Search

ধারাবাহিকে ময়ূখ হালদার -৪


পরিপ্রেক্ষিত


[চতুর্থ পর্ব]


ম য়ূ খ হা ল দা র


আচমকা কুয়াশা আর মেঘ কেটে গেলে যেমন ঝকঝকে আকাশ দেখা যায় তেমনই সুন্দর আজকের দিনটা। আজ কতদিন পর গান গাইলো তুষার। আহা! কী দরাজ গলা! ওর কি মনে আছে পুরোনো ধুলোমাখা দিনগুলোর কথা? মনে আছে, ওর গান শুনেই ওর প্রেমে পড়েছিলাম? হয়তো আছে, কিংবা নেই। কে জানে! আজকাল আমাদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। শুধু এখন কেন, দূরত্ব তো বরাবরই ছিল। তবুও আমরা কাছে এসেছিলাম। ভালোবেসেছিলাম। তবে এটাও ঠিক- ভালোবাসা নিয়ে আমাদের কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। ছিল না লোকদেখানো আদিখ্যেতা। আসলে আমরা বড্ড বেশি জাজমেন্টাল। বাইরেটা দেখেই চটজলদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। মন্তব্য করে বসি। এই যেমন এখন ভ্যালেন্টাইনস ডে না কি একটা দিন নিয়ে এত ন্যাকামো হয়, তিথিদের কাছে শুনি, টিভিতে সিরিয়াল সিনেমায় দেখি; কিন্তু সত্যি বলতে আমাদের সময় ওসবের বালাই ছিল না। একটা চিঠি কিংবা গোলাপ দিতে গিয়েই হিমশিম খেতে হতো। এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম! কেমন এক বুক দুরুদুরু ব্যাপার! সেসব মুহূর্ত এরা কোনওদিনই পাবে না।



এতগুলো বছর একসঙ্গে কাটিয়ে দিলাম। যত কথা বলেছি একে অন্যকে, বলা হয়নি তার চেয়ে ঢের বেশি। সেই ভালো। সব কথা বলা হয়ে গেলে সম্পর্ক ফোঁপরা হয়ে যায়। সকালে তুষার যখন গান গাইতে মত্ত তখন ওকে পোড় খাওয়া আমিনের মতন জরিপ করছিলাম। আসছে ফাল্গুনে পঞ্চান্ন ছোঁবে। রং করা একমাথা চুলের ভেতর থেকে দু'চারটে সাদা চুল পতপত করে হাওয়ায় উড়ছে। মৃণাল সেনের কায়দায় যত্ন করে সাজানো জুলফির ওপর মোটা ফ্রেমের চশমা আড়াআড়িভাবে গেঁথে আছে। নাকটা উত্তমকুমারের মতন থ্যাবড়া। সবটা নিয়ে গোটা মুখে লালিত্য আর সরলতা এখনো খেলা করছে। কেমন একটা মাটি-মাটি সৌন্দর্য আমাকে আজও ভীষণভাবে টানে। কিন্তু হলে কী হবে, আমি আবার অনেকটা নারকোলের মতন। বাইরে শক্ত ভেতরে নরম। ওসব গদগদ পিরিত দেখাতে পারিনা।




