Search

বিজয়া দশমী ।। বিশেষ সংখ্যা ।। বিশেষ রচনাঃ- সৌভিক রাজ


বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো, এই উৎসব বহুবছরের প্রাচীন। ভবিষ্যপুরাণে রয়েছে যে, যে দেশে দেবীর পুজো হয় সেই দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না, কেউ কোন দুঃখ পায় না বা কারও অকালমৃত্যুও হয় না। 


সৌভিক রাজ


গানের কথার সঙ্গে মিল রেখে ভাণ্ডি অভিনয়ও করে। যেমন---


উত্তর থাকি আইল্ বরনা (বন্যা) ভাণ্ডিক ধরিবার,


দোনও ভাণ্ডিয়ে যুক্তি করে খাইলোত সন্দেবার,


খাইলোতে আছে ভাইরে ভেমরুলের ভাসা,


ভেমরুল কামড়েয়া ভাণ্ডির গাওতে আসিল্ জ্বর,


ককেয়া সকেয়া সন্দায় ভাণ্ডি আহেনা আড়ির ঘর।


-  এর অর্থ হলো ভাণ্ডির কেঁপে জ্বর আসে। ভাণ্ডি শুয়ে পড়ে। ভাণ্ডির মালিক ডাক্তারকে খবর দেয় এবং ডাক্তার এসে ভাণ্ডিকে সুস্থ করে। ভাণ্ডি গানের তালে আবার নেচে ওঠে। 



আহেনা আড়ির ঘর সন্দেয়া


সসেয়া পাড়ে নিন


চোপরাতি জোনাক জ্বলে


চোরে দ্যাছে  সিং।


এ্যাথা নিগাইল্ ক্যাথা নিগাইল্


তার বাদে না কান্দে


রসেরও চিরণি নিগাইল্


উনিয়ে গুনিয়ে কান্দে।


-  অর্থাৎ আহেনা আড়ির বাড়ি গিয়ে চোর রসের চিরুনি নিয়ে গেছে বলে ভাণ্ডি ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না শুরু করে।


এভাবেই গান ও বাদ্যের তালে চলে ভাণ্ডির নাচ ও অভিনয়।



উত্তরবঙ্গ থেকে একটু নেমে এসে, বাংলার এক প্রাচীন ঐতিহাসিক অঞ্চল শান্তিপুরের এক বিখ্যাত পুজোর কথা বলি, এখানকার রাস উৎসব খুবই বিখ্যাত। তবে  রাসযাত্রাই নয় কেবল, শান্তিপুরে সাড়ম্বরে দুর্গাপুজো, কালীপুজো সবই হয়।  তাই বলা যায় শাক্ত-শৈব এবং বৈষ্ণব এই তিনধারার মেলবন্ধন দেখা যায় এই নদিয়ার শান্তিপুরে।


এই শান্তিপুরেরই এক প্রাচীন পরিবার হলো মুখোপাধ্যায় পরিবার, এদের বাড়িতেই প্রায় পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেবী কাত্যায়নীর পূজিতা হয়ে আসছেন। এই বাড়ির পূর্বপুরুষ হলেন কাশীনাথ সার্বভৌম,ছিলেন শ্রীশ্রীচৈতন্যদেবের গৃহশিক্ষক। শান্তিপুরে  শ্রী চৈতন্যদেব প্রায়ই আসতেন। 


ঐ সময় শান্তিপুর ছিল শৈবতীর্থ ও তন্ত্রসাধনার পীঠস্থান সাথে সাথে প্রাচীন যুগল বিগ্রহসেবাও অব্যহত ছিল। মুখপাধ্যায়দের বাড়িটি চাঁদুনীবাড়ি নামেও পরিচিত, এই বাড়িতে বহুদিনের প্রাচীন কালীপুজো, যার সূচনা হয়েছিলো আনুমানিক ১৫১০সালে,এই কালীমা চাঁদুনীমা নামে পরিচিত । পরিবারের সদস্যদের থেকেই জানা যায় যে এই পরিবারের দুর্গাপুজো প্রায় তারও আগে শুরু হয়েছিল, অর্থাৎ এই পরিবারের কাত্যায়নীর আরাধনা ৫০০বছরেরও প্রাচীন।



