Search

বিশেষ সংখ্যা ।। ভয় ভৌতিকে ।। অনিরুদ্ধ মজুমদার


নরকের দ্বার

অনিরুদ্ধ মজুমদার


মন ভালো নেই অবিনাশের। থেকে থেকেই একটা চাপা অস্বস্তি মনের ভেতরটা কুরে কুরে খাচ্ছে। কিন্তু অস্বস্তিটা যে কি এবং কেন অবিনাশের মনে এভাবে দানা বাঁধছে তা অবশ্য বুঝতে পারছে না ছেলেটা। কিছু একটা চেপে বসে আছে বুকের ওপর। পাক খেয়ে পিণ্ডটা গলা দিয়ে উপরে উঠতে চাইছে ক্রমশ। ঢোক গিলছে অনিমেশ। জল খেয়েছে। মাঝে একবার ছাদে গিয়ে পায়চারি করল। নাহ্, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। খচখচানিটা বন্ধ হওয়ার নামই নেই। তাও যদি মন খারাপের উৎসটা জানা যেত তবুও একটা কিছু করা সম্ভব হত। কিন্তু হঠাৎ করে মন বিষন্ন হতে যাবে কেন? অবিনাশের রোখ চেপে গেল। কেন এমন হবে তার সাথে?


এখন ইন্টারনেটের যুগ। গুগলের দৌলতে সবই হাতের নাগালে। অবিনাশও সে পথ ধরল। প্রথমেই মোবাইলে এক দফা সার্চ করে নিল। মন খারাপ কেন হয়? লিখতেই গুগল একটা লম্বা ফিরিস্তি অবিনাশের সামনে তুলে ধরল। এ তো মেঘ না চাইতে জল! অবিনাশ শুধু জানতে চেয়েছিল মন খারাপের কারণ। গুগল কিন্তু তা দিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি। রোগের উপশমও দিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য পড়তে পড়তে অবিনাশের মনে হল সে নিজেই একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠবে অচিরেই। মনে মনেই হাসল অবিনাশ। আবার সেই মন! কিন্তু এখন তার মন হাসছে। যাক, বাঁচা গেল।


এক প্রস্থ গবেষণা চালিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে চা বানাল অনিমেষ। একার সংসার। নিজেকেই হাত পুড়িয়ে সব করতে হয়। না করলে অন্নপূর্ণা ড্রামেই থাকবেন। বেরোনো তো দূর, উকিও দেবেন না। অবিনাশের মা অবশ্য ছেলের বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। বাধ সাধছে অবিনাশই। একটু স্বাধীন ভাবে বাচার সুযোগটা কোনও মতেই হাতছাড়া করতে নারাজ অবিনাশ। ওর বদ্ধমূল ধারণা, বিয়ে মানেই পরাধীনতার কঠিন শৃঙ্খলে সারা জীবনের মতো আবদ্ধ হয়ে যাওয়া। তখন কী আর বাই উঠলে কটক যাওয়া সম্ভব হবে? কেন যাচ্ছ, কোথায় যাচ্ছ, কী দরকার যাওয়ার, সঙ্গে কে যাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি না না বিধ প্রশ্নে জেরবার হতে হবে। রাহুলের বিয়ের পর অবিনাশের মনে এই ধারণার শিকড়টা আরও পাকা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু অবিনাশ জানে, আজ নয় কাল এই শৃঙ্খল মালা হয়ে তার গলে পড়বেই।


এবার অবিনাশের মা অধীর হয়ে উঠেছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই দার্জিলিং ট্যুরটাই তার কুমারত্ব জীবনের যাত্রা। এবার তাকে কৌমার্য ব্রত ভাঙতেই হবে। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে উচু পদে চাকরি করে অবিনাশ। কালে কালে বয়সও নেহাত কম হয়নি। অবিনাশও অনেক ভেবে দেখল, নাহ্, মায়ের কথাটা এবার মেনেই নেবে। মায়েরও বয়স হয়েছে। মফস্বলের বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় যখন হাজার স্কোয়্যার ফিটের ফ্ল্যাটে উঠল অবিনাশ, তখন অনেক বার মা'কে বলেছিল তার সাথে চলে আসতে। রাজি হননি অবিনাশের মা সরলা দেবী। অনেক করে সে বুঝিয়ে ছিল মা'কে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।