এখন আমরা যাব মহাকাল মন্দিরে। কে কী করবে জানিনা, তবে আমি ঠিক করেছি পুজো দেবো। এই নিয়ে বাপ-বেটি কানের কাছে প্যাঁক প্যাঁক করবে সেটাও জানি। কিন্তু পুজো আমি দেবোই। ওপরে মন্দিরের চূড়া দেখা যাচ্ছে। রাস্তার ওপর ছোট ছোট নানারঙের পতাকা দড়িতে ঝোলানো। দেখতে বেশ লাগছে। এখানকার গাছগুলোর সব এত লম্বা, তাকিয়ে থাকলে চোখ নয় ঘাড় ব্যথা করে। অথচ কী সুন্দর! না দেখে থাকাও যায়না। ইউক্যালিপটাস পাইন ওক- কত রকম গাছ দাঁড়িয়ে আছে দলবেঁধে। আমাদের বাড়ির তিনটে বাড়ি ছেড়ে চার নম্বর বাড়িতে দুটো ইউক্যালিপটাস আছে। তবে সেগুলো এখানকার মতো এত উঁচু না। কত ঝড় এল গেল, কিন্তু ওদের কিছু হয়নি। এখানে পাহাড় আর গাছ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। অনেকদিনের ময়লা ধরা মনটা দু'দিনে কেমন চকচকে হয়ে গেছে সেটা ভেবেই আশ্চর্য লাগে! পাহাড়ে সব ভালো কিন্তু সমস্যা একটাই। হাঁটুতে বাতের ব্যথা নিয়ে এই আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু রাস্তায় চলাফেরা করাটাই কষ্টকর। একসময় মনে হলো আর এক পাও চলতে পারব না। ধপ করে বসে পড়বো রাস্তার ওপর। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে দুই পা!




-শুনছো!

তুষার সামনে খানিকটা তফাতে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল। ও আমাকে দেখেই বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। সিগারেট ফেলে দিয়ে ছুটে এল আমার কাছে। আমি ওর কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম। আর একটু দেরি হলে হয়তো পড়েই যেতাম।

-তুমি ঠিক আছো?

তুষারকে উদ্বিগ্ন দেখায়। আমি ওকে আশ্বস্ত করলাম।

-হ্যাঁ, ঠিক আছি। বাতের ব্যথাটা হঠাৎ এমন বেড়ে যাবে বুঝতে পারিনি।

-তোমার সবকিছুতেই গাছাড়া ভাব। কতবার বলেছি ওষুধটা বন্ধ ক'রো না।

-রাখো তো তোমার ওষুধ। বাত যেন কখনও ওষুধ খেয়ে সারে! সেই ছোটবেলা থেকে মা- ঠাকুমাদের দেখে আসছি আর এখন নিজে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি বেতো রোগ কারে কয়!

হেসে ফেলল তুষার।

-তবুও তো সাবধানে চলাফেরা করতে হয়, নাকি! বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে বিছানায় পড়লে ভালো লাগবে?

-তুমি আছো কী করতে? তুমি দেখবে। সেবা করবে। এতকাল আমি তোমাদের খাতির যত্ন করে এলাম আর এখন তোমরা আমাকে দেখবে না?

-আরে না, ব্যাপারটা তা নয়। অসুস্থ হলে কি তোমাকে ফেলে রেখে আমরা ঘুরে বেড়াবো! তোমারই তো কষ্ট হবে সবচেয়ে বেশি।



আমার বেশ মজা লাগছিল। পুরুষ মানুষ, বিশেষ করে তুষারের মতো মানুষকে খুব সহজেই বাগে আনা যায়। এই যে ঘটনাটা ঘটল এতে কিন্তু আমারই লাভ হল। কী রকম? যেমন- তুষার এখন আমার সঙ্গে থাকবে। সামান্য এদিক-ওদিক হলেই কপালে জিজ্ঞাসা চিহ্ন আঁকবে। নইলে তো পুজো দেওয়ার কথা শুনলেই এদিক ওদিক সরে পড়ত। আমি শুকনো কাঠের মতো মুখ করে বললাম,

-ঠিক আছে। অত চিন্তার কিছু নেই। এখন চলো আমার সঙ্গে। পুজো দেবো।

তুষার গলায় নিমপাতা গিলল।

-ওহ্... পুজো দেবে... বেশ তো দাও না। পুজো দিলে যদি তোমার মন শান্ত হয় সে তো ভালো কথা।

-অ্যাই! মন শান্ত হয় মানে কী? আমি কখন বললাম যে আমার মন উতলা হয়েছে?

-না, মানে...

