Search

কিশোরবেলার রূপকথায় গোবিন্দ মোদক


জয় রাজা জয়বর্ধনের জয়!!

গোবিন্দ মোদক


গত পর্বের পর...


(তিন)



           ইতিমধ্যে ছোটরাণী সুগন্ধা প্রমাণ করে দিলো যে বড়রাণী-ই রাক্ষসী ! সে-ই প্রতিরাতে বিকট দর্শনা রাক্ষসী হয়ে জীব হত্যা করে ! প্রমাণ স্বরূপ একদিন ভোরবেলায় সে রাজাকে নিয়ে গিয়ে দেখালো যে --- বড়োরাণী চন্দ্রাবতীর হাতে, ঠোঁটের কোণে এবং কাপড়ে রক্ত লেগে রয়েছে ! রাজা তখন সুগন্ধার কথায় বিশ্বাস করে বড়োরাণীকে বনবাসে পাঠালেন --- চন্দ্রাবতীর চোখের জল রাজাকে টলাতে পারলো না ! রাজ্যের লোকজন মহারাণী  চন্দ্রাবতীকে খুবই ভালবাসতো এবং শ্রদ্ধা করতো। তারা এ ঘটনা বিশ্বাস করল না --- মহারাণীর  বনবাসে তারা খুবই হতাশ হয়ে পড়লো। 


          কয়েকদিন পর রূপকুমারকেও আর খুঁজে পাওয়া গেল না। তখন রাজা খুবই হতোদ্যম হয়ে পড়লেন। রাজ-জ্যোতিষী গণনা করে বললেন ছোটরাণী সুগন্ধা-ই রাক্ষসবংশের কন্যা --- সবকিছুর মূলে তারই হাত ! 


         এই কথা শুনে রাজা চমকে উঠলেন। তারপর ছোটরাণীকে সে কথা বলতেই সুগন্ধা এমন মায়াকান্না জুড়লো যে রাজার মত বদলে গেল। তিনি রাজ-জ্যোতিষীকে ভুল গণনার অপরাধে তাড়িয়ে দিলেন। রাজ জ্যোতিষী হাত জোড় করে অনেকবার মিনতি করল --- "রাজামশাই আপনি ভুল করছেন !" কিন্তু রাজা তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। 


           রাজার মনে সুখ নেই ! রাজ্য জুড়ে আতঙ্ক ! প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও এলাকার লোকের নিখোঁজ হবার খবর আসে। অবশেষে একদিন ভোররাতে রাজাও সুগন্ধার প্রকৃত রূপ দেখে ফেললেন --- দেখলেন ভীষণদর্শনা রাক্ষসীর রূপ পরিগ্রহ করে সুগন্ধা চলেছে আস্তাবলের দিকে তার খাদ্যের সন্ধানে। ভয়ে দিশাহারা হয়ে নিজেকে রাক্ষসী-রাণী সুগন্ধার হাত থেকে বাঁচাবার জন্য রাজা চুপিচুপি রাজ্য ত্যাগ করলেন। 



                                                     (চার) 


                                     


         দীর্ঘ দশ-এগারো বছর রাজা জয়বর্ধন পাগলের মতো পথে পথে ঘুরছেন। তাঁকে রাজা বলে কেউ চিনতেও পারে না আজকাল। তার রাজ্য বীরভূমি রাক্ষসী ছোটরাণীর কোপে পড়ে ছারখার হয়ে গেছে। সে সংবাদ রাজার কানেও পৌঁছেছে। রাজা তাই বড়ই ম্রিয়মাণ। সুগন্ধার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করবার কারণেই তাঁর এবং তাঁর রাজ্যের এই ভয়াবহ দুর্গতি ! হায় হায় ! কি ভুলই না তিনি করেছেন ! বড় আফসোস হতে থাকে তাঁর। দীর্ঘনিঃশ্বাসের পর দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ে, কিন্তু কোনও সমাধান সূত্র তিনি খুঁজে পান না।


       --- মহারাজ !


