Search

বইপত্র আলোচনায় আকাশ সাহা


উপন্যাস - সোনালি অর্কিড

লেখক - সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

প্রকাশনী - আনন্দ পাবলিশার্স

মূল্য - ২০০/-

আলোচক - আকাশ সাহা


"পৃথিবীর সব সুন্দর মানুষের হাতে তুলে দেওয়া ঠিক নয়। ছবি তুলতে পারলেই যথেষ্ট। সুন্দরের প্রতি মায়ায় পড়ে যায় মানুষ। তৈরি হয় অধিকারবোধ। পৃথিবীর সব জিনিসই তো নশ্বর। চোখের সামনে সুন্দরের মৃত্যু সহ্য করা ভারী কঠিন। তার চেয়ে আড়ালেই মরে যাক তারা।"


আমাদের এই জীবন ষড়রিপু দ্বারা আস্টেপৃষ্টে নিয়ন্ত্রিত, আমরা চাইলেও তার থেকে সহজে মুক্তি পেতে পারিনা। আমাদের চারপাশের প্রকৃতি মানুষজন তাদের আচার ব্যবহার এবং শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার সবচেয়ে জরুরী যে জিনিস তা হলো অর্থ, এইসমস্ত কিছুই আমাদের পারিপার্শ্বিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান কারণ। সোনালি অর্কিড শেষ পর্যন্ত সত্যের কথা বলে শেষ অব্ধি এই উপন্যাস মানুষের চিরন্তন প্রেম তার আকাঙ্খা এবং জৈব প্রবৃত্তি এইসমস্ত কিছুকেই নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে। এই উপন্যাসের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এক সামাজিক দায়িত্ববোধ পালন করা মানুষের চরিত্র, একজন বেকার ছেলের অর্থের লোভে নতুন রোমাঞ্চকর একটি অভিযানের কাহিনী, মেয়েদের চিরন্তন ভালোবাসা, কাঠিন্য আর প্রকৃতির সৌন্দর্যের ভিড়ে মিশে থাকা চিরন্তন এক সত্যি, যা পাঠককে উপন্যাসের শেষ বিন্দু পর্যন্ত নিয়ে যেতে বাধ্য করে।


"Love encompasses a range of strong and positive emotional and mental states, from the most sublime virtue or good habit, the deepest interpersonal affection and to the simplest pleasure."(Wiki)


উপন্যাস শুরু হয় এক ট্রেন যাত্রাপথের বর্ননা দিয়ে। যেখানে শাক্য বলে একটি সুদর্শন বেকার ছেলেকে অমিত গুপ্ত নামে এক নামী ব্যাক্তি একটি গোপন অভিযানে পাঠিয়েছেন। এক বাবা তার মেয়ের সুরক্ষার জন্য যা যা করতে পারেন অমিত গুপ্ত ঠিক তাই করেছেন। তার মেয়েরা চার বান্ধবী মিলে কলেজ জীবনের শেষ পর্যায়ে এক পাহাড় ভ্রমণে যাচ্ছে। কিন্তু, তারা সবাই একা। তাদের সাথে বড়ো কেউ থাকবে না। তাই তার মধ্যে মেঘমালার বাবা লুকিয়ে শাক্যকে হায়ার করেছে তাদের উপর নজর রাখার জন্য, অন্যদিকে যদি মেঘমালার কোনো বিপদ হয় তাকে রক্ষা করার জন্য। উপন্যাসটি শুরু থেকেই একটা দারুণ গতি ধরে নেয় যা পাঠককে একদম শেষ পেজ অব্ধি নিয়ে যেতে বাধ্য করে। উপন্যাস এরপরে বাঁক নিতে থেকে এক একটি নতুন ঘটনায়, শাক্যর ট্রেন জার্নির বর্ননা সেখানে প্রথম আলাপ হওয়া সেই চারজন মেয়ের সাথে তার কথা তারপর মালবাজার স্টেশনে নেমে রুদ্ধশ্বাস কিছু ঘটনা পাঠককে মুহুর্তের মধ্যে গল্পে আটকে রাখে, এই উপন্যাসের বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো পাহাড়, যারা সত্যিকারের পাহাড় খুব ভালোবাসে তাদের এই উপন্যাস স্বপ্নের মধ্যে পড়তে পড়তে সেই সুলতালেখালার অঞ্চলে নির্জন নদীর ধারে নিয়ে যাবে যেখানে ছোট কটেজ প্রচন্ড শীত, মা মেয়ের চা- মোমোর দোকান আর ফেলে আসা স্মৃতি অরণ্যে খুঁজে যায় সোনালি অর্কিড যা পুরো ভারতেই খুব দুষ্প্রাপ্য।


