Search

ধারাবাহিকে অয়ন ঘোষ ।। ধুলোমুঠির গান -১


ধুলোমুঠির গান


অয়ন ঘোষ







কথা শুরুঃ -


গত কয়েকদিন থেকে একটা বেয়ারা স্বপ্ন খুব জ্বালাচ্ছে। মাথামুন্ডু নেই, হাত পা ছড়িয়ে সেঁধিয়ে যাচ্ছে ঘুমের মধ্যে, আর ঘুমের বারোটা সাত। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই উঠে বসলাম নীল রঙের ট্রেনটায়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকায় জানালার ধারে শিটও জুটে গেলো। জানালার বাইরে দিয়ে, হুসহাস উল্টো দিকে ছুটছে ঝাঁকড়া মাথা, টাক মাথা, হৃষ্টপুষ্ট, রোগাসোগা, মায় ঘ্যানঘ্যানে গাছপালা। মাঝে মধ্যে সিরিঙ্গে দু একটা ইলেকট্রিক বা টেলিগ্রাফ খুঁটি। ছোটবেলায় আমিও অমন পিঠটান দিতাম অঙ্ক না পারলে। ওরাও বোধহয় কোনো কঠিন অঙ্কের স্যারের সামনে পড়েছে, যেমনটি ছিলেন আমাদের ইস্কুলে বি. এস. সি. স্যার। মা দুগ্গা যেমন ত্রিশূল ছাড়া থাকে না, তেমনি স্যারও বেত ছাড়া একদণ্ড থাকতে পারতেন না। যা হোক, এমন আমুদে সময়ে আর অঙ্কের কথা ভেবে লাভ নেই। আমার উল্টো দিকের শিটে একঢাল মেঘ উড়ছে বিপরীত হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে বকুল গন্ধ। তারই মধ্যে দু একটি শিশু সুলভ চপলতায় বারবার আড়াল করছে দৃশ্যপট। তবে মেঘ কেটে গিয়ে রোদ্দুর উঠতে দেরি হচ্ছে না। আমার ভাবনারা থিতিয়ে যাচ্ছে ভরহীন বাতাসে। নাকের পাটায় ওপর উৎসুক তিলে মন রাখতেই ধরা পড়ে লজ্জার একশেষ। চোখ নেমে এলো এক ছুটে। একটা তিরতির স্রোত এক লাফে পেরিয়ে গেলো একটা মাঝারি পাথরের বাধা। দু পা এগিয়েই গা এলিয়ে দিল পাড়ের বিষন্নতায়। অমনি থেমে গেলো ছুঁচলো মুখওয়ালা নীল ট্রেনটা। ব্যস্ত হয়ে নেমে এলো জলপাই রঙের পোষাক পড়া চালক, কোমর থেকে ঝুলছে আম আঁটির বাঁশিখানি। তাতে দুবার সুর তুলে ঘোষণা করলে এখন বিরতি জলপানের। অমনি দুরদার করে নেমে পড়লে সকলে। আমিও নামলাম তার পিছুপিছু সামান্য ধুলো মুঠির খোঁজে।



নেমে তো পড়লাম, কিন্তু এ যে তেপান্তরের মাঠ। যাকে আমরা স্টেশন বলি তেমন ধারা কিচ্ছুটি নেই। মাটি থেকে আধ হাত মতো উঁচু হবে। না আছে কোনো ছাউনী, না কোনো বসার ব্যবস্থা। আমি যেদিকটায় নেমেছি তার উল্টোদিকে দূরে একখানি টিনের চালের ঘর, দরজা বন্ধ। বাড়িটা ঘিরে মাধবীলতার ঝোপ, দেখে মনে হচ্ছে গোটা বাড়িটা দুধে আলতায় চোবানো। যাত্রী নেই, তাই নেই কোনো ব্যস্ত হাঁকডাক। স্টেশনের নাম লেখা পাটাতন খুলে পড়ে কোন ঘাসের বনে ঝিমোচ্ছে কে জানে? সহযাত্রী যারা নেমেছিলেন তারাও কোথায় ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে, শুধু চালকের আমআঁটির বাঁশিখানি জিরেণ সুরে বাজছে, তাকে দেখা যাচ্ছে না। আকাশের গায়ে গায়ে পাকা রঙের ছোপ। মনে হয় আকাশ বাড়ির মেয়েরা সব, পদ্ম দীঘির কাজল জলে গা ধুয়ে পরনের শাড়িগুলি মেলে দিয়েছে খোলা বারান্দা থেকে। সখীরা মিলে গোল করে ঘিরে বসেছে পানের বাটার চারদিকে। ঠোঁট হয়েছে রাঙা। এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে কপট লজ্জায়। কানের লতি লাল, বিন্দু বিন্দু মুক্ত দানায় সিমন্তের একটু নিচে বেলা শেষের আলোর বিশ্রাম। গা শিরশির হাওয়ায় ওরা উড়িয়ে দিয়েছে মিথুন সংলাপ আর প্রতিটি রমন শেষে খসে পড়া কয়েকটি অনিবার্য রঙিন পালক। লাটাই থেকে ছাড়া পেলে পেটকাঠি বা চাঁদিয়ালের যে দশা হয়, হাওয়ায় শরীর ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে নামে মাটির টানে, ওই রঙিন পালকগুলো তেমনি ইতিউতি ছড়িয়ে পড়ল, ঘাসে ঘাসে, বনে বনে, মনে মনে। নাগালে যে এক দুটি ছিল তাদের কুড়িয়ে নিয়ে ভরে রাখলাম কাঁধের ঝোলায়।




