Search

ছোটগল্প ( অল্প কথার গল্পে ) অনিকেত ঋক রায়


বলি


অনিকেত ঋক রায়


( গল্পটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য )



"মা, এটা গোট না?? আমরা গোট পুষবো বাড়িতে? ইয়ে!! কী মজা!! আমার অনেক বন্ধুর বাড়িতে 'ডগি' বা ' মিয়াও' আছে। আমার বাড়ি গোট থাকবে। ইয়ে!!",

আট বছরের তাতাই স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বারান্দায় থাকা ছোট পাঁঠাটির দিকে তাকিয়ে কথাগুলো একনিশ্বাসে বললো।

তাতাইয়ের মা শ্রীময়ী কিছু না বলে ছেলেকে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলো। কোনোরকমে হাত মুখ ধুয়েই তাতাই চলে গেলো তার নতুন সঙ্গীর কাছে।

সন্ধ্যাবেলা অতীনবাবু অফিস থেকে ফিরে চা খেতে খেতে স্ত্রীকে বললেন, "অনেক কষ্টে বনগাঁর এক চেনা লোকের থেকে আট হাজার টাকা দিয়ে এই পাঁঠাটা পেলাম।"

"আট হাজার!!! বলো কী!!", অবাক কণ্ঠে বলা শ্রীময়ীর কথা শেষ না হতেই অতীনবাবু বলে উঠলেন, "হ্যাঁ, আট হাজার। এর থেকে কমে ভালো পাঁঠা পাওয়া যায় না আজকাল। আর ছেলের মানষিকের পুজো বলে কথা। তাও তো আমাদের দেরী হয়ে গেলো অনেক।"

কিছু না বলে দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন শ্রীময়ীদেবী।

বিয়ের পর প্রায় ৬ বছর পর্যন্ত বাচ্ছা হয় নি, তারপর কিছু গাইনিকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের পর যদিও কনসিভ করলেন কিন্তু পরপর দুটো মিসক্যারেজ হলো। একদিকে মনের দুঃখ অন্যদিকে আত্মীয়স্বজনের নোংরা কথাবার্তায় শ্রীময়ীর তখন প্রায় পাগল পাগল অবস্থা। এমন সময় ছোটবেলার বান্ধবীর কাছ থেকে এক কালীবাড়ির সন্ধান পান যেখানে মানদ করলে কখনো কেউ খালি হাতে ফেরে না। অবিলম্বে সেখানে গিয়ে পুজো দিয়ে মানদ করেন শ্রীময়ী। পুরোহিত জানান মানদ পূর্ণ হলে ৫ বছর পর আবার একবার পুজো দিতে আসতে। অতীনবাবু তাই ঠিক করেন সন্তান জন্মালে এবং তার বয়স পাঁচ বছর হলেই তিনি পাঁঠা দিয়ে পুজো দেবেন।

তারপর তাতাইয়ের জন্ম। কিন্তু তাতাইয়ের বয়স পাঁচ পেরিয়ে গেলেও নানা কারনে পুজো দিতে যাওয়া হয় নি। তাই অতীনবাবু এই বৈশাখের অমবস্যায় পুজো দেবেন বলে ঠিক করেছিলেন। অনেক খুঁজে তাঁর অফিসের এক কলিগ এই পাঁঠার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।



"তাতাই কোথায়?", প্রশ্ন করলেন অতীনবাবু।

"আর বলো না। স্কুল থেকে ফিরেই ওই পাঁঠাটাকে নিয়ে পড়ে আছে। ওকে খাওয়াচ্ছে, নিজের জামা পড়িয়ে দিয়েছে। আসলে খেলার সঙ্গী পাই না তো তাই। আবার ভালোবেসে ওর নাম দিয়েছে কলি।", তরকারি কাটতে কাটতে বললেন শ্রীময়ীদেবী।


২.

বিড়ি টানতে টানতে অসীমবাবু বললেন, "শোনো আজ সন্ধ্যায় ঘটক একটা লোককে আনবে। মেয়েকে সাজিয়ে গুজিয়ে রেখো। বুঝলে "


উনুনে জ্বাল দিতে দিতে মালতিদেবী বললেন, "নতুন পাত্র বুঝি। দুগ্গা। দুগ্গা। ঠাকুর এবার মেয়েটার বিয়েটা যেন হয়ে যায়।"


"হুম। তা মেয়ে কোথায় গেছে?," অসীমবাবুর প্রশ্নে মালতিদেবী বললেন, "এই বন্ধুদের সাথে একটু খেলতে গেছে।"


"খেলতে গেছে!!! সতেরো বছরের এতো ধিঙ্গিপনা কীসের?? সংসারের কাজ শেখাতে পারো না?? যদি এবারে কোনো গন্ডগোল হয়েছে না তারপর তোমার মজা বের করবো।", বলে বিড়িটা ছুড়ে ফেলে উঠে গেলেন অসীমবাবু।


দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে দুহাত কপালে ঠেকালেন মালতিদেবী।





সন্ধ্যাবেলায় ঘটক একজনকে নিয়ে এলো। কাঁপাকাঁপা হাতে মিষ্টির প্লেট নিয়ে সপ্তদশবর্ষিয়া বিনতা শাড়ি পড়ে তাঁদের সামনে এলো। লোকটি কোনো প্রশ্ন করলো না শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলো। মুখে কিছু বললেন না বটে কিন্তু মেয়ের পাশে দাঁড়ানো পাঁচ সন্তানের জননী মালতিদেবীর বুঝতে বাকী রইলো না এই লোকটির চোখ যেন বিনতার শাড়ির ফাঁক দিয়ে তার বুক ও পেট জরিপ করে নিচ্ছে। কথাবার্তা প্রায় পাকা করে ওরা বেরিয়ে যেতেই মালতিদেবী তাঁর স্বামীকে বললেন, "তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে?? এই দোজবেরে, অসভ্য, বুড়ো লোকটার সাথে তুমি মেয়েটার বিয়ে দিতে চাইছো?? তুমি বাবা না কসাই??

