Search

অল্পে গল্পে সৌম্য ঘোষ


রত্নগর্ভা

সৌম্য ঘোষ

রত্নার শরীরটা ইদানিং ভালো যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে যায়। শারীরিক অসুস্থতা থেকেও তাঁর মানসিক কষ্ট তাঁকে অনেক বেশি পীড়িত করে । একটা ক্রনিক অবসাদের মধ্যে ক্রমশঃ যেন অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। চোখের দৃষ্টিতে বেঁচে থাকার জ্যোতি ক্রমশঃ নিবে আসছে ।

অনিন্দ্য তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার কোনো ত্রুটি রাখেনি । অনেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখিয়েও রত্নাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করতে পারছে না ।

অসুস্থ রত্না ক্লান্ত বিষণ্ণতায় স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন, "হ্যাঁগো খোকাকে ফোন করেছিলে ? "

অনিন্দ্যর নির্লিপ্ত জবাব -- " করেছিলাম!"

প্রবল উৎসাহে রত্নার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে, " কি বললো খোকা ?"

-- " বলল সে এখন আসতে পারবে না। তার অফিসে এখন প্রবল কাজের চাপ । সামনে একটি প্রমোশনের সুযোগ আছে। এই মুহূর্তে তার পক্ষে দেশে আসা সম্ভব না । কয়েক লক্ষ টাকার ইন্সেন্টিভ হাতছাড়া হয়ে যাবে ।"

একটা চাপা দীর্ঘনিঃশ্বাস রত্নার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো । চোখের কোন দুটো চিকচিক করে উঠলো ।


'খোকা' ওরফে সুমন্ত। অনিন্দ্য ও রত্নার একমাত্র সন্তান । ছোটবেলা থেকেই সুমন্ত পড়াশোনায় খুব মেধাবী ছাত্র । ছাত্রজীবনে বরাবরই সে প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল । সুমন্তকে নিয়ে তার বাবা-মার দুচোখ ভরা স্বপ্ন । একমাত্র ছেলেকে মানুষের মত মানুষ করার সমস্ত শিক্ষা, সংস্কৃতি তাঁরা দিয়েছিলো । ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করার জন্য তাঁরা নিজেদের জীবনে ত্যাগ ও কঠিন সংগ্রামে পিছপা হয়নি । একদিন তাঁদের ছেলে মানুষ হয়ে তাঁদের সমস্ত দুঃখ কষ্ট দূর করে দেবে।

অনিন্দ্য একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করে । সৎ-নির্বিবাদী মানুষ বলেই সমাজে পরিচিত। রত্না একজন আদর্শ ঘরনী ও মা। অনিন্দ্যও মা অন্তপ্রাণ। মায়ের কাছেই তার যত আব্দার, অনুযোগ । উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্তও খোকা তার মায়ের পাশে, মায়ের কোলে ঘুমোতে । খোকা অনেক রাত জেগে পড়াশোনা করত, রত্না চুপ করে জেগে বসে থাকতো ।

ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করতে গিয়ে অনিন্দ্য প্রায় সর্বস্বান্ত । রত্নার গয়নাগুলো পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে । বাবা-মায়ের এই আত্মত্যাগের কথা সুমন্ত সবই জানে । সে জানে তার বাবা-মা কিভাবে তার লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছে । নিজেরা কত কষ্টের মধ্যে থেকে ছেলেকে মানুষ করার নিরন্তর প্রয়াস করে গেছে। ‌ মধ্যবিত্ত পরিবার । স্বপ্ন টুকুই সম্বল। মেধাবী ছেলেকে সম্বল করে তাঁদের দুচোখে একরাশ সুখের স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন সফল করার জন্য তাঁরা তাঁদের বর্তমানকে ছেলের জন্য খরচ করে দিয়েছে। এসব কথা সুমন্তর না জানা নয় । সে মেধাবী এবং বুদ্ধিমান । তাই বাবা মায়ের অনন্ত ত্যাগের কথা, সে সবই জানে । বোঝে।


শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সুমন্ত এখন একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে যোগ দিয়েছে। । অনিন্দ্য র ইচ্ছা বাড়িটা একটু মেরামত করে সুন্দর করে তোলা । রত্নার মনে ইচ্ছা, একটা মনের মত ফুটফুটে বউমা এনে, তার হাতে সংসারের চাবি তুলে দিয়ে, সে বিশ্রাম নেবে। ‌ কিন্তু সুমন্ত স্পষ্টতই বলে দিয়েছে, তার এখন বিয়ে করার ইচ্ছা নেই । মত নেই। সে তার কেরিয়ারকে আরো প্রতিষ্ঠা করতে চায় । আরো বড় হতে চায় ।


সকাল থেকেই রত্নার মনটা ভার হয়ে আছে। অনিন্দ্য সুমন্ত দুজনেই খুব ব্যস্ত । সুমন্ত নিউ মার্কেট থেকে বড় মাপের দুটি ট্রলি সুটকেস কিনে এনেছে । সকাল থেকেই সে তার স্যুটকেসে জামা কাপড়, কাগজপত্র সবকিছু গুছাতে ব্যস্ত । অনিন্দ্য যথাসম্ভব ছেলেকে সাহায্য করছে । বাড়ির পরিবেশ থমথমে । রত্নার মুখে কোন কথা নেই । সে প্রাণহীন যন্ত্রের মতন রান্নাঘরে কাজ করে যাচ্ছে ।

ছেলে আজ আমেরিকা চলে যাচ্ছে তার নতুন চাকরিতে যোগ দিতে । ছেলে আমেরিকা চলে যাক এটা রত্না মন থেকে মেনে নিতে পারছিল না । সে চেয়েছিল তাঁদের ছেলে দেশে থাকুক। দেশের বড় কোম্পানিতে চাকরি করুক । অনিন্দ্য আজ নির্বাক যন্ত্র ।


* * * *


দশ বছর হয়ে গেছে সুমন্ত আমেরিকায় চাকরি করছে । প্রথম প্রথম ওদেশে গিয়ে তেমন সুবিধা করে উঠতে পারেনি । এক-দেড় বছর খুব কষ্টে কেটেছে তার। কিন্তু মেধা ও আত্মবিশ্বাস সম্বল করে সে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে ভালো চাকরির সন্ধান করে গিয়েছে। তার সুফলও সে পেয়েছে । সুমন্ত এখন একটি ভালো কোম্পানিতে চাকরি করে । পায়ের নিচে শক্ত মাটি পেয়ে গেছে।

বছরে একবার সে দেশে আসে বাবা-মায়ের কাছে।

পাড়াপড়শিদের কাছে অনিন্দ্যর খুব সুখ্যাতি। সবাই তাঁকে সম্মান দেয় । তাঁর ছেলে আমেরিকায় বড় কোম্পানিতে চাকরি করে , তাই তাঁর খাতিরেও বেড়ে গেছে। পাড়ার লোকেরা রত্নাকে 'রত্নগর্ভা' বলে থাকে।

প্রথম দিকে কয়েক বছর সুমন্ত ফিবছর একবার বাড়ি আসতো ‌। বাবা-মার খোঁজ রাখতো।

চাকরির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যস্ততা বেড়ে যেতে গেল । তাই ইদানিং কয়েক বছর হল সে আর দেশে আসেনা। কদাচিৎ চিঠি লিখে বাবা-মার খোঁজ খবর নেয় । মাঝেমধ্যে জানতে চায় , বাবার টাকার দরকার আছে কিনা ! শুধু একবার সে নিজে থেকেই টাকা পাঠিয়েছিল । কিন্তু রত্না এভাবে ভিক্ষা নিতে চায় না । সে তাঁর ছেলেকে ফিরে পেতে চায়, টাকা নয় । শয্যাশায়ী রত্না পাশ ফিরে শুয়ে আপন মনে বলে,

"তিল তিল করে ঘাম রক্ত ঝরিয়ে ছেলেকে মানুষ করে কি পেলাম! "

অনিন্দ্য জবাব দেয় --- " কেন লোকের প্রশংসা ! লোকে বলে আমি কৃতি সন্তানের বাবা, আর তুমি রত্নগর্ভা । "

রত্না কথা বাড়ায় না । আনমনে ভাবে , কাগজের ফুল ফুলদানিতে রাখলে ঘরের শোভা বাড়ে ঠিকই কিন্তু সৌরভ ছড়ায় না। পুরান কথায় সে শুনেছিল,

পুত্ নামক নরক থেকে পিতা-মাতাকে উদ্ধার করতে মানুষ পুত্র সন্তান কামনা করে ।

তাহলে ........

