Search

বিরতি থেকে ফিরে ।। নতুন ধারাবাহিক ।। সমীরণ সরকার


যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডার

সমীরণ সরকার

(ধারাবাহিক উপন্যাস)


প্রথম পর্ব

ঠিক ভোর সাড়ে চারটায় ফার্স্ট বাসটা ছাড়ে। যায় জেলার সদর শহরে। ফার্স্ট বাসের একঘন্টা পরে সেকেন্ড বাস ছাড়ে। সেই জন্যই দূরবর্তী গ্রামের লোকেরা ফার্স্ট বাসটা মিস করতে চায়না।

জেলার সদরে ওরা বিভিন্ন রকমের কাজ নিয়ে যায়। কেউ যায় মামলা মোকদ্দমা নিয়ে উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করতে। কেউ যায় চিকিৎসার জন্য। কেউ যায় ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করাতে। কেউবা যায় ব্যবসার প্রয়োজনে পাইকারি দরে মালপত্র কিনে আনতে । কেউ যায় বিয়ের বাজার করতে। কেউবা আবার ভিন্ন কোন প্রয়োজনে।


এরা সবাই ফার্স্ট বাসটাই ধরে। কারণ শহরের কাজ সেরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলে স্নান খাওয়া টা বাড়িতে হবে। সদর শহরের হোটেলে ভাত এর দাম বড় বেশি। তাছাড়া শহরের হোটেলে তরকারি পত্র অল্প অল্প দেয়, বারে বারে চাইতে হয়। আর চাইলেই পয়সা লাগে। সদর শহরে টিফিনের খরচ টা খুব বেশি কিছু মনে হয় না বলে আর মুখের স্বাদটাও পাল্টানো যায় বলেই গ্রাম থেকে সদর শহরে আসা লোকেরা হোটেলে ভাত খাওয়ার থেকে রাস্তার পাশের ছোট্ট দোকানে জলযোগ সারতে বেশি পছন্দ করে। তাই এরা সবাই রাজপুরে আসে ভোর সাড়ে চারটার ফার্স্ট বাস টা ধরতে।


ভোরের ফার্স্ট বাসটায় বেশ ভিড় হয় ।তাই সবাই তাড়াতাড়ি এসে জড়ো হয় রাজপুর বাসস্ট্যান্ডে, ভোররাত সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যেই। বাসে 'সিট' রেখে তারপরে এরা সবাই আসে নবীন সরকারের চা মিষ্টি তেলেভাজার দোকান------ ' যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারে'। এই দোকানটি এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ এবং পুরনো মিষ্টির দোকান। নবীন সরকারের বাবা হরপ্রসাদ সরকার খুব ভালো মিষ্টির কারিগর ছিলেন। তিনি তার মায়ের নামে এই দোকান প্রতিষ্ঠা করেন ।



'যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারের' বিখ্যাত মিষ্টি তিনটি। গজা ,ছানার জিলিপি আর আতা সন্দেশ। শেষের মিষ্টি অর্থাৎ আতা সন্দেশ হরপ্রসাদ সরকারের নিজের উদ্ভাবন। ছানা চিনি বড় এলাচ ইত্যাদি দিয়ে তৈরি এই মিষ্টিটি বেশ বড় সাইজের। নির্দিষ্ট ছাঁচে তৈরি এই মিষ্টিটি দেখতে অনেকটা আতাফলের মতই। আপাতদৃষ্টিতে মিষ্টিটি দেখতে শক্ত হলেও মুখে দিলেই গলে যায় ।এর স্বাদ ও গন্ধে ভরে যায় মন। গ্রামাঞ্চলের ক্রেতারা এই মিষ্টিটি আরো বেশি পছন্দ করেন এই কারণে যে ,তারা যখন আত্মীয়-স্বজন বা কুটুমবাড়িতে যান তখন এই শুকনো মিষ্টি বহন করতে সুবিধা হয়। শুধু তাই নয় এই মিষ্টিটি টেঁকে অনেকদিন ,চট করে নষ্ট হয় না।

হরপ্রসাদ সরকার এই মিষ্টি তৈরি করার পর এই মিষ্টিটি খদ্দেরদের মনে ধরায় এলাকার অনেক মিষ্টির দোকানই 'আতা সন্দেশ' তৈরি করতে শুরু করে। কিন্তু তাদের তৈরি 'আতা সন্দেশ' স্বাদে বা গন্ধে 'যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারে'র তৈরি 'আতা সন্দেশের 'ধারে কাছেও না থাকায় ক্রেতার মন জয় করতে পারে না। তাদের মধ্যে অনেকেই চেষ্টা করে ' যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারের' 'আতা সন্দেশ' মিষ্টি তৈরি করার কৌশল জানার। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে তাদের মধ্যে অধিকাংশই 'আতা সন্দেশ'তৈরি করা বন্ধ করে দিয়েছে।দু-একটি দোকান এখনো 'আতা সন্দেশ' তৈরি করছে। কিন্তু তাদের তৈরি মিষ্টি তখনই বিক্রি হয় যখন ' যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারে' 'আতা সন্দেশ' পাওয়া যায় না। এই একটি মিষ্টি হরপ্রসাদ সরকারের অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে।




'যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডার 'এর বাকি মিষ্টি দুটিও বেশ জনপ্রিয়। হরপ্রসাদ সরকার যখন রাজপুরে প্রথম মিষ্টি দোকান খোলেন তখন রাজপুরে বিজলিবাতি জ্বলত না। রাস্তা ছিল কাঁচা। কাজেই বাস চলার প্রশ্ন ছিল না। রাজপুরে কিন্তু তখন থানা ,ব্লক অফিস, পোস্ট অফিস, হাই স্কুল পঞ্চায়েত অফিস, জেলা পরিষদ পরিচালিত দাতব্য চিকিৎসালয় ইত্যাদি ছিল। কাজেই ঐ সমস্ত অফিসে বিভিন্ন কাজে চারিপাশের গ্রাম থেকে লোকজন রাজপুর আসতো। তখন হরপ্রসাদ সরকারের দোকানে চা তেলে ভাজা মুড়ি এসমস্ত বেশী বিক্রি হতো। গ্রাম থেকে যারা আসতো তারা ব্লক অফিসে বা থানায় কাজ করার ফাঁকে চা খেতে আসত হরপ্রসাদ সরকারের দোকানে। খিদে লাগলে মুড়ি তেলেভাজা ঘুগনি, মিষ্টি এসমস্ত কিনে খেত। অফিস গুলোতে কাজ সারতে সারতে যাদের খুব দেরি হতো, মানে দুপুরে ভাত খাওয়ার সময় বেরিয়ে যেত ,তারা এসে হরপ্রসাদ সরকারকে প্রায়ই অনুরোধ করতেন, দুপুরে তাদের জন্য একটু ভাতের ব্যবস্থা করতে। তাদের অনুরোধে হরপ্রসাদকে মাঝেমাঝেই ভাত ,ডাল, ডিমের ঝোলের ব্যবস্থা করতে হতো। অবশ্য একাজে হরপ্রসাদ কে সাহায্য করতেন তার স্ত্রী।

এইভাবে চলতে চলতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন এলো রাজপুরে। পাকা রাস্তার কাজ শুরু হলো ।বিদ্যুতের খুঁটি পড়লো। আর তারপরেই চালু হলো বাস ।রাজপুর থেকে জেলার সদর শহর পর্যন্ত ।

বাস চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকজনের যাতায়াত বাড়লো রাজপুরে। বাসস্ট্যান্ডে হলো ঠিক হরপ্রসাদ সরকারের দোকানের কাছেই। হরপ্রসাদ এর ব্যবসায়িক বুদ্ধি তাকে পরামর্শ দিল মিষ্টির দোকানটাকে একটু বড় করতে। এর আগে হরপ্রসাদ এর মিষ্টির দোকানে রসগোল্লা, কালোজাম ,জিলিপি এই সমস্ত মিষ্টি পাওয়া যেত। এবার হরপ্রসাদ শুরু করলেন ছানার জিলিপি, গজা আর আতা সন্দেশ তৈরি করতে। এই আতা সন্দেশ তৈরি করতে তিনি শিখেছিলেন পুরুলিয়ার এক ছোট্ট গ্রামে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে। ওখানে এই মিষ্টি খুব চালু।

'আতা সন্দেশ 'তৈরি করার কিছুদিনের মধ্যেই তা বেশ জনপ্রিয় হওয়ায় ' যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারের বাজার রমরমা হলো।

এক এক করে রাজপুরে বাসের সংখ্যা আরো বাড়লো। এখন শুধু জেলার সদর শহর নয়, ,আরো দূরে দূরে বাস যায় রাজপুর স্ট্যান্ড থেকে ছেড়ে। আর যত বাস চালু হলো তত বিক্রি বাড়তে লাগল 'যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারের'।


ভোরের ফার্স্ট বাস যারা ধরতে আসে তারা সকালে এসেই হাতমুখ ধুয়ে চা খায় হরপ্রসাদ সরকারের দোকানে। কাজেই ওদের জন্য ' যশোদা মিষ্টান্ন ভান্ডারের' ঝাপ খোলে ভোর রাত তিনটেয়। দোকানের ঝাঁপ দিয়ে লক্ষ্মী গণেশের কুলুঙ্গিতে ধুপ জল দিয়ে মস্ত বড় গ্যাস স্টোভটা ধরিয়ে দেয় মাধব। একটা স্টোভে বড়ো ডেকচিতে দুধ গরম হয়। অন্য একটা স্টোভে মস্ত একটা কেটলিতে জল ফোটে টগবগ করে।




(চলবে)

5 views0 comments