞ্চয়,তার ভান্ডার,তার গল্পের লুকোনো খনি। এ হল গল্পকারের গল্প--- "the teller of tales "-- একটি কবিতা। গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল এর এই কবিতাটি আমাদের রক্ত অণুতে বাসা বেঁধে থাকা গল্পপ্রিয় আদিম মানুষ টিকে নতুন করে চিনিয়ে দেয় আবার। কি করে সামলানো যাবে এই কবিতা বীজ কে নিজের মাটিতে রোপিত করার দুর্দম লোভ!



Give Me Your Hand

Give me your hand and give me your love,

give me your hand and dance with me.

A single flower, and nothing more,

a single flower is all we’ll be.


Keeping time in the dance together,

you’ll be singing the song with me.

Grass in the wind, and nothing more,

grass in the wind is all we’ll be.


I’m called Hope and you’re called Rose:

but losing our names we’ll both go free,

a dance on the hills, and nothing more,

a dance on the hills is all we’ll be.


. . . . . . . .

হাতে হাত দাও (give me your hand)


এই হাতে হাত দাও

দেখো ভালোবাসা আছে,

ভালোবাসা ছুঁড়ে দিলে পাবে বাহুলতায়

সাড়া বুঝি তালে তালে নৃত্যের বন্দনায়।

একটি ফুলে সুরভি হয়ত ফিকে মনে হয়

চেপে ধরো তাকে শত ভাগ

তখন শর্ত হীন সব কথা বলে যায়,

হাওয়ায় দোলে ছোট্ট ঘাসের ডগা

পলকের ছবিতে মুহূর্ত পড়ে ধরা

গান বাঁধা গোলাপী আশায়

দ্যাখো স্বপ্ন বাস্তব হল আয়নায়,

পাহাড়ের কোলে নিজেকে

ছুঁড়ে দাও অক্লেশে,

বুকে টেনে নেবে নিমেষে

যত্নে ভালোবেসে।



তাপস গুপ্ত


70 views0 comments