Search

বিশেষ সংখ্যা ।। ভয় ভৌতিকে ।। অদিতি ঘটক


নতুন কুটুম


অদিতি ঘটক



হ্যাঁ, তা দেখতে দেখতে বেশ অনেক গুলো বছর পার হয়ে গেল।প্রায় তিরিশ বছর। অর্চিষ্মানের চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে অথচ চোখ বন্ধ করলে মনে হয় এই তো সেদিন। পৈতৃক প্রাণ টা যে ফিরে পাবে শুধু অর্চি কেন ওখানের কেউই ভাবতে পারেনি। সবাই সমস্বরে বলে উঠল কেন? কেন ? সুজয় মুড়ি চিবতে চিবতে বলল গল্প গল্প গন্ধ পাচ্ছি যেন ! অর্চি রেগে গিয়ে বলল একফোঁটা বানানো নয়। একদম সত্যি। এই পৈতে ছুঁয়ে বলছি।


 আজ অর্চিদের ছাদেই আড্ডা বসেছে। ওরা কয়েকজন বন্ধুবান্ধব প্রতি শনিবার শনিবার সন্ধ্যায়  ক্লাবে আড্ডা দেয়। আজ সকালে ক্লাবে রক্তদান শিবির ছিল।ক্যাম্পের লোকেরা এখনো তাদের সাজ সরঞ্জাম নিয়ে যায়নি। তাই সবাই অর্চিদের বাড়ির ছাদেই আড্ডা দিচ্ছে। অর্চিই ওদের ডেকে এনেছে। জম্পেশ করে মুড়ি মাখা ও চপ সহযোগে আড্ডা চলছে। কারেন্টের কোনো বড় ফল্ট হয়েছে। বিকেল থেকে গেছে রাত প্রায় আট টা বাজতে চলেছে তাও আসার নাম নেই। নেহাত মাসটা ফেব্রুয়ারি তবে শেষের দিক। চাঁদের ম্লান জোৎস্না মাঝে মধ্যে হালকা কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। মেঘ সরে যেতে আবার চাঁদের মুখ দেখা যাচ্ছে।


সবাই মুখিয়ে রয়েছে অর্চি শুরু করে তখন কতই বা হবে! মেরেকেটে বারো বছর। আমার ছোটো পিসির বিয়ে। তোরা তো জানিস আমাদের দেশের বাড়ি কাটোয়ার ওদিকে। ছোটো পিসির বিয়ে হচ্ছে গ্রামে। টিঁয়া বলে একটা স্টেশনে নেমে যেতে হয়। আমাদের দেশের বাড়ি থেকে চারটে স্টেশন। রাস্তা ভালো নয় ভীষণ ভাঙাচোরা তাই ঠিক হয়েছে কন্যা যাত্রীরা ট্রেন দিয়ে গিয়ে রাত কাটিয়ে জলখাবার খেয়েদেয়ে ধীরে সুস্থে ফিরবে। গ্রামে কারেন্ট আছে


 তবে হয় লো ভোল্টেজ নয় লোডশেডিং। তাও চলে সাত ঘণ্টা আট ঘণ্টা ধরে। এলেও খুব বেশি হলে এক দু ঘন্টা থেকে আবার চলে যায়। হ্যারিকেন, কুপির আলোই মানুষের প্রধান ভরসা। মোবাইল তখনও মানুষের হাতেহাতে ঘোরে না। আমার বাবা, আমি, আমার  কলকাতাইয়া বড় পিসি, মেজ পিসি, ছোট কাকা, বড় পিসির তিন ছেলে, একমেয়ে, দুই বউমা, জামাই, মেজ পিসির দুই ছেলে, মেয়ে, আরও বেশ কিছু আত্মীয় স্বজন ,পাড়াপড়শি সবাই বিয়ে বাড়ির ভোজ খেয়ে রাতে শুতে যাচ্ছি--- ছোটো পিসির শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কিছু বাড়ি আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিল কনাযাত্রীদের জন্য। 