চাঁদুনীবাড়ির দুর্গাপুজো নদীয়া জেলার সবথেকে প্রাচীন পুজো। মুখার্জী বাড়ির দুর্গাপুজো যে ঠাকুরদালানে বর্তমানে অনুষ্ঠিত হয় অতীতে সেখানে হত না, আটচালায় পুজো হত আগে, কিন্তু প্রায় ২৫০বছর আগে এই বংশের সপ্তমপুরুষ যদুনাথ মুখোপাধ্যায় বাড়ির পিছনদিকের জমি কেটে সেই মাটি দিয়ে তৈরি করেন ইট এবং সেই ইট দিয়েই দুর্গা ও কালী পুজোর জন্য আলাদা আলাদা দুটি মন্দির তৈরি করেন বর্তমানে সেই দুই পৃথক মন্দিরে পুজো হয়ে আসছে। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন প্রথমে পরিবারের গোপাল ও চাঁদুনীমায়ের পুজো হয় তারপর শুরু হয় মা  দুর্গার পুজো।


শান্তিপুরের চাঁদুনীবাড়িতে পুজোর দিনগুলিতে দেবীর ভোগে থাকে- খিচুড়ি, আটভাজা, সাদাভাত, শুক্তো, ডাল, দুই রকমের তরকারি, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি। এই বাড়ির পুজোর ভোগ তালিকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল পাকা কলার বড়া আর চালতার টক। 


শান্তিপুরের চাঁদুনীবাড়িতে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয় না। এই বাড়িতে পুজোর একদিন অর্থাৎ মহানবমীর দিন আমিষভোগ দেওয়া হয়, ইলিশমাছ দেবীর জন্যে দেওয়া হয়। 


দশমীর দিন দেবীর জন্য পান্তা ভোগ ও ইলিশমাছের টক দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। যেহেতু দশমীর দিন মা আবার কৈলাসে ফিরবেন তাই পান্তাভাতের সাথে দেন সমস্তরকম গোটা মশলা যাতে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে আবার রান্নার আয়োজন করতে না হয়। দশমীর দিন অঞ্জলির বদলে এই বাড়িতে শান্তি ও সকলের মঙ্গলের জন্য মায়ের কাছে স্তবপাঠ করা হয় যাতে দেবী তুষ্ট হয়ে সকলকে অভয়দান করেন।



এই দুর্গাপুজোর দশমীর দিন থেকেই আবার কালীপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় এই চাঁদুনীবাড়িতে, অর্থাৎ দশমীর দিন পরিবারের বয়ঃজেষ্ঠ্যা সদস্যা চাঁদুনীমায়ের গায়ে মাটি দেন তারপর থেকেই শুরু হয়ে যায় কালীপুজোর প্রস্তুতি, সেইকারণে এইবাড়িতে বিজয়া দশমীর কোন অনুষ্ঠান পালন করা হয় না। বিকালে দেবীবরণের পর মা কাঁধে করে বিসর্জনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন মুখার্জীবাড়ির সদস্যেরা। 


উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ হলো এবার চলুন রাঢ় বাংলায় যাই; বাঁকুড়া যদিও বিষ্ণুপুরের সেই মল্ল রাজা বা তাঁদের রাজ্যপাঠ আর নেই। মল্লরাজাদের  প্রাচীন রীতি ও ঐতিহ্য মেনে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর মল্লরাজবাড়ির দুর্গোৎসব চলে টানা ১৮ দিন ধরে। ‘পট পুজো’ এখানকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। 


বিষ্ণুপুর শহরের শাঁখারি বাজার এলাকার ফৌজদার পরিবারের ঐতিহ্য মেনে আজও প্রতি বছর যথাক্রমে বড় ঠাকুরাণী, মেজ ঠাকুরাণী ও ছোটো ঠাকুরাণীর জন্য পৃথক তিনটি পট আঁকেন। মন্দিরে মৃন্ময়ী প্রতিমার পাশেই নির্দিষ্ট জায়গায় এই তিনটি পট রেখে পুজো হয়।