উপন্যাসের এক পর্যায়ে এসে শাক্যর সাথে পরিচয় হয় রন-র। যে আসলে একজন সখের ফটোগ্রাফার, যার জীবন জুড়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র উপকথা যা পাঠক উপন্যাসের শেষ দিকে এসে পুরো জানতে পারবে। চারজন মেয়ের মধ্যে পূর্বার অপূর্ব গানের গলা, রবীন্দ্রসংগীত আর পাহাড়ি অঞ্চল মিলে তা এক অসামান্য পরিবেশ গড়ে তোলে, মাঝে মাঝে মনে হয় আরে শাক্য বলে লেখক আসলে যে চরিত্রটি সারা উপন্যাস জুড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন সেই ছেলেটি কোনোভাবেই আমরা নিজে নইতো! প্রত্যেকটি মানুষ শাক্যর মধ্যে আসলে নিজেকেই খুঁজে পাবে। কারণ, মানুষের চরিত্রে সাদা ও কালো দুটি পর্দা থাকে আর এই চরিত্রের মধ্যেও লেখক যেনো সেটাই পরিস্কারভাবে তুলে ধরেছেন।


তবুও এই উপন্যাসে মানুষের চিরন্তন প্রেম আকাঙ্খা ছাড়াও আছে এক নিদারুণ সত্যি কেনো চারজন মেয়ে এত ছোট বয়সে পাহাড়ে একা ঘুরতে আসে? কেনো মেঘমালা প্রথম থেকেই সন্দেহ করে শাক্যকে? কী সত্যি লুকিয়ে আছে এই চারজন মেয়ের মধ্যে? শেষ পর্যন্ত উপন্যাস কোন নিদারুণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের। এর উত্তর উপন্যাসের শেষে পড়লেই পাঠক একনিমেষে চমকে উঠবে।


"হারিয়ে ফেলা সময় ফেরত আসে না জেনেও মানুষ আকুল প্রার্থনায় থাকে। কেউ সজ্ঞানে, কেউ বা অজ্ঞানে। "


"Not just beautiful, though—the stars are like the trees in the forest, alive and breathing. And they’re watching me."


(Haruki Murakami)


ভালোবাসার চিরন্তন দায় থেকে আমরা কখনোই সরে আসতে পারিনা যেমন পারিনা শাক্য আর মেঘমালাকে উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে একা ছেড়ে দিতে তারপর কী হয় তা জানার উদ্বেগ আমাদের কুঁড়ে কুঁড়ে শেষ করে দেয় কিন্তু লেখক নিপুণ হাতে ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে পূর্বার মুখ থেকে সেই অমোঘ সত্যের কথা বলিয়ে দেন -


"প্রেমের চেয়ে ঘন জমাট কিছু দুটি নেই, হাজার চেষ্টা করেও ভেঙে টুকরো করে তার ভাগ দেওয়া যায় না।"


উপন্যাস 'সোনালি অর্কিড' সেই প্রেম ভালোবাসা আকাঙ্খার এক অপুর্ব মিশ্রণ আমাদের সামনে রাখে যেখানে, অর্কিডের মতোই দুস্পাপ্য এই প্রেম যেনো শতাব্দীতে দু'একটা হঠাৎ ঘটে যায়, যা আমাদের জন্য সযত্নে লেখক তুলে রাখেন তার উপন্যাসের মধ্যে।

14 views0 comments