রত্না আর ভাবতে পারে না। ‌ চোখের কোন দিয়ে তাঁর জল গড়িয়ে পড়ে।


অনিন্দ্য বুঝতে পারে রত্নার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ক্রমশঃ খারাপের দিকেই যাচ্ছে । এখান থেকে চিকিৎসা করিয়ে রত্নার কোন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না । সে ঠিক করল যেভাবেই হোক রত্নাকে নিয়ে দক্ষিণ ভারতে নিয়ে যাবে চিকিৎসা করানোর জন্য । কিন্তু তাতেও তো অনেক খরচ । এতগুলো টাকা সে কোথা থেকে জোগাড় করবে । একদিকে রত্নার ক্রমশঃ শারীরিক অবনতির লক্ষণ, অন্যদিকে আর্থিক সমস্যা অনিন্দ্যকে নাগপাশে জড়িয়ে ফেলেছে । এই নাগপাশ থেকে সে কিছুতেই বেরোতে পারছেনা । বন্ধু সুহৃদরা পরামর্শ দেয়, ছেলেকে ফোন করো । ছেলের কাছ থেকে টাকা চাও । কিন্তু অনিন্দ্য সে তাঁর আত্মাকে অপমান করতে চায় না । যে ছেলে অসুস্থ মা'র খোঁজটুকু রাখার সময় পায়না , তার কাছে হাত পেতে টাকা চাওয়ার চাইতে বড় অবমাননা আর কিছুতে হয় না । সে ঠিক করে নেয়, একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁকে নিতে হবে । তাঁর শেষ সম্বল এই বাড়িটি । তাই এই বাড়িটি সে বিক্রি করে দেবে । সেই টাকা দিয়ে সে দক্ষিণ ভারতে গিয়ে রত্নার চিকিৎসা করাবে । সেইমত সে বাড়িটি বিক্রি করার তোড়জোড় শুরু করলো । সেইসঙ্গে দক্ষিণ ভারতে যাওয়ার সমস্ত সুলুক সন্ধান নিতে লাগলো।


দুজন মানুষ । তাই তাঁরা বেশি রাত করে না। তাড়াতাড়ি খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়ে । আজও তাড়াতাড়ি খাওয়ার পর অনিন্দ্য রত্নার ওষুধগুলো এক এক করে খাইয়ে দেয় । এটি তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস । কেননা অবসাদে আক্রান্ত রত্না ঠিক সময় মতো ওষুধ খায় না । তাই অনিন্দ্য কোন রিক্স নেয় না । নিজের হাতে ওষুধ খাইয়ে দেয় স্ত্রীকে। রত্না ঘুমিয়ে পড়েছে দেখে অনিন্দ্য বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ায় । পুরনো দিনের সব কথাগুলো যেন একে একে শিউলি ফুলের মত তাঁর ওপর ঝরে পড়ছে । সেই ফুলের সুঘ্রাণ সে অনুভব করে । আলোকবর্তিকার প্রভা সারা আকাশ জুড়ে। নিরুচ্চারিত নিস্তব্ধ প্রকৃতি। যেন অনিন্দ্যকে বরণ করে নিচ্ছে । সাদা মেঘের দল শ্বেত পরীর মতো সারা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । আর ফাজিল চাঁদটা তাদের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে অনিন্দ্যের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে ।

ঘরে এসে সে দেখল রত্না ঘুমোচ্ছে । স্ত্রীর মাথায় কপালে হাত বুলিয়ে সে শুয়ে পড়ে।



আজ যেন খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে রত্নার কাছে । আজ তাঁর খোকা আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে আসছে মায়ের কাছে । রত্না তাঁর সমস্ত