 নবম্যাদি কল্প থেকে বড় ঠাকুরাণী অর্থাৎ দেবী মহালক্ষীর পুজো আরম্ভ। রাজবাড়ি সংলগ্ন রঘুনাথ সায়রে(পুকুর) বড়ঠাকুরাণীর পটের স্নান পর্বশেষে মন্দিরে প্রবেশের পর প্রথা অনুসারে তিন বার তোপধ্বণী দেওয়া হয়। এরপরে গর্ভগৃহে প্রবেশের সময়তেও তোপধ্বণী দেওয়া হয়। আবার দেবীকে অন্নভোগ নিবেদন করার সময় আরো তিনবার তোপধ্বণী দেওয়া হয়।  বড় ঠাকুরাণীর পুজোর দিন থেকেই মল্ল রাজাদের শারদোৎসবের সূচণা হয়ে যায়।



দেবী পক্ষের চতুর্থীর দিন থেকে রাজপরিবারের মেজ ঠাকুরানী অর্থাৎ দেবী সরস্বতী ও সপ্তমীর দিন থেকে ছোটো ঠাকুরাণী অর্থাৎ দেবী মহাকালীর পুজো শুরু হয়। বড়, মেজো ও ছোটো ঠাকুরাণী এই তিনজনকেই দেবী মহামায়ার রুপ হিসেবে মল্লরাজাদের হস্ত লিখিত বলীনারায়নী পুথি অনুযায়ী পূজিতা হন।


৯৯৭ খ্রীষ্টাব্দ, বাংলা ৪০৪ সাল, মল্লাব্দ ৩০৩ মল্লাব্দে তৎকালীন রাজা জগৎ মল্ল বিষ্ণুপুরে দেবী মৃন্ময়ী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ইনি মল্ল রাজাদের কূলদেবী। মল্লরাজাদের পূর্বতন রাজধানী ছিল প্রদ্যুম্নপুর। কথিত আছে রাজা জগৎ মল্ল একদিন শিকারে বেরিয়ে পথে ক্লান্ত হয়ে বিষ্ণুপুরের ঠিক মন্দিরের জায়গাতেই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন তিনি দেখেন, তাঁর সঙ্গে থাকা বাজপাখির সঙ্গে একটি শ্বেতশুভ্র বাজপাখির তুমুল লড়াই হচ্ছে ও বাজপাখিটি যুদ্ধে হেরে যায়।  মাতা মৃন্ময়ী রাজা জগৎ মল্লের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন, তোমার মল্লভূমে আমি মৃন্ময়ী রুপে পুজিতা হতে চাই। সেই থেকে পুজো শুরু, এবার পুজো ১০২৬ বছরে পড়লো। কৃষ্ণ পক্ষের নবমী তিথিতে দেবীর বোধন হয় এবং শুক্ল পক্ষের নবমী তিথি পর্যন্ত মায়ের পূজো চলে।


 একমাত্র বিষ্ণুপুর রাজ পরিবারে বলিনারায়ণী মতে দুর্গাপূজা হয়। একসময় এখানে পূজোয় বলি প্রথা চালু থাকলেও রাজা হাম্বির মল্ল বৈষ্ণব মতে দীক্ষা নেওয়ার পর চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় বলি প্রথা।



তোপধ্বণীর বিস্তর ভূমিকা রয়েছে এই পুজোতে, এই শব্দকে ব্রহ্ম হিসেবে ধরে নিয়ে সেসময় থেকেই পাহাড়ের উপর থেকে কামান দাগার প্রচলন হয়েছিলো। প্রাচীণ রীতি অনুযায়ী প্রতি বছর অষ্টমীর দিন থেকেই মন্দিরের গর্ভগৃহে অষ্ট ধাতু নির্মীত বিশালাক্ষ্মী ও নবমীর রাতে খচ্চরবাহিনী দেবীর পুজো সম্পন্ন হয়। বিজয়া দশমীতে দেবী মৃন্ময়ীর ঘট বিসর্জনের পর একে একে বড় ঠাকুরাণী, মেজ ঠাকুরাণী ও ছোট ঠাকুরাণীর ঘট বিসর্জন হয়। সব শেষে এই তিন ঠাকুরাণীর পট রাজবাড়ির অন্দর মহলে নিয়ে যাওয়া হয়।



এইভাবে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রূপে মা পূজিত হচ্ছেন, শাস্ত্র,পূরান, নিয়ম, ইতিহাস ঐতিহ্য সব মিলে মিশে সময়ের অমোঘ নিয়মে আজ বাংলার শ্রেষ্ঠ লৌকিক উৎসবে পরিণত হয়েছে শারদীয়া,যার কেন্দ্রে রয়েছে মহিষাসুরমর্দিনীর আরাধনার।

1 view0 comments