-কী মানে মানে করছো? এখন মুখ দিয়ে চোপা সরছে না কেন? দ্যাখো বাপু, তোমরা বাপ-বেটি ম্লেচ্ছ হতে পারো। তাই ব'লে আমি নই।

তুষার দাঁড়িয়ে পড়লো।

-দাঁড়িয়ে পড়লে যে! এসো আমার সঙ্গে।

তুষার জ্যাকেটের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করলো।

-তুমি এগোও আমি আসছি।

- আচ্ছা আমি কী এমন খারাপ বলেছি শুনি? তোমরা ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাস করো না। আমি বাড়িতে না থাকলে ধূপধুনো জ্বলে না। আচার-বিচার-ধর্ম কোনও কিছুই মানো না। তার ওপর ম্লেচ্ছ বলেছি বলে গোঁসা হলো! ওসব ঠাট অন্য কাউকে দেখিও। চলে এসো। এসো বলছি!

-বললাম তো তুমি যাও আমি আসছি।

ও সিগারেট ধরিয়ে লাইটারটা পকেটে চালান করে ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। লোকটা যাচ্ছেতাই রকমের গোঁয়ার। পান থেকে চুন খসেছে কি অমনি শালিকের মত রোঁয়া ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে! আমিও বুনো ওল! কত ধানে কত চাল সেটা আমিও দেখাচ্ছি!

-কী হলো?

-কিছু না।

-কিছু না বললেই হলো!

-তবে কী বলবো? তোমার বিশ্বাস তোমার কাছে থাক, আমার টা আমার কাছে। এ নিয়ে তর্ক করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই আমার।

আমি ঠোঁট ওল্টালাম।



-তর্ক করতে দায় ঠেকছে না! বলি পুজো কি আমি নিজের জন্য দিচ্ছি?

-এসব ব্যাপারে আমি লেস ইন্টারেস্টেড।

-তা থাকবে কেন! মুখেই যত ভালোবাসা আদিখ্যেতা, তাই না?

-হেঁয়ালি না করে যা বলার স্পষ্ট করে বলো।

-বলি সারাক্ষণ যে খালি তিথি তিথি করো, মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়েছ একবারও?

-কেন তাকাবো না!

-তারপরেও বসে থাকবে চুপচাপ?

তুষার রাস্তার ধারে বাঁধানো একটা বেঞ্চের ওপর বসলো। আমি ওর কাঁধে হাত রাখলাম।

-সবটা মানুষের হাতে থাকে না তুষার। কম চেষ্টা করেছি বলো? এতদিনেও কিছু হল না যখন...

-তখন পাথরের মূর্তির কাছে ভিক্ষা চাইবো! অদ্ভুত!

আমি ওর মাথায় হাত বোলাতে লাগলাম।

-তোমাকে কারো কাছে কিছু চাইতে হবে না। আমি চাইবো, ভিক্ষা- মেয়ের খুশি। তুমি শুধু সঙ্গে থাকবে।

