Search

ছোটগল্প ( অল্প কথার গল্পে ) রুষা


আলো আঁধারে

রুষা



"একি তুমি এখনও শুয়ে! আমি কি আজ না খেয়ে যাবো"? ক্লান্তিতে জুড়ানো চোখ মেলে ধড়ফড় করে উঠে বসলো নিরুপমা। প্রদীপ অফিস যাবে। অন্যদিনের তুলনায় আজ একটু দেরিতে। সময় আছে ভেবে গড়িয়ে নেবে ভেবেছিল, কখন যে সময় বয়ে গেল।


আজকাল একটি বেশিই ক্লান্তি লাগে নিরুপমার, প্রদীপ কে বলে শুনতে হয়েছিল "সারাদিন শুয়ে বসে থাকো, সকালে বিকালে একটু হাঁটো, ঠিক হয়ে যাবে"। এরপর আর কিছু বলেনি সে। খাট থেকে নেমে চটি গলিয়ে ঠান্ডা দুধ গরম করতে বসায়। প্রদীপ খুব তাড়াতাড়ি খায়, খাওয়ার সময় নিরুপমা তাকিয়ে থাকে ওর দিকে, প্রদীপ তাকায়না, একমনে খেয়ে টেবিল ছেড়ে হাত ধুতে উঠে যায়। দায়সারা "আসছি" বলে অফিসব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। এরপর নিরুপমার অফুরন্ত সময়। নিজে বেশ খানিক টা সময় নিয়ে চা বানায়, পেয়ালা নিয়ে বারান্দায় বসে। বারান্দা টা বেশ চওড়া, বড়ো রাস্তার এপারে। ডানদিকে তাকালে এক চিলতে মাঠ চোখে পড়ে, উল্টোদিকে উঁচু বিল্ডিং। বিল্ডিং না বলে কমপ্লেক্স বলা ভালো। নিরুপমার বারান্দা থেকে কমপ্লেক্সের তিন তলার ঘরটির একাংশ দেখা যায়। দুটি যুবক যুবতী নতুন এসে উঠেছে। চাঁপার মা - ই বলেছিল "ও বৌদি উই বিলিডিং এর যে কচি ছেলে মেয়েডা নুতুন বে করে এসে উঠেচে গো"। ওদের নতুন সংসারের উচ্ছাসের সুখী হাওয়া যেন নিরুপমাও তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। হঠাৎ বিশ্রী শব্দে ফোন টা ঘ্যার ঘ্যার করে বেজে ওঠে। দিদি, "এই সাত সকালে!?" আপন মনে বলে ওঠে সে। ফোনটা তুলতেই ওপার থেকে "কিরে কেমন আছিস"? মৃদু শব্দে উত্তর দেয় নিরুপমা। উচ্ছাস ভরা কণ্ঠে অনুপমা ঝর্নার মতন কলকলিয়ে ওঠে "জানিস তো তোর জামাইবাবু আর আমি প্যারিস যাচ্ছি রে, এইতো সামনের সপ্তাহে, পনেরোদিন থাকবো"। "বাঃ ভালো, পুপাই যাবেনা"? উচ্ছাসহীন কণ্ঠে জবাব দেয়। "না রে ওকে নেবনা, সামনে পরীক্ষা তো! মায়ের কাছে থাকবে, পরের বার নিয়ে যাবো। আচ্ছা ছাড়ছি রে, তোরা আসিস একদিন"। নিরুপমা হ্যাঁ বলতে না বলতেই ফোন কেটে যায়। অনুপমার এই এক স্বভাব, ফোন রাখার সময় এত্ত তাড়াহুড়ো করে!



ফোন টা রেখে আবার বসে। নাহ্ আমেজটা আর আসছেনা তার, উঠে বাথরুমের দিকে পা বাড়ায়। ইদানীং ওই দুটি ছেলে মেয়ের কার্যকলাপ যেন নেশায় পেয়ে বসেছে নিঃসঙ্গ নিরুপমার। এইতো কিছু দিনের আগের ঘটনা, ছেলেটি বাইরে থেকে এসে রেগে কি একটা যেন বলছিল মেয়েটিকে, মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় বসে পড়েছিল। অনেক উঁকি ঝুঁকি মেরেও আর বাকিটুকু দেখতে পায়নি সে। ওদের দেখে যে সুখী দাম্পত্য উপভোগ করে সে, সেদিন যেন মনটা নিরাশ হয়ে গেছিল তার। প্রদীপ তাকে কখনও বকেনি সেভাবে। নিরুপমার বিয়ে একরকম জোর করেই হয়েছিল প্রদীপের সাথে। তার বাবার ছাত্র ছিল সে। প্রিয় স্যারের অনুরোধে না বলতে পারেনি সেদিন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রদীপের অসন্তুষ্টি আভাস তার মন এড়ায় না। নিরুপমা গায়ের রং চাপার দিকে। হয়তো সেটাই কারণ মনে করে। কিন্তু মুখে সেভাবে কোনোদিন কিছুই বলেনি প্রদীপ। স্বামীর কর্তব্য পালন করে গেছে নিঃশব্দে।