স্থায়ীঃ-

ঘুমের ঘোর চোখ ছাড়তে না ছাড়তেই, প্রেশার কুকারের আওয়াজ কানে আসে। এই আধা মফঃস্বলে শালিখ আর কাক ছাড়া অন্য পাখির দেখা মেলে কচ্চিত। তাই এই তিন কামরার ফ্ল্যাট বাড়িতে রোজই ঘুম ভাঙ্গে প্রেশার কুকারের সিটিতে। বুঝতে পারি সময় নিকটে। গিন্নীর রান্না চেপে গেছে তারপর উসেইন বোল্টের স্পিডে কাটে ঘণ্টা দুয়েক। ঠিক ৭.৪০ এ দুগ্গা দুগ্গা। মেয়েকে ইস্কুলের গেটে নামিয়ে ৭.৫৫ ডাউন তারকেশ্বর লোকাল। মাঝে মাঝেই ভুলে যেতাম দিনের নিজস্ব রঙ আছে, বাড়িতে অনুযোগ করার মানুষ আছে, সব বাদ দিয়ে নিজেকে নিয়ে বসার প্রয়োজন আছে। ঘড়ির কাঁটার সাথে ঘুরতে গিয়ে বড় কাঁটাটা যে কখন ছোট কাঁটাটার থেকে দূরে সরে গেছে বুঝে ওঠিনি আর বুঝলেও স্বীকার করিনি, পাছে নিজের কাছে ধরা পড়ে যাই।

সংসার তার প্রয়োজন মতো গড়িয়েছে জোড়াতালি দিয়ে। আর সেই জোড়াতালি টাকেই হাল ফ্যাশন ভেবে নিয়ে, যেমন ওই জিন্সের পোষাকে থাকে, আত্মপ্রসাদ লাভ করেছি। দু'এক লাইন সাহিত্য পড়ার সুবাদে জানতাম, অগ্রজ সাহিত্যিকরা বলেছেন, শরীরের দূরত্ব বাড়তে পারে, কিন্তু মনের পাশে মন রেখো, মন পেতে দেখো। কিন্তু মনের মাঝে সেন্টিমিটারের ফাঁক গুলো যত ইঞ্চির দিকে গড়িয়েছে, আমরা শরীর দিয়ে ভরাট করতে চেয়েছি। শরীরের ওপর শরীরের হুকুম চলতে পারে। মনের ওপর হুকুম চলে না, চলে সমর্পন।



তা বেশ চলছিল, এই রঙিন কাগজের সংসার সংসার খেলা। পাঁজি দেখে বার তিথির হিসেব করে যাত্রা শুরু অথবা যাত্রা নাস্তি। আপাতত এই বঙ্গ দেশে কোন ছাত্রকে যদি প্রিয় ঋতু রচনা লিখতে দেওয়া হয়, নির্ঘাত হোঁচট খাবে, কারণ এখন তো ক্যালেন্ডারের পাতায় ছাড়া ঋতু পরিবর্তন বোঝা দুষ্কর আর ডাক্তারবাবুরা, সারা বছরই সাধারণ জ্বর সর্দি কাশিকে সিজনচেঞ্জ বলে দিব্যি চালিয়ে দেন। কিন্তু এবার এসব কোনো সাধারণ নিয়ম চললো না। সেই কবিতার মতো: হঠাৎ দেশে উঠলো আওয়াজ হো হো হো, চমকে সবাই তাকিয়ে দেখলাম করোনা আতঙ্ক। প্রথম প্রথম ইতিউতি খবর আসছিল, ও নাকি চীনেদের রোগ। তা আমি কলকাতা থেকে দূর এই আধা মফঃস্বলে থাকি, চীনে পাড়ার সাথে কোনো যোগাযোগ নেই চীনাবাদাম ছাড়া, চীনে খাবারও খেতে যে ভালোবাসি তাও নয়। তাই ও নিয়ে মাথা ভর্তি করে লাভ নেই, এই ছিল আমার বিশ্বাস। আমার কাছে চীন বলতে স্থানীয় হিমঘরে যে নেপালি বাহাদুর আছে ওর মাসতুতো ভাই গোছের।