-বেশ। তাইই হবে।




তুষারকে বড্ড এলোমেলো মনে হলো। আমি বসলাম বেঞ্চে। ওর পাশে। সন্দীপন মারা যাবার পর থেকে মেয়ে আমার ঘাড় গুঁজে বসে আছে। এতদিনেও কোনও পরিবর্তন হলো না! যে মানুষটা ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে তাকে বাইরে থেকে বাঁচানো কঠিন। আমাদের সামনে হেসে হেসে কথা বলে। এমন ভাব করে যেন কত সুখে আছে। আমি তো মা! আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া কি অতই সহজ! সামনে কিছুটা চড়াই ভেঙে রাস্তাটা যেখানে বাঁদিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে দেখা যাচ্ছে তিথিকে। হাতে ক্যামেরা নিয়ে একপাল বাঁদরের ছবি তুলছে নানান কায়দায়। একটুও ভয়ডর নেই! বলি আঁচড়ে-কামড়ে দিলে কী হবে! আর বাঁদরগুলোও জুটেছে সেইরকম। দেখে মনেই হচ্ছে না ওরা বিন্দুমাত্র বিরক্ত হচ্ছে বলে! উল্টে কতরকম ভঙ্গি করে পোজ দিচ্ছে! আদিখ্যেতা কাকে বলে আর কী! মাঝেমধ্যে দু-একজনের হাত চেপে ধরছে। ফলমূল বিস্কুট কিছু না কিছু আদায় করে তবেই ছাড়ছে। কিন্তু আশ্চর্য, ওরা তিথিকে একটুও বিরক্ত করছে না বরং ছবি তুলতে পেরে বেজায় খুশি। কেউ কেউ আবার অত্যুৎসাহী হয়ে ছবি তোলার পর তিথির হাত থেকে ক্যামেরায় দেখে নিচ্ছে ছবিটা ঠিকঠাক উঠেছে কিনা! আমি তুষারের হাত ধরে ইশারা করতে যাবো হঠাৎ দেখি তুষার হো হো করে হেসে উঠলো। আর নিজেকে চেপে রাখা গেল না। শেষমেশ আমিও সঙ্গত করতে বাধ্য হলাম। পেটে খিল ধরে গেল হাসতে হাসতে। তুষার তো পারলে বেঞ্চে গড়াগড়ি দেয় আর কী! আমি তাল ঠিক রাখতে না পেরে বারেবারে ঢলে পড়ছি ওর গায়ে আর আমাদের এই ছেলেমানুষি কাণ্ড দেখে লোকজন ব্যাপারখানা না বুঝেই হাসতে শুরু করে দিল।




এই গোটা ব্যাপারে আমি অবাক হয়ে গেলাম! আমি হাসছি! সত্যিই কি হাসছি? নাকি কাঁদছি? গাল ভিজে গেছে। কেন এমন হলো? কেমন এক দো-আঁশলা অনুভূতি! একই সাথে হাসি আর কান্না! এটা কী করে সম্ভব? কেন এমন হয়? কখন হয়? জমে থাকা কষ্টগুলো কখন হাসি হয়ে যায়? আমি ধরতে পারছি না এই রহস্য। আচ্ছা, তুষারকে জিজ্ঞেস করবো? ও কীভাবে নেবে? যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা। আমার সবকিছুতেই ও দোষ খুঁজে পায়! এসব কথা ওকে বললে নির্ঘাত হেসে উড়িয়ে দেবে। তারচেয়ে চুপ করে থাকাই ভালো। তুষার চশমাটা এক হাতে ধরে অন্য হাতে রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে। মাঝে মাঝেই তাকাচ্ছে তিথির দিকে। এই যে এত কিছু ঘটে গেল তিথি কিন্তু কিছুই দেখেনি। ও এখন দুটো বিদেশির সাথে কথা বলছে হেসে হেসে। কী কথা হতে পারে? ওই বিদেশিরা বোধহয় কিছু জিজ্ঞেস করছে ওকে। কী জিজ্ঞেস করতে পারে? আচ্ছা, ওরা এত লম্বা কেন? আমি কতকিছুই জানিনা। না জানাটা কি দোষের? তাই যদি হয় সে দায় কার? আমার? অথচ আমি তো এমন ছিলাম না! ছোটবেলায় সব ব্যাপারে এত প্রশ্ন করতাম সবাই বিরক্ত হয়ে যেত। তবুও প্রশ্ন করতাম। স্কুলে-কলেজে আমার এই স্বভাবের জন্য সবাই ঠেস মেরে বলতো আমি নাকি "প্রশ্নকুমারী!" আচ্ছা, প্রশ্ন করা কি খারাপ? আমার সমস্ত প্রশ্নের মুখে নুড়ো জ্বেলেছে সংসার! বিয়ে হলো, সংসার হলো। ফাইফরমাশ খাটতে খাটতে আমি প্রশ্ন করতে ভুলে গেলাম। কী অদ্ভুত! ওরা আমার প্রশ্নগুলোকে খুন করল! ওদের কোনও শাস্তি হবে না? বিচার হবে না?



