Search

বইপত্র আলোচনায় দীপাঞ্জন দাস


বইয়ের নামঃ বিশ বৈঠার নাও

লেখকঃ শাশ্বত ঘোষ

প্রকাশকঃ লালমাটি

মূল্যঃ ৩২০/-

আলোচকঃ দীপাঞ্জন দাস





এই বইয়ের প্রথমেই যে বিষয়টি আমাকে আকর্ষিত করেছে তা হল বইটির নামকরণ। সর্বমোট কুড়িটি গল্পের সমাহারে লিখিত বইটির প্রথম গল্প ‘বাঘুড়ির মাঠ’। গল্পে উঠে এসেছে হেরম্বপুরের জমিদারীর কথা। এই সম্পত্তির বর্তমান মালিক এই সুবিশাল সম্পত্তি বিক্রি করার উদ্দেশ্যে হাজির হন জমিদারবাড়িতে। কিন্তু, তাঁর পরেই ঘটতে থাকে কিছু অলৌকিক ঘটনা। আসলে এই গল্প তুলে ধরেছে রাজপরিবারের এক ভয়ঙ্কর স্বভাবের কথা। বিনোদনের উদ্দেশ্যে বাঘহত্যা প্রকৃতির সাথে আমাদের যে দূরত্ব গড়ে তুলেছে, তাঁর এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে গল্পটিকে দেখা যায়।

দ্বিতীয় গল্প ‘অবসর’। গল্পের মূল চরিত্র মৃণ্ময়ীদেবী ও সুতপা। পুরানো বন্ধুদের বহু বছর পরে দেখা হওয়ার পরেই আলোচনায় উঠে আসে জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের কথা।



মুহূর্তের মধ্যেই সময়ের ব্যবধান মিটে গিয়ে অবসর যাপনের সঙ্গী হয়ে ওঠার অঙ্গীকারেই গল্পের সমাপ্তি। গল্পটি আসলে বন্ধুত্বের কথা বলেছে, বলেছে ঘরে ফিরে আসার কথা।


তৃতীয় গল্প ‘বরণ’। দুর্গাপুজোর প্রেক্ষাপটে রচিত এই গল্পে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর জন্য দায়ী করে সমগ্র পবিত্র অনুষ্ঠান থেকে ব্রাত্য হয়ে পড়েন রঞ্জনা। বাস্তবিক সে-ই দোষী নাকি কুসংস্কারের ছোঁয়ায় তাকে অচ্ছুৎ করে রাখা হয়েছিল? সেই চিরাচরিত দ্বন্দের কথায় লেখকের লেখনীতে স্পষ্ট হয়েছে।

চতুর্থ গল্প ‘ব্রাত্য’। দুই ভাইয়ের গল্পের আড়ালে সমাজের এক ভিন্নরুপকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে এই গল্পে। নির্দিষ্ট ধাঁচের বিপরীতে গড়ে ওঠা সকলকেই সমাজ অপ্রয়োজনীয় বলে দূরে সরিয়ে দেয়। হয়তো নিজের মানুষেরাও সেই গোলকধাঁধার বাইরে নন। সমাজ কি হাতের ওই ভিন্ন আঙুলকে মেনে নিতে পারে নাকি জীবনযুদ্ধে হেরে যায়? সেই নিয়েই এই গল্পটি লেখা হয়েছে।



পঞ্চম গল্প ‘এক টুকরো মেঘ’। ভালোবাসা ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নীচ মেনে চলে না। প্রকৃতির অন্য সবকিছুর মতো ভাবনাটাই সেখানে মূল। পক্ষীরাজের কাহিনির বাইরে যে বাস্তবতা থাকে, এই গল্পে সেই ছোঁয়া রয়েছে। শত লাঞ্ছনার পরেও যাপনকে সঙ্গী করতে যুদ্ধকে আশ্রয় করা যায় কি না, তা ভাবতে বাধ্য করেছে।

ষষ্ঠ গল্প ‘অবিনশ্বর’। সামাজিক গল্পের আড়ালে এই গল্পটিকে শিক্ষামূলক গল্প হিসেবে দেখায় সঠিক হবে বলে মনে হয়েছে। মৃত্যুর পরেও কি বেঁচে থাকা যায়? অন্যের জীবনপ্রদীপ হয়ে সেই অমরত্বের কাহিনিই লিখতে চেয়েছেন লেখক।

