Search

বছরের প্রথম দিনে ।। ধারাবাহিক ।। সমীরণ সরকার


যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডার

সমীরণ সরকার


দ্বিতীয় পর্ব

রাজপুর মোরাম মাটির এলাকা। মাটির নীচে পাথরের স্তর। বেশিরভাগ বাড়িতে তাই দৈনন্দিন ব্যবহারের জলের প্রয়োজন মেটাতে কুয়ো কাটা আছে।সেই কুয়ো প্রায় পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ ফুট গভীর। মাটির নিচে পাথরের স্তর সর্বত্র একভাবে থাকেনা । সব পাথরের স্তরের ঘনত্ব বা কাঠিন্য ও একরকম নয় । তাই মাটি কাটতে কাটতে যতদূর যাওয়া সম্ভব, যে স্তরে গিয়ে মনে হয় যে জল পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেই পর্যন্ত মাটি - পাথরের চাতাল কেটে কুয়ো তৈরি হয়েছে । কুয়োর গভীরতা তাই একেক জায়গায় একেক রকম ।কুয়োর নীচ থেকে ইঁট দিয়ে বাঁধিয়ে উপর পর্যন্ত তোলা হয়েছে। তবু সব কুয়োর জল সরবরাহের ক্ষমতা সমান নয়।



সবার বাড়িতে আবার ব্যক্তিগত কুয়ো নেই। তাদের ব্যবহারের জন্য রাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় কিছু কমন কুয়ো আছে। চৌদ্দ পাড়ার রাজপুর গ্রামের সব পাড়াতেই তেমন এক বা একাধিক কমন কুয়ো আছে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য। তবে রাজপুরের সব কুয়োকে টেক্কা দেয় রাজপুর থানার সামনের কুয়োটা। এটা সবচেয়ে বড় ডায়ামিটারের কুয়ো। এই কুয়োর জল সরবরাহের ক্ষমতা রাজপুরের যেকোন কমন কুয়োর থেকে ঢের বেশি। তাই এই কুয়ো থেকে জল তোলা শুরু চলে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত।

রাজপুরে একশ্রেণীর লোকের জীবিকা হচ্ছে বিভিন্ন বাড়ি, চায়ের দোকান, মিষ্টির দোকান ইত্যাদির প্রয়োজন মতো জল সরবরাহ করা। এদের চলতি কথায় বলা হয় 'ভারী'। বাক কাঁধে করে দুপাশে দুটো টিনের পাত্র ঝুলিয়ে তাতে জল ভরে এরা জল সাপ্লাই দেয়। তার জন্য এরা নির্দিষ্ট চুক্তিভিত্তিক মজুরি দৈনিক বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সংগ্রহ করে। গ্রীষ্মকালে এদের চাহিদা খুব বাড়ে রাজপুরে।

যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারে জল সরবরাহ করে মদন, মদন কাহার। মাধব ভোররাতে দোকানের দরজা খোলার অনেক আগে থেকেই মদন কাহার জল নিয়ে এসে বসে থাকে দোকানের সামনের পাকা সিঁড়িতে।


আগে ' যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডার' এর সামনে বাঁশ আর টিন দিয়ে তৈরি ঝাঁপ নামানো থাকতো।ঝাঁপের বাইরে দু'পাশে লাগানো মস্ত দুটো লোহার বালাকে মোটা লোহার শিকলের সাহায্যে পাকা মেঝেতে ঢালাই করে আটকানো লোহার আংটাতে বেঁধে মস্ত বড় দুটো তালা মারা হতো। কিন্তু এখন দোকানের মালিকের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো ব্যবস্থার ও পরিবর্তন হয়েছে।এখন দোকান ঘরের মেঝেতে মোজাইক করা হয়েছে। দোকানের ঝাঁপ পাল্টে 'শাটার' বসেছে। ভোররাত তিনটেয় সে শাটার ওঠে ,নামে রাত নটায়, লাস্ট বাস রাজপুরে ঢোকার এক ঘন্টা পরে।

বাস থেকে নেমে যাত্রীরা মিষ্টি কিনে বাড়ি ফেরে। তাদের ঝামেলা মিটিয়ে দোকানের ঈশান কোণে রাখা কাঁচের বাক্সের ভিতরে লক্ষ্মী -গণেশ কে ধুপ দেখিয়ে শাটার নামায় মাধব। অবশ্য সেই সময়ে তার সঙ্গে দোকানের মালিক নবীন সরকারও থাকে, কখনো কখনো দোকানের দু একজন স্থানীয় কর্মীও থেকে যায়।


ভোররাত তিনটেয় মাধব সাটার খোলার পরে মদন ভারী দোকানের একধারে রাখা মস্ত বড় বড় মাটির জালাগুলো থেকে বাসী জল বের করে মস্ত বড় একটা অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচিতে রাখে। তারপর জল ঢালে জালায়।

ততক্ষনে মাধব লক্ষ্মী গণেশ কে ধুপ জল দিয়ে বড় বড় দুটো স্টোভ ধরিয়ে ফেলে। একটাতে বসিয়ে দেয় মস্ত একটা দুধ ভর্তি ডেকচি। অন্য স্টোভে বেশ বড় সাইজের একটা কেটলিতে জল চাপিয়ে দেয়।