আমার বাপের বাড়ি ছিল জলঙ্গি। ছিল একটা সময়। আজ আর কিছুই নেই। বাবা মারা গেছিল আমার বিয়ের আগেই। মা একাই থাকতো। আমরা পাঁচ বোন। আমি ছোট। বড় আর মেজ-র বিয়ে হয়েছিল ফারাক্কায়। সেজ-র সাগরপাড়ায়। আর ছোট-র দমদম। গাছ-গাছালি আমার ভীষণ প্রিয়। সেই ছোটবেলা থেকেই গাছেদের প্রতি আমার ভীষণ টান। বাড়িতে আম কাঁঠাল পেয়ারা- কত রকমের গাছই না ছিল। মাটির উঠোন। ছোট ছোট লতা পাতা দিয়ে ঘেরা ছিল বাড়ির চৌহদ্দি। পেছন দিকে একটা পুকুর ছিল। সাঁতার কাটতাম সেখানে। সাঁতার কাটতে এত ভালো লাগতো। আমার এক বন্ধু ছিল। খুব কাছের- কাজলি। বেশিরভাগ সময়ই আমরা একসাথে থাকতাম। আমাদের সঙ্গে খেলা করতো দিপালি। আমার বড়দির মেয়ে। বয়সে আমরা প্রায় পিঠোপিঠি ছিলাম। ওর বিয়ে হয়েছে গণকর-মির্জাপুর। জামাই রেলে চাকরি করে। কতদিন কাজলির সঙ্গে দেখা হয়নি। কী অপরূপ সুন্দরী। কেমন আছে কে জানে! একদিন তুষারের বাড়ির লোকজন এল আমাদের বাড়ি। আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছিল। এই গ্রাম গাছপালা বন্ধুবান্ধব সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হবে ভেবেই কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে এল। আমি চুপিচুপি পালাতে যাবো, হঠাৎই আমার হাত ধরে ফেলল মা।

-কোথায় যাচ্ছিস?

-আমি বিয়ে করবো না।

-তবে কি সারাজীবন আইবুড়ো হয়ে ঘরে বসে থাকবি?  -তা কেন! চাকরি করবো। নিজের পায়ে দাঁড়াবো। বিয়ে দিয়ে যদি ভাগিয়েই দেবে তবে ইউনিভার্সিটিতে পড়ালে কেন?

-চুপ! বড় বড় কথা বলিস না। চল, তৈরি হয়ে নে।

-মানে?

-ন্যাকামো করিস না। ভেতরে গিয়ে শাড়িটা পাল্টে আয়।

সেদিন থেকে একটার পর একটা লাগাম পরানো হলো আমার ইচ্ছের গলায়। আমি আমার স্বপ্নগুলোকে অসহায় ভাবে মরে যেতে দেখলাম! ওরা কাঁদছে, যন্ত্রণায় ছটফট করছে, মাটিতে লুটোচ্ছে অথচ আমি কিছুই করতে পারছি না! আমার দুটো হাত শাঁখা-পলা দিয়ে বাঁধা!