সপ্তম গল্প ‘যন্ত্রমানব’। গণধর্ষণের ভয়ঙ্কর ঘটনাবলী কীভাবে গ্রাস করেছে সমাজকে তাঁর এক উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন লেখক। আমাদের মৌন মিছিল, ক্যাণ্ডেল মার্চের ছায়ায় অনেক সময় প্রকৃত ঘটনা থেকে যে আমরা অনেক দূরে চলে যায়, তা গোপন করা যায় না। সময়ের স্রোতে তাই পাপড়িরা ধুয়ে যায়। আমরা সব জেনেও অকেজো হয়ে যায়, যন্ত্রের মতোই সিস্টেমের জালে আবদ্ধ থাকি।

অষ্টম গল্প ‘পাসওয়ার্ড’। গোপন পাসওয়ার্ড পরিচিত কলিগকে বলে যাওয়ায় চাকরী খোওয়াতে হয় অভিজ্ঞানকে। সেই থেকে শুরু নতুন সংগ্রাম। পুরানো সম্মান পুনরূদ্ধারের গল্প এটি। গল্পটি ভালো লাগলেও আমার কাছে অনেক বেশি নাটকীয় ঠেকেছে।



নবম গল্প ‘ওরা বেঁচে থাকে’। সুন্দরবন বেড়াতে গিয়েছে কিছু কলেজ বন্ধুদের দল। শহুরে আদবকায়দায় অভ্যস্ত মানুষেরা খোঁজ পেয়েছে গ্রাম্য যাপনের। ওদের জীবনের সাথে বিশ্বাস ও বিধি একাকার হয়ে যে জীবন সংগ্রামের কাহিনি লেখক তুলে ধরেছেন তা অনবদ্য। গল্পের প্রয়োজনেই লেখক বনবিবি, দক্ষিণারায়ের বর্ণনা দিয়েছেন যা শহুরে জীবনের আয়েশের থেকে বহুদূরে অবস্থিত।

দশম গল্প ‘তবু ফিরে এসো’। গল্পটি প্রেমকাহিনি হিসেবেই লেখা হয়েছে। সময়ের সাথে বদল হয় পরিস্থিতির। সেই বদলের মধ্যে থাকে কিছু বাধ্যবাধকতা, কিছু অবিশ্বাস। শারীরিক অক্ষমতাও অনেক সময় মনের মধ্যেই বিস্তার করে মিথ্যে ভাবনার মায়াজাল। এই গল্প সেই অবিশ্বাস থেকে বিশ্বাসের পথে উত্তরণের।

একাদশ গল্প ‘যাবজ্জীবন’। সমগ্র পৃথিবীতে মনুষ্যেতর প্রাণীদের ওপর সভ্য মানুষদের দ্বারা ঘটে বীভৎস কিছু অত্যাচার। প্রথাগত সেই ঘটনাবলী আইনসম্মত না হলেও আজও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। পিত্তরস সংগ্রহের জন্য তাদের উপরে চলে অকথ্য অত্যাচার। সেই ঘটনাবলীকেই অবলা প্রাণীদের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন লেখক যা, অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য।

দ্বাদশ গল্প ‘পরম্পরা’। এই গল্পে উঠে এসেছে ঢাকীদের কথা। নিজেদের পরম্পরা বাঁচিয়ে রাখার জন্য সারা বছর কষ্টসাধ্য জীবনযাপন করে দুর্গাপুজোর সময় তারা পাড়ি জমায় বিভিন্ন দুর্গামণ্ডপে। শিল্পী হিসেবে যোগ্য সম্মান মেলে না। মেলে কিছু নগদ অর্থ, তাও অপর্যাপ্ত। সেই ভাবনা এই গল্পের মূলবস্তু যা প্রতিষ্ঠা দেয় শিল্পীর আত্মমর্যাদাকে।

ত্রয়োদশ গল্প ‘খিদে’। পেডোফিলিয়া এক ভয়ঙ্কর সামাজিক ও মানসিক ব্যাধি। সেই বিষয়কে ভিত্তি করেই এই গল্পটি লেখা হয়েছে। যৌন লালসা পরিতৃপ্তির জন্য আত্মীয়, সম্পর্কও যে বহুক্ষেত্রেই কোনও প্রাচীর গড়ে টূল্টে সক্ষম হয় না, তা লেখকের লেখনীতে স্পষ্ট হয়েছে। সামাজিক যে বার্তাটি লেখক দিতে চেয়েছেন তা লেখনীর গুণে উজ্জ্বলতর হয়েছে।