ধীরে ধীরে ভোর সাড়ে চারটার বাস ধরার যাত্রীরা এসে বসে 'যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারের' বেঞ্চিতে। চায়ের অর্ডার করে। চা তৈরি করতে শুরু করে মাধব । খদ্দেরদের হাতে হাতে এগিয়ে দেয় চায়ের গ্লাস ।ততক্ষনে দোকানের এঁটো চায়ের গ্লাস ধোয়ার জন্য রাজপুরের স্থানীয় ছেলে পচাও পৌঁছে যায় দোকানে।

পচা ছাড়াও 'মা যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারে' আরও ছয় জন কর্মচারী আছে।তাদের মধ্যে বয়স ও অভিজ্ঞতায় সিনিয়র কটা মন্ডল। মিষ্টি,নোনতা ইত্যাদি খাবার তৈরির প্রধান কারিগর সে।রতন আর বিশু কটা মণ্ডলকে সাহায্য করে।দুর্গাপূজা,কালীপূজা,ঈদ,নবান্ন ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে ,বিয়ের সিজনে মিষ্টির চাহিদা খুব বেশি হলে বাড়তি কারিগর হায়ার করা হয়।

দোকানে খদ্দের এর ভীড় বেশী হলে এঁটো চায়ের গ্লাস,ডিশ ইত্যাদি ধোয়ার কাজে পচা কে সাহায্য করার জন্য কুসুম নামে আরো একটি বছর বারোর মেয়ে কাজ করে দোকানে। ও রতন কারিগরের মেয়ে। রতনের পরিবার খুব বড়। সদস্য সংখ্যা বেশি ।তাই সংসার চালাবার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে ও মেয়েকে কাজে লাগিয়েছে দোকানে।এরা ছাড়া আনন্দ নামে একটি যুবক আর উত্তম নামের একজন প্রৌঢ় ও‌ কাজ করে দোকানে।খদ্দেরদের চাহিদা অনুযায়ী জিনিস দেওয়াই ওদের কাজ।

মাধবের দায়িত্বে ক্যাশ বাক্স। ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা পয়সা হিসেব করে বুঝে নেওয়া ওর কাজ। নবীন সরকার দোকানে আসেন আটটা নাগাদ। রাত জেগে টিভি দেখার অভ্যাস আছে নবীন সরকারের। তাই সকালে উঠতে দেরি হয় তার। নবীন সরকার দোকানে বসলে তাকে ক্যাশ বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ি যায় মাধব ঘন্টা দেড়েকের জন্য।

রাত তিনটের সময় কোনমতে চোখে মুখে জল দিয়ে তাড়াহুড়ো করে দোকানে আসে মাধব। কাজেই নবীন সরকার দোকানে এলে তাকে হিসাবপত্র বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে যায় মাধব । না, মাধবের নিজের বাড়ি নয়। নবীন সরকার এর বাড়িতে ও থাকে সেই ছোট্ট থেকে।কেন কিভাবে এই সরকারের বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল মাধব, সে এক অন্য গল্প।


নবীন সরকার দোকানে এলে মাধব বাড়িতে গিয়ে স্নান সারে।এই কাজটায় একটু সময় লাগে মাধবের। কিছুক্ষণ ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে ভালো করে সারা গায়ে সর্ষের তেল মেখে কালিসায়রে স্নান করতে যায় মাধব। এই ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ এর অভ্যাসটা সে রপ্ত করেছে নবীন সরকারের বাবা হরপ্রসাদ সরকারের কাছ থেকে। সরষের তেল মেখে স্নান করার অভ্যাসটা হয়েছে নবীন সরকারের মা পদ্মাবতী দেবীর জন্য । সেই ছোটবেলা থেকে মাধব দেখেছে যে, স্নান করার আগে ভালো করে তেল না মাখলে খুব রেগে যেতেন পদ্মাবতী দেবী। তাই ইচ্ছে না থাকলেও স্নান করার আগে নিয়মিত গায়ে তেল মাখতে হতো মাধবকে।

তবে তখন সে বাড়ীর কূয়োতেই স্নান করত।এখন ও স্নান করে কালীসায়রে।

কালীসায়র প্রায় দশ একরের এক জলাশয়। এই জলাশয় এর সঙ্গে রাজপুরের রাজার এক ইতিহাস জড়িত আছে।সে অনেক অনেক আগের কথা।রাজপুরে রাজত্ব করতেন হরিসিংহ নামে এক হিন্দু রাজা।হরিসিংহ ছিলেন বীর , ধার্মিক এবং প্রজাবৎসল রাজা। কালীভক্ত ছিলেন তিনি। প্রতিদিন ভোরে স্নান সেরে কালীপুজো না করে তিনি জলগ্রহণ করতেন না। ওই কালীসায়রের মাঝখানে ছিল মা কালীর এক বিশাল মন্দির। কালীসায়রের ঘাটে বাঁধা থাকত রাজার নৌকা।রাজা নিজে সেই নৌকা বেয়ে একা মন্দিরে যেতেন।শোনা যায়, অমাবস্যার রাতে রাজা সারারাত জেগে তন্ত্র মতে দেবী কালিকার পূজা করতেন ।

একবার বর্গীদের আক্রমণ হল তার রাজ্যে। সেই সময় দুই শক্তিশালী পাঠান যোদ্ধা তার সৈন্যদলে যোগদান করে।তারা ছিল দুই বন্ধু। বর্গীদের সঙ্গে লড়াইয়ে প্রাণপণ যুদ্ধ করে তারা।


(চলবে)

13 views0 comments