আমার শ্বশুর বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদের সাটুই গ্রামে। একান্নবর্তী পরিবার। শ্বশুরমশাইয়ের ছিল মুদিখানা দোকান। সে আমলে বেশ চালু ছিল। বাড়িতে সবসময় গমগম করত লোকজন। আমার এবাড়িতে আসার অনেক আগেই গত হয়েছিলেন তুষারের বাবা। আনকা পরিবেশে একজন মানুষকে আমার দাদার মতো মনে হয়েছিল। আপন। জন্মসূত্রে আমার কোনও দাদা বা ভাই নেই। এবাড়িতে আসার পর বুঝলাম দাদার স্নেহ কাকে বলে। আমার মেজ ভাসুর। গ্রামের মানুষদের বিপদে-আপদে এককথায় পাশে দাঁড়াতেন। আমি ঈশ্বরকে কোনওদিন দেখিনি। কিন্তু ঈশ্বর আমাকে দর্শন দিয়েছেন বিকাশ সরকারের বেশে। তার জন্য আমার ভয় ভক্তি ভালোবাসা তিনটেই ভরপুর ছিল। তুষারের মা বড়মা মেজবৌদি সেজদা ভাইপো ভাইজি সবাইকে নিয়ে বিরাট এক পরিবার। বিয়ের আগে পদ্মার ভাঙন দেখেছিলাম। তারপর একদিন দেখলাম এই পরিবারের ভাঙন। প্রিয় মানুষগুলো সকলকে ছেড়ে ফিরে গেল না ফেরার দেশে। এখন তাদের স্মৃতিগুলো ছুটে বেড়ায় এ বাড়ির আনাচে-কানাচে। তুষারের অফিস ছিল কলকাতায়। বেশ কয়েক বছর বড়দার বাড়ি থেকে অফিস করতো। বড়দার বাড়ি হালিসহর। সেখানে আমাদের সংসার হলো। ততদিনে আমার কোলে এসে গেছে তিথি। তারপর কত ভাঙা-গড়া ওঠা-নামা পেরিয়ে বহরমপুরে আমাদের একটা বাড়ি হলো। তুষার বরাবরই একটু অন্যরকম। কলকাতার জল-হাওয়া ভিড় ওসব ধাতে সইল না। চলে এল বহরমপুরে। ওর একটা নিজস্ব দুনিয়া আছে। সেখানে আমাদের ঢোকার অধিকার ছিল না। আজও নেই। এসব গভীর অনুভবের ব্যাপার। যারা বোঝেনা তারা বলে ওর মাথাটা একেবারে গেছে। এই জগতে কে কার খোঁজ রাখে! আপনি বাঁচলে বাপের নাম। এখানে কেউ কারোর না। যেসব রাতে ঘুম আসে না, আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি। অন্ধকার ঘরে জানলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কত কিছু ভাবি। সবটা যে আমার জানা বিষয় তাও না। তবুও ভাবি। বেশ লাগে। আমি ভাবি, এই যে সমাজ ধর্ম দেশ এসবের পাশাপাশি সমান তালে বয়ে যাচ্ছে একটা নদী। কেমন তার রঙ?



-অদিতি?

-আমি ফিরে এলাম হাজার হাজার মাইল দূর থেকে। উড়ে উড়ে, ভেসে ভেসে। তুষার আমাকে ডাকছে।

-বলো।

-কী ভাবছো?

-ভাবছি, সে অনেক কথা।

-কী কথা?

-শুরু করলে এক জীবনে শেষ হবে না!

তুষার মাথা চুলকায়। গভীর নদের মতো চোখ রাখে আমার চোখে। দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে।

-মাঝে মাঝে তোমাকে বড়ো অদ্ভুত লাগে!

-কেন?

-আমি তোমাকে ঠিক মতো বুঝতে পারিনা। মানে, এই ভীষণ চেনা চেনা লাগে তো কখনো আবার একেবারে অচেনা!

আমি হাসলাম।

-সে তো আমারও হয়। আমি নিজেও কি ছাই তোমাকে বুঝতে পারি!

-সত্যিই, এতগুলো বছর একসঙ্গে কাটিয়ে দেওয়ার পরও কত সংশয়! আসলে একটা মানুষকে পুরোপুরি বুঝে ওঠা অসম্ভব। এত লেয়ার! একটার পর একটা। তারপর আরেকটা। এভাবে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতেই দিন কাবার। যাক গে, ছাড়ো এসব কথা। ব্যথা কমেছে?

-আগের থেকে কম।

-বেশ বেশ। চলো এবার ওঠা যাক।

তুষার ওর ডানহাতটা বাড়িয়ে দিল। আমি ওর হাতে হাত রাখলাম।

28 views0 comments