ছাপোষা বাঙালি তায় আবার লোকাল ট্রেনের ডেলি প্যাসেঞ্জার। হরেক কিসিমের রঙ মেলে সেখানে। এই কম্পার্টমেন্ট গুলো ইন্টেলেকচুয়াল বাঙালির আঁতুর ঘর। এখানে এমন এমন লোকজন পাবেন যিনি বিরাট কোহলিকে স্কোয়ারকাট, মেসিকে ড্রীবল, অমর্ত্য সেনকে অর্থনীতি শেখাতে পারে। গ্যালোপিং ট্রেনের মতো NRC নিয়ে নন স্টপ কথা বলতে, উগান্ডায় সিঙ্গী মাছ কত করে যাচ্ছে সে বিষয়ে আপনার হাতে রাষ্ট্রপুঞ্জের রেট চার্ট ধরিয়ে দিতে পারবে। প্রতি চ্যানেলে( টিভি নয়, ট্রেনের সিটের ভাষা) একজন করে থাকেন যিনি শেষ মতামতটা দেন। সেখান থেকেই খবর আসছিল আমাদের দেশেও নাকি ঢুকে পড়েছে! কিন্তু ওই যে আমাদের 'দেখি না কি হয়' স্বভাব, তাই ভাবলাম দিল্লী অভি দূর হ্যায়। এদিকে ফেসবুক হোয়াটস অ্যাপে জমে উঠেছে করোনা খিল্লি। নতুন একটা বিষয় পাওয়া গেছে চর্চার। আমাদের সেই 'দে ঘুমাকে' অবস্থা। দেওয়ালে দেওয়ালে গবেষণা। বন্ধু, আত্মীয়স্বজন দের গ্রুপ থেকে ছাত্রছাত্রীদের গ্রুপ, মিনিটে মিনিটে আপডেট, সেকেন্ডে সেকেন্ডে মিম, দাঁত বের করা থেকে রাগে গরগর কোনো ইমোজী, কিছুই বাদ যাচ্ছে না। পাড়ার মোরে চায়ের ঠেক থেকে সেলুন গবেষণার পর গবেষণা, প্রতিটাই নিজের অভিনবত্বের জন্য নোবেল পুরস্কারের দাবি রাখে। আঙুল ক্লান্ত হলে চলবে না, মেসেজ ফরোয়ার্ডের পর ফরোয়ার্ড। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব গোছের ব্যস্ততা। কে কতো নতুন, অভিনব জিনিস পাঠাতে পারে। ফুল পিসির দেওরের থেকে বল পেয়ে ন'বৌদির বোনের বরকে সঙ্গে সঙ্গে পাশটা বাড়িয়ে দেওয়া আর যুদ্ধ জয়ের হাসি। বাঙালি ব্যস্ত " চিত্ত যেথা ভয়শূন্য/ নত যেথা শির এর খেলায়। এর সাথে টিভি চ্যানেলগুলো সাগর সেঁচে মুক্তো আনার মতো, প্রতি মুহূর্তে আমাদের সামনে এনে রাখছে এক্সক্লুসিভ খবর। এরপরও ক্রমশঃ ক্রমশঃ পিছু হটতে শুরু করল কালো পিঁপড়ের দল। খিল্লি করতে করতে শুরু করল ভয় পেতে। তারপর একদিন শুনশান নিরব রাস্তা ঘাট দেখে, পাঁজি ঘোষণা করে দিল বিশেষ কোনো দিন নয়, পাঁজি অনুযায়ী রোজই এখন যাত্রা নাস্তি।

যে সংসারকে এতদিন ভেবে এসেছি কেবল মাত্র অভ্যাস, পাত্তা দিইনি বাইরের দুনিয়ার হাওয়াকে রঙিন ভেবে। এবার সময় এলো সুবোধ বালকের মতো তারই কোটরে সেধিয়ে যাবার আর সে তো দু'হাত বাড়িয়েই ছিল, ডেকে নিল চেনা মমতায়, অশ্রুত গানে।


( ক্রমশ ... )




61 views1 comment