Search

কিশোরবেলার রূপকথায় গোবিন্দ মোদক


জয় রাজা জয়বর্ধনের জয় !!

গোবিন্দ মোদক



                                  (এক) 



        রাজ্যের নাম বীরভূমি। সেখানকার রাজা হলেন জয়বর্ধন। রাজ্যের রাজধানী জয়পুরী যেমন সুন্দর তেমনই সমৃদ্ধ। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, লোক-লস্কর, সৈন্য-সামন্ত, রাজকোষে অফুরান ঐশ্বর্য নিয়ে জয়পুরী আপন গর্বে গরীয়ান। রাজা তাঁর রাজ্য, লোকজন ও প্রজাদের নিয়ে যেমন সুখী, তেমনই প্রজারাও তাঁর রাজ্যে বাস করে মহাখুশি। মহারানী চন্দ্রাবতী আর পুত্র  রূপকুমারকে নিয়ে রাজার দিন কাটছিল মহাসুখে। 


         একদিন রাজা জয়বর্ধন শিকারে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সেই মতো ব্যবস্থা হলো। রাজ্যের উত্তর-পূর্ব দিকের পাহাড়-পর্বত বনভূমিতে ভরা দুর্গম অরণ্যে তিনি গেলেন শিকার করতে। গা ছমছম করা গভীর অরণ্যের নির্বাক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেন তিনি। সপ্তাহ-খানেক ধরে এ-বনে, সে-বনে শিকার সেরে তিনি অবশেষে ফেরবার পথ ধরলেন। পথ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে --- এমন সময় তাঁর কানে এলো নারীকন্ঠের আর্তনাদ ! রাজা সঙ্গে সঙ্গে সেই দিকে ঘোড়া  ছোটালেন। গিয়ে দেখলেন এক অসামান্য রূপবতী নারী প্রাণ ভয়ে ভীত হয়ে চিৎকার করছে --- আর তার সামনেই প্রকাণ্ড একখানা বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত ! কালবিলম্ব না করে রাজা ধনুকে তীর সংযোজনা করলেন। জ্যা-মুক্ত তীর বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গিয়ে বাঘকে বিদ্ধ করলো। ভয়ঙ্কর একটা গর্জনের শব্দ কানে আসতেই রাজা চোখ বুঁজলেন। চোখ খুলতেই অবাক কান্ড --- বাঘ অদৃশ্য হয়েছে ! রাজা এবারে অসামান্যা সেই সুন্দরীর হাত ধরে তুলে বললেন, -- আর ভয় নেই ! কিন্তু এই দুর্গম অরণ্যে তুমি একাকী ! কে তুমি ?



         --- মহারাজ, আমি ব্রহ্মগড়ের রাজকন্যা সুগন্ধা। পথ হারিয়ে এখানে চলে এসেছি। আপনি আমাকে বাঁচালেন। কিন্তু মহারাজ আমি অবিবাহিতা, কুমারী ! আমাদের বংশের নিয়ম হলো কোনও কুমারী কন্যার কেউ হাত ধরলে তাঁকেই বিয়ে করতে হবে। কাজেই .....!


         রাজা পড়লেন মহা মুশকিলে ! এদিকে তাঁর প্রাসাদে রাণী চন্দ্রাবতী, পুত্র রূপকুমার রয়েছে, অথচ ....!


         --- মহারাজ ! মায়াবিনীর ছলনায় ভুলবেন না ! এ নিশ্চয়ই মায়াবী কন্যা ! বাঘটাও মায়াবাঘ, নইলে মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয় কি করে ! মহারাজ, কন্যার হাত ছাড়ুন ! ফিরে চলুন !  নইলে সমূহ বিপদ ! মহামন্ত্রী বললেন ।  


         --- মহারাজ, আমি অবলা রাজকন্যা ! আমাকে বিপদের মুখে ফেলে যাবেন না ! তাছাড়া আপনি আমার হাত ধরেছেন ! আমাদের ধর্মমতে আপনি আমার স্বামী --- আমার আর দ্বিতীয় বিবাহ হতে পারে না মহারাজ !


         --- কিন্তু আমি যে বিবাহিত ! দশ বছরের পুত্র বর্তমান !


         --- তাতে কি হয়েছে মহারাজ ! আপনি সুদর্শন পুরুষ ! তাছাড়া রাজাদের একাধিক রাণী তো থাকতেই পারে ! 


         শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীর নানা অনুনয়-বিনয় অগ্রাহ্য করেও জয়বর্ধন সুগন্ধাকে নিয়ে ফিরতে লাগলেন। মন্ত্রীকে বললেন, "বিপন্ন কোনও নারীকে রক্ষা করা রাজার কর্তব্য !" সেই কর্তব্যের তাগিদেই তিনি সুগন্ধাকে বিবাহ করলেন। শুরু হলো আর এক অধ্যায় !



                                                (দুই) 



           সুগন্ধার সঙ্গে মহারাজের বিবাহের পর বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে। রাণী চন্দ্রাবতী ও সুগন্ধার মধ্যে ভাব-সাব হয়েছে। রূপকুমারও আর এক নতুন মা পেয়ে মহাখুশি। এমতাবস্থায় সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিলো। হঠাৎই ছন্দ-পতন ঘটলো ! ঘোড়াশাল থেকে একটি ঘোড়ার হঠাৎই অন্তর্ধান ঘটলো ! বহু খুঁজেও ঘোড়াটি পাওয়া গেল না !


           তারপর আর একদিন আর একটি ঘোড়া উধাও হলো। এভাবে একের পর এক ঘোড়া, হাতি উধাও হতে লাগলো। আস্তাবলের রক্ষককে একদিন খুঁজে পাওয়া গেল না। অবশেষে কয়েকদিন পর তার রক্তমাখা জামাকাপড় ও হাড়গোড় পাওয়া গেল রাজধানীর বাইরে পরিত্যক্ত এক ভগ্নস্তূপে। কয়েকটি ঘোড়ার দেহাবশেষও পাওয়া গেল তারই অনতিদূরে --- কে বা কারা যেন খুবলে খুবলে খেয়েছে ঘোড়াগুলিকে ! খবর পেয়ে রাজা চিন্তিত হয়ে উঠলেন। রাজ্যের প্রজাদের মধ্যেও ভয়ের সঞ্চার ঘটলো ! রাজা এ বিষয়ে তদন্তের জন্য গোয়েন্দা ও গুপ্তচর নিয়োগ করলেন।



           গোয়েন্দা কয়েকদিন পরে যে তথ্য পেশ করলো তাতে তো রাজার চোখ কপালে উঠলো প্রায় ! গোয়েন্দা নাকি দেখেছে রাজার অন্তরমহল থেকে এক ভীষণ-দর্শনা রাক্ষসী বের হয়ে এসে রাজধানীর পশ্চিম দ্বারের দ্বাররক্ষককে ভক্ষণ করে ফেলেছে ! রাজা খোঁজ নিয়ে দেখলেন গোয়েন্দার বক্তব্য সত্য --- কারণ পশ্চিমদ্বারের রক্ষককে কোথাও পাওয়া গেল না ! এই খবর প্রচার হতেই রাজ্যময় এক আতঙ্কের সঞ্চার ঘটলো। রাজা রাজ-জ্যোতিষীকে তলব করলেন। তারপর গণনা করে নির্ণয় করতে বললেন ঘটনার প্রকৃত কারণ !


( ক্রমশ... )

31 views0 comments