"এই একদম চুপ করে থাক মাগি। বিয়ে এখানেই হবে। জামাইয়ের বয়স ৪৮ তো কী আছে, ওদের কত সম্পত্তি আছে জানিস?? বাজারে দুটো সোনার দোকান আছে। আগের বউটা মরে গেছে, বাঁজা ছিলো তাই ছেলেমেয়েও নেই। আমাদের মেয়ে ওখানে রানীর হালে থাকবে। একটাকাও পন নেবে না উপরন্তু বিয়ের সব খরচ ওই দেবে। লোকের দোকানে কাজ করে আমি আর তোদের এতগুলো পেট চালাতে পারছি না। তারপর তোর তো বছর বছর বাচ্ছা হচ্ছে। চুপচাপ মেয়েকে ঘরের কাজ শিখিয়ে তৈরী কর। এই বোশেখের একুশ তারিখ ত্রয়োদশীর দিন বিয়েটা দেবো।", বলে একটা বিড়ি ধরালেন অসীমবাবু।



৩.

"মা তোমরা কলিকে মন্দিরে নিয়ে এলে কেনো?? ওকে ওই আঙ্কেলটা নিয়ে গেলো কেনো??", তাতাইয়ের প্রশ্নের জবাবে শ্রীময়ীদেবী বললেন, "চুপ করে বসো। পুজোর সময় কথা বলতে নেয়। পুজো শেষ হলে বলি হবে।"


পুজো শেষে জল্লাদ যখন টানতে টানতে পাঁঠাটিকে হাঁড়িকাঠে নিয়ে এলো তখন তাতাই বারবার বলতে লাগলো, "মা কলির কষ্ট হচ্ছে। ওই আঙ্কেলটাকে বলো ছেড়ে দিতে। প্লিজ মা।"


"চুপ। একদম চুপ। বলির সময় কথা বলতে নেই। শ্রী তুমি তাতাইকে ওদিকে নিয়ে যাও।", বললেন অতীনবাবু।

স্বামীর কথাশুনে একপ্রকার জোর করেই শ্রীময়ীদেবী তাতাইকে অন্যদিকে টেনে নিয়ে চললেন। তাতাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেলো কীভাবে জল্লাদ তার প্ৰিয় খেলার সাথী কলিকে হাঁড়িকাঠে ফেলে রামদায়ের এক কোপে কেটে ফেললো। সঙ্গেসঙ্গে ঢাক বেজে উঠলো।


৪.

"অনেক ধন্যবাদ বাবা। আয়োজন খুব ভালো হয়েছিল। খুব ভালো খেলাম। তোমার হাতে মেয়েটাকে তুলে দিতে পেরে নিশ্চিন্ত হলাম। আমার মেয়ে খুব সুখী হবে।", জামাইবাবাজির হাত ধরে এইসব বলে বেরিয়ে গেলেন অসীমবাবু।


নববধূর বেশে বিনতা শুনতে পেলো পাশ থেকে তার এক জা বলছে, "যতসব হাঘরের দল। বাপের জন্মে এতো ভালোমন্দ খেয়েছে নাকী!"


ফুলসজ্জার ঘরে ঢোকার আগে বিধবা ননদ বলে গেলেন, "তাড়াতাড়ি সোহাগ করে শুয়ে পড়ো। কাল সকালে ৬ টার মধ্যে উঠে পড়বে। অনেক কাজ আছে ঘরে।"


ঘরে ঢুকে চুপচাপ খাটে বসেছিল বিনতা। একটুপরে তার মধ্যবয়স্ক স্বামী ঘরে ঢুকলো। মুখ দিয়ে ভকভক করে মদের গন্ধ বেরুচ্ছে। বিনতা কিছু বলার আগেই দরজা বন্ধ করে একপ্রকার তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো তার স্বামী। বিনতা বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তার গালে একচড় কষিয়ে দিয়ে তার পতিদেব বললো, "কতদিন পর আজ ভালো করে লাগাবো বলে ভিখারি ঘর দেখে বিয়ে করলাম। আজ ফুলসজ্জার দিনে তুই বাঁধা দিচ্ছিস?"





বিনতা কিছু না বলে খাটে শুয়ে পড়লো আর তার ফুলের মতো শরীরটা ক্রমে আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে রতিসুখ উপভোগ করতে লাগলেন বাজারের নামকরা সোনা ব্যবসায়ী গনেশবাবু। চুপ করে শুয়ে বিনতা শুনতে পেলো দূরের কোন মন্দিরে জোর ঢাক বেজে উঠলো।


৫.


সেদিন তাতাই খুব কেঁদেছিলো, হাজার অনুরোধ ও ধমকানো সত্ত্বেও আর কোনোদিন তার একসময়ের অতি প্ৰিয় মটন আর কোনোদিন মুখে তোলাতে পারেন নি অতীনবাবু।

বিনতাও আর কোনোদিন বাপেরবাড়ি যেতে পারে নি। বছরখানেক পর বাচ্ছার জন্ম দিতে গিয়েই সে স্বামী ও শ্বশুড়বাড়ির অত্যাচার থেকে চিরমুক্তি পেয়ে যায়।


সমাপ্ত.....

74 views0 comments