Search

অল্প কথার গল্পে সম্রাট দে


রীচ-ডাউন



  সম্রাট দে 



          স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও 'শেষের কবিতা'য় অমিতের বকলমে বসাতে ভোলেননি "... আমরা দু'জন চলতি হাওয়ার পন্থী "। সত্যিই তো পরিবর্তনের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে না-নেওয়ার মধ্যে তেমন কোনও বাহাদুরি কি আদৌ আছে! পাল্টে যাওয়াটা ইচ্ছের বিরুদ্ধে হোক বা ইচ্ছে অনুযায়ী , সময়ের সাথে এই পরিবর্তন কিন্তু অনায়াসে একটু একটু করে ঘিরেই ধরে নিত্যযাপনের চালচিত্র। এসব এক্কেবারে ভাবায় না যে সৃজনকে তা নয় ! তবে সৃজন কস্মিনকালেও এসব ভাবনার কূল ছুঁতে পারেনি শেষমেশ।


          বড়ই সাদামাটা দিনযাপন তার, এসেসসি'র তালিকায় আটকে রয়েছে পদবীসহ সৃজন দত্ত। সৃজনের পরিচয় বলতে,এর চাইতে বেশি তেমন কিছু নেই বললেই চলে। নিজের পরিচয় দিতে বাবার নাম আর বাড়ির ঠিকানার বেশি বলতেও চায় না সে কখনো! বরাবরই আঁকতে ভালবাসে, তাই পরিবর্তনশীল জীবনের বর্তমান সামজিক মাধ্যমের ফেসবুক'য়ে মাঝেমধ্যেই নিজের হাতে-আঁকা ছবি পোস্ট ক'রে মন্তব্য কুড়োতেও মন্দ লাগে না। 'রীচ'ও একেবারে খারাপ নয় তার । 'কর্ম' বলতে বাড়ির ফরমায়েশি কাজগুলোর সাথে গুটিক'য়েক টিউশন ব্যাচ্, ব্যস ! হতভাগা লক-ডাউনে দু'য়েরই সুযোগ কমে যাওয়ায় দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যও ইদানীং কমেছে অনেকটা । তাই আজকালকার ভার্চুয়াল যোগাযোগ খানিকটা বেশি সময়  কেড়ে নিলেও, সৃজনের 'দশের জন্য ভাবা'র ক্ষেত্রে ছেদ পড়েনি মোটেই। ছেলেবেলা থেকেই কারো জন্য কিছু করতে পেরে, অদ্ভুত একটা আনন্দ পায়। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর থেকে সমভাবনায় ভাবাতেও পেরেছে জনাক'য়েক বন্ধুকে। মূল পরিকল্পক সৃজন হ'লেও যেকোনও 'মিশ্যন'-এ একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা সকলে মিলে।


          তবে এধরণের কর্মকাণ্ডের 'পোস্ট' অবশ্য সৃজন কোনোদিন নিজের ওয়্যল'য়ে সাঁটতে পছন্দ করে না। নিজের আঁকা ছবি আর মাঝেমধ্যে বন্ধু বা পরিজনদের নিয়ে আনন্দঘন মুহূর্তের কিছু ছবি 'আপলোড' করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ তার ফেসবুকের জগৎ। এইতো কিছুদিন আগেও বুদ্ধপূর্ণিমায় গৌতমবুদ্ধের আদল কাজে লাগিয়ে লক-ডাউনের বীভৎসতা মিশিয়ে দুর্দান্ত একটা কম্পোজ '216 শেয়ার' 2.1k 'রিঅ্যাকশ্যন-প্রাপ্তি' কম আনন্দ তো দেয়নি! সাথে 'কমেন্টবক্স' থেকে প্রাপ্ত উৎসাহ, প্রশংসাও তো আনন্দ দেয়ই! 


         তেমনই দিন পাঁচেক আগের 'যন্ত্রমানব' ক্যাপশনের আঁকাটিও 1.5k 'রিঅ্যাকশন'. দু'দিনেই শ'আষ্টেক 'কমেন্ট'। গত পরশু একটা আবেদনমূলক লেখা পোস্ট করেছিল সাথে সংশ্লিষ্ট ফোন নম্বর , 'ইয়াশ' কবলিত এলাকায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশে। যাতে নিজেদের সম্মিলিত এবং সংগৃহীত তহবিলে আরও কিছু সুহৃদ এগিয়ে এসে হাত মেলাতে পারে । এমনও বহু মানুষ রয়েছেন যারা বিভিন্ন কারণে বা ব্যস্ততায় সরাসরি না গিয়েও কারো মাধ্যমে এগিয়ে এসে  অন্যের প্রয়োজনে প্রকৃতই চান সাধ্যমতো সাহায্য করতে। সৃজনকে ওর ফেসবুকের 'রীচ' দেখে রজতই পরামর্শ দিয়েছিল সেরকম পোস্ট করবার বিষয়ে । ক্লাস থ্রি' থেকে সহপাঠী রজতের বহু পরামর্শই এযাবৎ শুনে এসেছে সৃজন। তাছাড়া কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ানোয় রজতের আধুনিক ও সামাজিক চিন্তাধারাকে বেশ সমীহ ক'রেও চলে সে।


          আর কিছুক্ষণ পরে রাত আটটায় তাদের নির্দিষ্ট কর্মকান্ড নিয়েই রজত, তপেশ আর পরাগের সাথে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা। সেই কন্ফারেন্স-কলই এখন অপেক্ষা করাচ্ছে সৃজনকে। অপেক্ষা করতে করতেই কেমনভাবে যেন আবারও সেই পোস্ট নিয়েই ভাবনায় ডুবে গিয়েছে সৃজন... পরশু রাতের সেই 'পোস্ট'য়ে কাল রাত ১১টা পর্যন্ত, চব্বিশ ঘন্টায় ৩১টা 'লাইক' 'থাম্ব-রেইজ') আর তিনটে 'কমেন্ট'য়ে, যাবার দিন জিজ্ঞাসা , কী করা উচিৎ আর সতর্কবার্তা ছাড়া বাড়তি কিচ্ছুটি নেই। আজ সন্ধে পর্যন্ত যোগ হয়েছে আরও ৭টা 'থাম্ব-রেইজ'। নো শেয়ারিং টিল নাউ! অবাক কান্ড ! যার আঁকাতে কমপক্ষে চার-পাঁচ'শ 'লাইক', ফটোতেও শ'তিন-চারেক, তার কিনা এই আবেদনের পোস্ট'য়ে মাত্র আটত্রিশ! তবে কি হঠাৎ ক'রেই কোনো কারণবশতঃ প্রকৃতই 'রীচ-ডাউন' নাকি অধিকাংশের দেখেও না-দেখার মতো করে নেহাতই 'ইগনোরেন্স'! সৃজনের মাথায় এসবই ঘুরপাক খেয়ে চলেছে অনবরত। এর মাঝেই হঠাৎ ক'রে, হয়তোবা নির্ধারিত সময়েই স্মার্টফোনে ভেসে ওঠে 'রজত কলিং' আর বেজে ওঠে, বহুদিন ধ'রেই না-পাল্টানো রিংটোন'য়ে "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে" গানটির 'ইনস্ট্রুমেন্টাল...

106 views0 comments