       --- কে ? চমকে ওঠেন জয়বর্ধন। তাঁর সামনে এক পক্বকেশ বৃদ্ধ। রাজা অনেকক্ষণ তাকে দেখেও চিনতে পারলেন না।


        --- চিনতে পারলেন না তো মহারাজ ! আমি সেই হতভাগ্য জ্যোতিষী যাকে আপনি তাড়িয়ে দিয়েছিলেন !


        --- ওঃহোঃ ! রাজজ্যোতিষী ! আমাকে ক্ষমা করো জ্যোতিষার্ণব ! আজ আমি অনুতপ্ত !


        --- ও সব কথা থাক মহারাজ ! আমি আজও আমার বীরভূমিকে ভালোবাসি ! আপনাকে ভালোবাসি ! আপনাদের সবার ভালো চাই !


         --- আর ভালো ! সব শেষ হয়ে গেছে জ্যোতিষার্ণব ! দীর্ঘশ্বাস পড়ে রাজার !


         --- কিছুই শেষ হয়ে যায়নি মহারাজ ! সুখ আর দুঃখ চাকার মতো ঘুরে ফিরে আসে ! আমি গণনা করে দেখতে পাচ্ছি আপনার দুঃখের দিন শেষ হয়ে আসছে !


        --- কি বলছ জ্যোতিষার্ণব !


        --- ঠিকই বলছি মহারাজ ! আপনি আপনার রাজ্য হয়তো ফিরে পেতে পারেন। ফিরে পেতে পারেন রাজপুত্র .... রাজমহিষী .... সব !


        --- একি শোনাচ্ছ তুমি জ্যোতিষার্ণব ! আমি যে এক সহায়-সম্বলহীন ভবঘুরে আজ ! আর রূপকুমার ! তাকে যে রাক্ষসী-রাণী .... !


        --- রূপকুমার বেঁচে আছে মহারাজ ! তবে মায়াবী ডাইনি রাণী তাকে অন্য রূপে, অন্য চেহারায়, অন্য কোথাও গোপন করে রেখেছে।


        --- বলো জ্যোতিষার্ণব ! কোন চেহারায়, কেমন ভাবে ?


        --- তা আমার অজানা মহারাজ ! তবে আমি আমার গণনায় দেখেছি যে --- যে প্রদেশে আপনি আপনার সুগন্ধার প্রথম দেখা পান, তারই কোন অঞ্চলে তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। কি রূপে সে আছে তা আমারও অজানা।


        --- হায় ! আমার মত হতভাগ্য পিতা আর কে আছে ! না জানি রূপকুমার কতো কষ্টে আছে !


        --- মহারাজ ! ধৈর্য্য হারাবেন না ! আপনি সেখানে গিয়ে তাকে খুঁজে বার করুন। আপনার ডাকে সে নিশ্চয়ই সাড়া দেবে। তবে মনে রাখবেন -- বারো বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলে তাকে আর ফিরে পাবেন না।


         --- এ কি কথা শোনালে জ্যোতিষার্ণব ! আমার তো দিনক্ষণ কিছুই স্মরণে নেই !


         --- ভয় নেই মহারাজ ! আমার গণনা বলছে ডাইনি রাণী  রূপকুমারকে ভিন্ন রূপে বন্দি করে রেখেছে এগারো বছর, এগারো মাস, এগারো দিন আগে। হাতে আর মাত্র উনিশ দিন বাকি। এরই মধ্যে তাকে খুঁজে বের করতে হবে আপনাকে। নইলে সে চিরতরে হারিয়ে যাবে !


          জ্যোতিষীর কথা শুনে হতোদ্যম হয়ে পড়েন মহারাজা জয়বর্ধন। জ্যোতিষী তাঁকে উৎসাহ দিতে থাকে।



(ক্রমশ...)

9 views0 comments