আজ চাঁপার মা আসবেনা, ওর মেয়ের জ্বর। বেলা করে আসে চাঁপার মা। রান্নাটুকু আর ঘর গুছিয়ে চলে যায়। প্রতিদিনের মতোই চা বানিয়ে বারান্দার এক কোণে রাখা মোড়ায় বসে সে। আজ যেন একটু বেশিই নিস্তব্ধ উল্টোদিকের ঘরখানা। "কিজানি কি হলো" হতাশ হয়ে উঠে দাড়ায় নিরুপমা। রোজের মতোই সময় ব্যায় করে স্নানে ঢোকে। আজ যেন মনটা খুঁতখুঁত করছে তার।


প্রদীপ ল্যাপটপে ব্যস্ত। দশটা বাজতে যায়। রোজই কাজ করতে করতে খেয়াল থাকেনা তার, নিরুপমার ডাকে কোনমতে খেয়ে ফের ল্যাপটপে বসে যায়। আজকাল বেশ রাত অবধি অফিসের ফোনে ব্যস্ত থাকে প্রদীপ। কে ফোন করে? কিসের ফোন? এসব কখনোই জিজ্ঞেস করেনা সে। যেখানে তাকে আলাদা করে দেখেইনা, তার প্রশ্নে কি উত্তর দেবে প্রদীপ, ভাবতে ভাবতে প্রায় রোজই ঘুমিয়ে পড়ে সে।

আজ মেয়েটি একা বসেছিল, কার সাথে ফোনে হাত নেড়ে কথা বলতে বলতে কাঁদছিল। আহারে, কিসের দুঃখ ওর? বড্ড জানতে ইচ্ছে করে তার। খানিক পরে ফোনটা রেখে মেয়েটি উঠে চলে যায়। নিরুপমাও হতাশ হয়ে ফের বসে পড়ে মোড়ায়। আচ্ছা একদিন গেলে হয়না! ওই নাহয় কথা শুরু করবে, কিগো মেয়ে তোমার নাম কি? কিসের দুঃখ তোমার মতন মিষ্টি মেয়ের! ভাবতে ভাবতে মুচকি হেসে ফেলে নিরুপমা। নাহ্ অনেক বেলা হলো স্নানে যেতে হবে, বলতে বলতে ধীরপায়ে এগোয় সে।




"এই সপ্তাহ থাকবনা। ট্রেনিং আছে"। "কিসের ট্রেনিং? কেন থাকবেনা? কবে ফিরবে"? প্রদীপের মুখের ওপর নিঃশব্দ কটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় নিরুপমা। কিন্তু শুধু ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থেকে "আচ্ছা" বলে উঠে পড়ে সে। রাতে প্রদীপের সুটকেস গোছাতে বসে। প্রদীপের অফিস ব্যাগ টা পড়ে আছে কোণে। কাজের জিনিস থাকে, ও আর হাত দেয়না ব্যাগ টায়। সুটকেস গুছিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে অফিস ব্যাগের ভেতরের চেনটা খোলা। আটকাবার জন্যে হাত বাড়াতেই সদ্য সেলফোন থেকে বের করা কাঁচের জিনিস উঁকি মারে। কৌতূহল বশত শোপিস টি তুলে ধরতেই এক টুকরো সাদা কাগজ পড়ে যায়, ভাঁজ করতে গিয়ে দেখে লাল টুকটুকে কালি তে লেখা "Pradip this is for you, I love you so much darling" ইংরেজি জড়ানো হাতের লেখা। নিচে ছোট্ট হার্ট সাইন। স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকে মুঠোয় ধরে থাকা কাগজের দিকে। প্রদীপের পায়ের শব্দে যন্ত্রচালিতের মতন যথাস্থানে জিনিসটি গুছিয়ে তড়িঘড়ি উঠে পড়ে নিরুপমা। প্রদীপ সুটকেসে নিজের শাল ভরতে।ভরতে বলে ওঠে " কাল একটু সকালেই বেরোব। ব্রেকফাস্ট করবোনা, বাইরে খেয়ে নেবো"। স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে "হুম" বলে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। একদলা বোবা কান্না গলার কাছে ঢেলা পাকিয়ে ওঠে। কি যেন না পাওয়ার দুঃখে, ভালোবাসা? ভরসা? জবাব হাতড়াতে থাকে সে। মনে হয় মেয়েটির কাছে গিয়ে বলে ওগো মেয়ে একটু কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে দেবে তোমার সাথে! চোখের কোণ বেয়ে জলের ধারা বালিশ ভেজায়। এই কি জীবন তবে? কিসের এত আকাঙ্খা ছিল তার? একটুখানি সুখের স্বপ্ন টুকুও দেখার অধিকার নেই। রাতচরা পাখিরা রাতের আঁধারে মিলিয়ে যায়। ভোরের আলো সবে ফুটছে, ফোলা চোখ মেলে বারান্দায় দাড়িয়ে

স্নিগ্ধতায় ভিজে নেয় সে, যেন প্রকৃতি চোখ মুছিয়ে দিচ্ছে তার, আহ্বান করছে নতুন আলোর, এই নরম পরশের আদর উপভোগ করতে থাকে। প্রকৃতির এপিঠ যেমন আলো ওপিঠ তেমনি আঁধার। আঁধারের পরেই তো আলো ফোটে।.......


চিত্রঃ- সুব্রত

42 views0 comments