top of page
Search

ছোটগল্পে ( অল্প কথার গল্পে ) চুনীলাল দেবনাথ


রাতে একা স্টেশানে

চুনীলাল দেবনাথ



বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ফলে আমাকে মেমারি স্টেশানের কাছে একটা ছোট্ট নির্জন গ্রামে থাকতে হয়েছিল ।স্টেশন থেকে গ্রামের দূরত্ব ছিলো হাঁটা পথে দশ মিনিট।আমার এক দূর সম্পর্কের কাকুর বাড়িতে থাকতাম।এটা ছিলো রতন কাকুর বাড়ি।কাকু-কাকিমা বেশ সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন । আমাকে বেশ আদর যত্ন করতেন।

যদি কোনো দিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরতে দেরী হতো,কাকু বেশ চিন্তা করতেন । রতন কাকু মাছের আড়তদার ছিলেন । এর ফলে ওনার আন্ডারে আনেক লোক কাজ করতো । আড়তের বিশ্বস্ত লোককে মাঝে মাঝে স্টেশানে পাঠাতো আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ।আমি খুব লজ্জা বোধ করতাম ।

একেতো খাওয়া দাওয়া ফ্রি ছিলো, তারওপর স্টেশানে লোক পাঠানো --এ ব্যাপারটা আমার ভালো লাগতো না ।কাকুকে বাড়ি গিয়ে বলতাম,"কাকু , আমার জন্যে স্টেশানে লোক পাঠাতে হবে না । আমি ঠিক একা একা চলে আসবো।" কাকু তখন বলতো, " আহা! ঠিক আছে।ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি স্টেশনের কাছেই মাছের বাজারে থাকি।চিন্তা হয়। তাই আর কি....."আমি আর কিছু না বলে চুপ করে থাকতাম। আমি অবশ্য মাছের বাজারে কোনো দিন যায় নি । যাওয়ার রাস্তাটা ও চিনি না ।



একদিন ইউনিভার্সিটির ক্লাশের পর সন্ধ্যায় প্রাইভেট টিউটারের কাছে ক্লাশ ছিলো ।ঝড়-বাদলের দিন । সেই দিন রেলের তার কেটে যাওয়ার ফলে ট্রেন চলাচলের বিভ্রাট হয়ে ছিলো । এর ফলে বর্ধমান থেকে মেমারিতে এসে যখন ট্রেন থেকে নামলাম তখন রাত প্রায় বারোটা । স্টেশন প্রায় জনশূন্য। ট্রেনটা স্টেশন ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেই আন্ধকার গাঢ় হয়ে নেমে এসেছিলো । আজকের মেমারি স্টেশন আর তখনকার মেমারি স্টেশনের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক । তখন স্টেশনের লাইটগুলোও ভালো মতো ছিলো না । শুধু এক নাম্বার স্টেশনের দূরের কোণে একটা আলো টিমটিম করে জ্বলছিলো। আমি তখন তিন নাম্বার স্টেশনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ভাবছি কি করবো।এই অন্ধকারে একা কি ভাবে হাঁটা রাস্তাটায় যাবো । কোথাও কোনো লোকজন বা দোকান পাট নেই । আমার কাছে একদম নতুন যায়গা । মাত্র সাত দিন হয়েছে আমি কাকুর বাড়িতে এসেছি। রাস্তা-ঘাটও ভালো করে চেনা নেই ।কাঁধে আমার কাপড়ের কলেজের ব্যাগ । তখন আমার সমস্ত শরীরে যেন এক হিম শীতল ভয় ধীরে ধীরে বইতে শুরু করলো।অজানা এক ভয়ে আমার বুদ্ধি যেন অসাড় হয়ে আসতে শুরু করেছিলো । স্টেশনের পশ্চিম দিকে একটা বড়ো জঙ্গল ছিলো । আমার চোখ জঙ্গলে পড়তেই আমার গা যেন ছমছম করে উঠলো । তার একটু পরেই হালকা ঝড়ের হাওয়া বইতে শুরু করেছিলো । জঙ্গলে ঝড়ে শুকনো ডাল ভেঙ্গে পড়ার শব্দে আমার যেন আজে বাজে ভূতের কাহিনী মনে পড়তে শুরু করেছিলো । এমন সময় হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে আমার ব্যাগটা ধরে টান দিলো । আমি চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকালাম । আমি কোনো রকম তোতলে বললাম, " কে কে?" সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা মধ্য বয়স্ক লোকটা গম্ভীর কন্ঠে বললো , তোমাকে নিয়ে যেতে রতন কাকু পাঠিয়েছে । আমার পিছন পিছন এসো ।" আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম , " রতন কাকু পাঠিয়েছে?" লোকটা সামনের দিকে যেতে যেতে অস্পষ্ট স্বরে বললো , " বললামতো হ্যাঁ ।" " তবে চলুন" বলে আমি কোনো কিছু চিন্তা না করে ওনার পিছনে হাঁটতে শুরু করলাম । লোকটার মুখটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না । চারিদিকে ঘুট ঘুটে অন্ধকার।কোথাও কোনো আলোর চিহ্ন নেই । হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের রাস্তা ছেড়ে কখন যে একটা ফাঁকা মাঠে এসে পড়েছিলাম বুঝতেই পারিনি। কালো কাপড় পরিহিত লোকটা আরো খুব দ্রুত হাঁটতে লাগলো । রাস্তাটা এঁকে বেঁকে কোথায় যেন চলেছে ।প্রতিটা রাস্তার বাঁকে বাঁকে লোকটা যেন হারিয়ে যাচ্ছিল। আমি ক্লান্ত হয়ে আর হাঁটতে পারছিলাম না । আমি ভীষন হাঁফাতে লাগলাম। রাস্তাটা একটা বড়ো পুকুর পাড় দিয়ে গিয়ে ডান দিকে একটা বাঁক নিয়ে প্রকান্ড এক বট গাছের নীচ দিয়ে গিয়ে বিশাল ঝিল মাঠে পড়েছিল। তারপর আর কিছু আমার মনে নেই। আমি যে কখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম তা আমি জানি না । আমি যখন আবার চোখ মেলে তাকালাম , তখন দেখি আমি বিছানায় শুয়ে আছি । রতন কাকু,কাকিমা আর আড়তের লোকটা মানে সনৎ কাকু আমার পাশে বসে আছে। আমি যখন জানতে চাইলাম আমি এখানে কী করে এলাম, তখন সনৎ কাকু হেসে বললেন, ' আমিই তোমাকে একটু আগে এখানে নিয়ে এসেছি।'