অসুখের কথা ভুলে যায় । তাঁর যে কোনো দিন অসুখ হয়েছিল সেটাই যেন সে বিশ্বাস করতে চায় না । সকাল থেকে সে রান্নাঘরে ব্যস্ত । ছেলের জন্য নানান রকম পদের রান্না করছে। কি সুন্দর এক উজ্জ্বল নরম আলো তাঁর চারপাশ ঘিরে রয়েছে । আতরের সুগন্ধে চারিদিকে ম ম করছে ।

এত খুশি এত আনন্দ সে যেন আগে কখনো পায়নি। হ্যাঁ, তাঁর জীবনে এমন এক আনন্দ এসেছিল যখন খোকা তাঁর কোলে এলো । সেই সুখানুভূতি আবার যেন সে ফিরে পেল । শুনতে পায় দূর থেকে রবীন্দ্র সংগীতের গান ভেসে আসছে । রত্নাও গুন গুন করে সুর তুলছে । কতদিন পর সে আবার গান গাইলো !


নিত্য অভ্যাস মত অনিন্দ্য ভোর বেলায় ঘুম থেকে ওঠে । তারপর বাড়ির টুকটাক কাজ সেরে রত্নাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে । চা করে। দুজনে একসঙ্গে চা খায়। সেইমতো আজও ঘুম থেকে উঠে সে বাড়ির ছোটখাটো কাজ সেরে রত্নাকে ডাকে । অন্যদিন রাতে একবার না একবার রত্নার ঘুম ভাঙ্গে। গতকাল রত্না সুন্দর ঘুমিয়েছে । একবারের জন্য ওঠেনি । অনিন্দ্য রত্নাকে ডাকে ওঠার জন্য। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পরও রত্নার ঘুম ভাঙ্গে না। নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে। মুখে হালকা খুশির পরশ লেগে আছে যেন । এবার অনিন্দ্য একটু অসহায় উৎকণ্ঠার মধ্যে জোরে জোরে ডাকতে লাগল : রত্না" , রত্না" !


না, রত্নার আর ঘুম ভাঙেনি । সে চিরঘুমের দেশে, না ফেরার দেশে চলে গিয়েছে। তাঁর মুখে এখনো শেষরাতের শেষ স্বপ্নের আবেশ মাখা।


প্রতিবেশী ও সুহৃদদের সহযোগিতায় সমস্ত শেষপর্ব সমাধা করে অনিন্দ্য তাঁর ছেলেকে চিঠি লিখল -------


স্নেহের সুমন্ত,


তোমার মা ....... তারিখে অমৃতালোকে গমন করেছেন । সন্তান হিসেবে তোমার জানার অধিকার আছে , তাই তোমাকে মৃত্যু সংবাদটা জানালাম । অসুস্থ অবস্থায় জীবনের শেষ দিন গুলিতে তিনি বারবার তোমাকে দেখতে চেয়েছিলেন ।

ভালো থেকো। তোমার আরো উন্নতি হোক।


ইতি

বাবা ।




দীর্ঘ দু'মাস পর অনিন্দ্য আমেরিকা থেকে ছেলের চিঠি পেল ------


শ্রীচরণেষু বাবা,

তোমার চিঠিতে মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেলাম । এক দিক দিয়ে ভালোই হয়েছে । যা ভুগছিল, মরে গিয়ে তোমাকে ঝামেলা‌ থেকে বাঁচিয়ে দিল .................. .... ‌‌"

ইতি

সুমন্ত।"


নীরব , নিস্তব্ধ, নির্বিকার অনিন্দ্য ছেলের চিঠি হাতে নিয়ে অবশ হয়ে যায় , তাঁর সব হারানো চোখ অলসভাবে সামনের দেয়ালে আটকে যায় । পুরানো ফটো ফ্রেম । পুত্রগর্বে গর্বিত রত্না একবছরের শিশু সুমন্তকে কোলে নিয়ে উজ্জ্বল একঝাঁক খুশির স্মৃতি ।।


8 views0 comments