Search

বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় ও বোধোদয়

বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় ও বোধোদয়


তপন তরফদার


অন্তিম পর্ব



বিদ্যাসাগর ছোটদের উপযোগী করে লিখেছেন। তিনি সমগ্র জগৎ বোঝাতে আগে ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য পদার্থের কথা উল্লেখ করেছেন। তারপর ইন্দ্রয়াতীত ঈশ্বর- ইনি নিরাকার চৈতন্যস্বরুপ, সবকিছুর স্রষ্টা, সর্বদা সদা বিদ্যমান থেকে লালন পালান করেন। চেতন জগত বিশ্লেষণ করে জীবজগতকে শ্রেণী বিভাগ করে দেখিয়েছেন, স্থলচর, জলচর, স্তন্যপায়ী, চতুষ্পদ, দ্বিপদ, মৎস্য, পক্ষী, সরীসৃপ,পতঙ্গ, কীট, অণুবীক্ষণিক, জীব। তারপর জীব শ্রেষ্ঠ মানুষের জৈব প্রকৃতি ও সমাজ প্রকৃতি, জীবন-মৃত্যুর কথা বলেছেন। তিনি মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বাকশক্তির উল্লেখ করেছেন। আবার আলোচনায় মানুষ যা ইতিমধ্যে লাভ করেছে, গণনা তথ্য অঙ্ক করার ক্ষমতা। কৃষির সাহায্যে উর্বর ভূমিতে বিবিধ উৎপাদনের ক্ষমতা। নানান শিল্পকর্ম ও বিপণন। মুদ্রাব্যবস্থা রচনা অর্থাৎ যাবতীয় অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ। সর্বোপরি আদর্শ পরিবার থেকে সমাজ সংগঠন পর্যন্ত যা শেষ হয়েছে রাষ্ট্র গঠনে। মানুষ আবিষ্কার করেছে খনিজ-সম্পদ কয়লা, হিরে। প্রকৃতির,উদ্ভিদের মনের কষ্ট। সব প্রাণীর কথা বলেছেন। নদী সমুদ্র জল প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। তিনি বলেছেন এই সমাজে উভয়ে উভয়ের পরিপূরকই হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। ভাবলে অবাক হতে হয়, আজকের পৃথিবীতে যে শ্রম, শ্রমচুরি, অধিকার, শোষন সহ অর্থনৈতিক বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। অধিকার প্রবন্ধে শ্রমের মর্যাদা, শ্রমনিষ্ঠা, শ্রমঅর্থ সম্পর্ক, শ্রম অধিকার সম্পর্ক, প্রাকৃতিক সম্পদে সবার সমান অধিকার, চুরি বল প্রয়োগে অপহরণ প্রতারণা বিষয়ে আলোকিত করেছেন।



শিক্ষার্থী নিজেকে তার অংশ হিসেবে দেখবে তার নির্ধারিত জাগতিক নিয়মের অনুবর্তী হয়ে চলার প্রেরণা পাবে, তখনই সে বোধ-সম্পন্ন হয়ে উঠতে থাকবে তখন তার সকল অর্জিত জ্ঞান,কর্মকাণ্ড ক্রিয়াশীল হবে। যার মূলে থাকবে ওই বোধ যা নষ্টাত্মক নয় কখনও যা অকল্যাণকর নয়। যা মঙ্গলদায়ী, যা-অমঙ্গলের বিরুদ্ধে অংশীদার হয়ে থাকবে। বিদ্যাসাগর নতুন প্রজন্মকে নতুন মূল্যবোধ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চেয়েছেন নতুন সুস্থ সমাজ গড়তে। প্রায় একশো বছর পরে স্বাধীন ভারতে ১৯৬৪ সালের কোঠারি কমিশন স্কুল-কলেজে শিক্ষা পদ্ধতির সুপারিশ করেছিল তার অন্যতম বিষয় ছিল (inclusion of value) ইনক্লিউশন অফ ভ্যালু অর্থাৎ মূল্যবোধের সৃষ্টি। দুর্ভাগ্যের বিষয় বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্য প্রদান (শিক্ষাদান) ও মূল্যায়ন (পরীক্ষা গ্রহণ) গুরুত্ব পেলেও আজও মূল্যবোধ শিক্ষার গুরুত্ব পায়নি। যেটুকু ছিল তাও বিলুপ্ত হচ্ছে। আজ চতুর্দিকে মূল্যহীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই সকল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বোধোদয় ঘটাতে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনার এই বোধোদয় আনতে সবাই বিদ্যাসাগর এর দেখানো শিক্ষার পথে মনে প্রাণে উদ্যোগী হই।





ঋণ:- ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাহিত্য ও শিক্ষাচিন্তা—ড: সফিউদ্দিন আহমদ।

ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষন -- অধ্যাপক নিখিলেশ্বর মন্ডল।


মুখোমুখি দুই সাগরঃ-


জ্ঞানের সাগর শ্রীরামকৃষ্ণ একবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, বললেন এতদিন খাল বিল ডোবা দেখেছি। এবার সাগরে এলাম।বিদ্যাসাগর পরিহাস করে বললেন তবে সাগরের নোনা জল নিয়ে যান। শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন তা কেনো হবে সাগর কি একটা ? ক্ষীর সমুদ্র ও আছে। তুমি যে বিদ্যার সাগর , অবিদ্যার নও। তোমার কত দয়া এত যার দয়া সে তো সিদ্ধপুরুষ।


(বিদ্যসাগরের ছদ্মনাম কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য।)


( সমাপ্ত )

9 views0 comments