চতুর্দশ গল্প ‘নিঃস্ব দিনলিপি’। এই গল্পের মূল চরিত্র রসায়নের অধ্যাপক ডক্টর সামন্ত। ট্রেনের কামরায় ভ্রমণরত অবস্থায় তাঁর স্মৃতিতে জেগে ওঠে ছোটবেলার কিছু ঘটনাবলি। প্রেম, বিচ্ছেদ ও জীবনের আকস্মিক পরিবর্তন-সব কিছুই ঘটে চলে। কিন্তু, এই ঘটনাবলীর আড়ালে ফুটে ওঠে জিঘাংসার এক ভয়ংকর ছবি, যা বর্তমান সমাজের এক কদর্য রূপের বহিঃপ্রকাশ বললেও ভুল হয় না।

পঞ্চদশ গল্প ‘রাত জাগা তারা’। এই গল্প খানিক নীতিশিক্ষা দেয় বইকি। জাগতিক সম্পদ, বৈভব ও ভোগের থেকেও বড় রাজ-ঐশ্বর্য যে অনুভূতির সমুদ্রে তৈরি গুপ্তধন, তা লেখক ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

এরপরের গল্প ‘মন্দ-ভালো’। এই গল্প বন্ধুদের, বন্ধুত্বের। পুঁথিগত শিক্ষার সাথে দ্বন্দ্ব মানবিক শিক্ষার, মনুষত্বের শিক্ষার। আর সেই দোলাচলে কাহিনি এগিয়েছে এবং তথাকথিত মন্দের কাছে মেকি সৌজন্যের পরাজয় ঘটেছে। এই গল্পটিও জীবনের কাহিনি বলে, আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতের কাহিনি বলে।

এরপরের গল্প ‘কৃষ্ণকলির কথা’। ইছামতী নদীকে বাঁচানোর জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন সাবর্ণ সরস্বতী। যে অভিশাপ আমরা নগরায়নের নামে প্রকৃতি থেকে গ্রহণ করছি প্রতিনিয়ত এই গল্প তাঁর বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদরূপেই লেখা হয়েছে বলে আমার মনে হয়।



পরবর্তী গল্প ‘পাষাণ’। এই গল্পটি ‘অ্যাক্টিভ ইউথেনেশিয়া’-এর ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। গল্পে কোথাও এই ‘কৃপা-হত্যা’-কে সমর্থন না করলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানুষ চরম অসহায় হয়ে এইরূপ ভয়ংকর সিদ্ধান্তে উপনীত হতেও দু’বার ভাবে না, তা লেখক দ্ব্যর্থহীনভাবেই ফুটিয়ে তুলেছে বলেই আমার মনে হয়েছে।

পরবর্তী গল্প ‘বিলুপ্ত অধ্যায়’। অতীতে ঘটে যাওয়া কোনও নারকীয় ঘটনা সারাজীবন মানুষকে কুঁড়ে কুঁড়ে দগ্ধ যেমন করতে পারে, তেমনই অন্যের জীবনে নিয়ে আসতে পারে বিভীষিকা। এখানে সেই রকম একটি ঘটনাবলীর বর্ণনা রয়েছে। র‍্যাগিংয়ের ভয়াবহতা যে সুস্থ সমাজের জন্য কাম্য নয় সেই বার্তা সঠিকভাবেই দিয়েছেন বলে আমার মনে হয়।

অন্তিম গল্প ‘শেষ থেকে হোক শুরু’। এই গল্পটি লেখার জন্য লেখক কল্পবিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়েছেন। বিজ্ঞানের আশীর্বাদ কীভাবে অভিশাপ হয়ে যেতে পারে তাঁর বর্ণনা যেমন রয়েছে তেমনই লেখক আবিষ্কারককেই যে শেষে এগিয়ে রেখেছেন, তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।



কুড়িটি ভিন্নস্বাদের গল্প নিয়ে রচিত এই বইটি আমার ভালোই লেগেছে। তবে, বেশ কিছু বানানভুল সংশোধন করা উচিৎ ছিল। বিশেষত ‘কি’ ও ‘কী’-এর প্রয়োগে অসংখ্য ভুল বিরক্তির সঞ্চার করে। এগুলি আগামী মুদ্রণে সংশোধিত হবে বলেই আশা রাখলাম।

5 views0 comments