আমি আগেই ভেবে রেখেছিলাম বড় পিসির ছেলে মেয়েরা যে বাড়িতে শোবে আমি সেই বাড়িতেই শোব। দাদারা কি মজার মজার গল্প বলে। কি সুন্দর হাসায়। আমি বড় হয়ে গেছি। বাবা মা কে ছাড়াই রাতে শুতে পারি। তা ছোটো পিসির শ্বশুর বাড়ির লোকেরা একটা বাড়ির সামনে নিয়ে এল। রাস্তা থেকেই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি উঠে গেছে। পুরো বাড়িটাই মাটির। অসুবিধা কিছু নেই। আমাদের দেশের বাড়িও মাটির। দোতলায় আমাদের যে ঘরটায় উঠে যেতে বলা হল সেটা বেশ বড় একটা হল ঘর। পাশে একটা ছোট ঘর আছে মনে হল। আলো আঁধারী তে বোঝা যাচ্ছে না। নিচের ঘরে বলল চাষের জিনিস রাখা তাই শোয়া যাবে না। হ্যারিকেন টা হাতে দিয়ে ওরা যত তাড়াতাড়ি পারল হাঁটা লাগল কেউ ওপরে উঠে দেখিয়ে পর্যন্ত গেল না। 'অভদ্র কোথাকার। নেহাত নতুন কুটুম!'কথাটা  বলল ছোট কাকা। এ বাড়িতে বড় পিসির ছেলেরা তাদের বউরা, মেয়ে জামাই, ছোট কাকা আর সম্পর্কিত দুই কাকা, আমি শুতে এসছি।


এই রকমই ফেব্রুয়ারির রাত এই রকমই  মরা চাঁদের আলো। হঠাৎ আমার বড় বউদি বলে উঠল গরম লাগছে একটা হাত পাখা হলে ভালো হত। তারপরেই টের পেল মাথার পাশে হাত পাখা রাখা। হ্যারিকেনটা শোয়ার পর পরই নিভে গেছে। একটা ছোট মত জানলা দিয়ে তেরচা করে মরা চাঁদের আলো আসছে তাতে অদ্ভুত এক আলো আঁধারী তৈরি হয়েছে।  আমার এক কাকা বলল দেশলাই থাকলে ভালো হত। পিসতুতো দিদি ইয়ার্কি করে বলল কুলুঙ্গি তে খোঁজ পেয়ে যাবি। ঠিক তাই। এই রকম টুকটাক জিনিস সবাই কুলুঙ্গি তে হাত দিয়ে পেতে থাকল। বলল টাকার কথা বলি ? এই নিয়ে কিছু হাসাহাসিও হল সাথে হালকা শিরশিরানী ভয়। ক্লান্ত লাগছিল। সবাই শুয়ে পড়ল । নতুন জায়গা ঘুম আসছে না। এই সময় আমি একটা দৃশ্য দেখলাম, মনে হল সাদা থান পরা একটা বউ লম্ফ হাতে যেন পাশের ঘর থেকে উড়ে বেরিয়ে গেল। আমার খুব ভয় লাগল। কিন্তু কাউকে কিছু বললাম না। মুখ টিপে শুয়ে থাকলাম। সবাই ঘুম জড়ানো গলায় গল্প করছিল। চোখও বোধহয় বন্ধ। কোনোদিন মা বাবাকে ছাড়া শুইনি ঘুম আসছে না। হঠাৎ দেখি বউটা আমাদের ঘরের বন্ধ দরজা দিয়ে ঢুকে গেল। না চলা ফ্যানটা থেকে ঝুলতে থাকল। আমার চিৎকারে সবারই তখন তন্দ্রা ভেঙে গেছে। ওই দৃশ্য দেখে সবার মুখে গোঙানির শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই। যে যে ভাবে ছিলাম  সেই ভাবেই পড়ি কি মরি করে সিঁড়ি  দিয়ে নেমে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগলাম থামলাম একেবারে টিঁয়া স্টেশনে। তখন ভোরের আলো ফুটব ফুটব করছে। স্টেশনে চায়ের দোকানে চার পাঁচ জনের একটা দল চা খেতে খেতে বলাবলি করছে কন্যা যাত্রীদের ওই বাড়িতে থাকতে দিয়েছে ! এখনো পনেরো দিন যায় নি বউটা গলায় দড়ি দিয়েছে। শুনেছি ওঁকে রোজ রাতে দেখা যায়। কি জানি কনে যাত্রীরা সব কেমন আছে ! নতূন কুটুম বলে কথা ! 

38 views0 comments