আমার তন্দ্রার ঘোর কাটার পর আমি বললাম, ' আমি তো আপনার সঙ্গেই যাচ্ছিলাম।'



' আমি? আমি তো সন্ধ্যে সাতটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ।' সনৎ কাকু অবাক হয়ে বললেন।


' তাহলে?' আমি ভয়ার্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম ।


সনৎকাকু তারপর বললেন , ' তুমি

যে পুকুর পাড়ের বট গাছের নীচে পড়েছিলে তার ডান দিকের মেঠো রাস্তাটা ধরে একটু এগোলেই আমার বাড়ি । আমি আর আমার সহযোগী আব্দুল ভাই রাত আড়াইটার সময় রতনদার লিজ নেওয়া ঐ পুকুরে মাছ ধরতে বেরিয়েছিলাম। পুকুর পাড়ে বট গাছের নীচে আসতেই তোমাকে পড়ে থাকতে দেখি।তারপর তোমাকে এখানে নিয়ে আসি । আব্দুল আমাকে খুব সাহায্য করেছে । আব্দুল এখন ডাক্তার আনতে গেছে । '


আমি শুধু সনৎ কাকুর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার কৃতজ্ঞতার ভাষা ছিলো না। আমি শুধু জানতে চাইলাম , ' কাকু এখন কটা বাজে?'


রতন কাকু ঘড়ি দেখে বললেন, 'এখন সাড়ে চারটে।'


তারপর আমি সকলকে সমস্ত ঘটনাটা খুলে বলি । সব শুনে সনৎ কাকু বললেন , ' ঐ বট গাছে বছর দুই আগে একজন কৃষকের দেহ ঝুলন্ত অবস্থায় যায় । ' এর মধ্যে আব্দুল ভাই ডাক্তার বাবুকে নিয়ে এলেন। ডাক্তার বাবু সব পরীক্ষা করে বললেন কোনো ভয় নেই ।

13 views0 comments

Comments


bottom of page