শৃষে ছলছল চোখে সরলাদেবী ছেলেকে বলেছিলেন, "বাপ ঠাকুরদার ভিটে শূন্য রাখতে নেই খোকা। তুই যা। এবার তোর একটা বিয়ে হলে শান্তিতে মরতে পারি। স্বর্গে গিয়ে তোদের দেখব।"


সেই শুরু। তারপর থেকে এই তিন বছর দিনে তিনবার করে ছেলেকে বিয়ের কথা মনে করিয়ে যাচ্ছেন সরলা দেবী। কাজের অযুহাতে অনেক কষ্টে এতদিন আটকে রেখেছে অবিনাশ। আর বোধ হয় সম্ভব হবে না। এসব ভাবতে ভাবতে আবারও সেই মন খারাপটা যে কোন ফাক তালে সুরসুর করে ঢুকে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসেছে বুঝতেও পারেনি অবিনাশ।


মনের ব্যামো বড়ই জটিল। দুর্বিসহ হয়ে উঠছে। এর একটাই উপায়, অবিনাশ ফোনটা নিয়ে রাহুলের নম্বরে আঙুলটা ছোঁয়ালো। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল সুমিষ্ট একটা মেয়েলি গলায় রবীন্দ্র সঙ্গীতের দু'কলি। মাঝপথেই রাহুলের গম্ভীর গলা পেল অবিনাশ। গানটা ভালো লাগছিল ওর। রসভঙ্গ করল রাহুল।


বিরক্ত হয়ে অবিনাশ বলল, "আর একটু পর ফোনটা তুলতে পারলি না? গানটা মনে ধরেছিল বেশ।"

অবিনাশ বলল, "তাহলে রেখে দিচ্ছি। তুই গানই শোন।"

এমন উত্তর প্রত্যাশা করেনি অবিনাশ। খানিক থতমত খেয়ে বলল, "না না। রেগে যাচ্ছিস কেন। মজা করছিলাম একটু। বল কী করছিস?"


ওপার থেকে রাহুল যা বলল, তা অনেকটা এরকম, সেও অবিনাশকে ফোন করতেই যাচ্ছিল। বিকেল থেকেই মনটা ভালো নেই তার।


রাহুলের কথায় বিস্ময়ের অন্ত রইল না অবিনাশের। বলে কী? তারও মন খারাপ? এ কি ছোয়াচে রোগ নাকি? অবিনাশ অবশ্য তার মন খারাপের কথা ভেঙে কিছু বলল না। তবে একটু অবাক না হয়ে পারল না। একথা সে কথায় তখন বিষয়টা অবশ্য ধামাচাপা পড়ে গেল।


পরদিন অবিনাশ আর রাহুল যাবে দার্জিলিং। নিছকই ভ্রমণ। আর টুকটাক কিছু তথ্য সংগ্রহ করাই উদ্দেশ্য। মোট পাচ দিনের ট্যুর। দুই বন্ধুর এই আজব এক খেয়াল। রাহুলই এই বাতিকটা অবিনাশের মধ্যে একরকম ঢুকিয়ে দিয়েছিল। রাহুল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপনা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ঘটনার তদন্ত সূত্রে অবিনাশের সঙ্গে তার পরিচয়। সম্পর্ক ক্রমে মজবুত হয়ে ওঠে। তুমি ছেড়ে তুইতে আসতে বেশি সময় লাগেনি।


রাহুল একদিন বলল, "চল ঘুরে আসি। পাহাড়ে যাব কিন্তু।"


প্রস্তাবটা মন্দ নয়। রাজি হয়ে গেল অবিনাশ। সেই শুরু। আজ দু'বছরের বেশি হয়ে গেল এদিক ওদিক মাঝে মধ্যেই বেরিয়ে যায় দুই বন্ধু। তবে পাহাড়েই যায় ওরা। এই অভিযানের আগে রাহুল একটা শর্ত দিয়েছিল। ঠিক একটা নয়, শর্ত ছিল দুটি। প্রথমত, অন্য কাউকে এই অভিযানে সঙ্গে নেওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, পাহাড় ছাড়া অন্য কোথাও নৈব নৈব চ।

এতেও আপত্তি ছিল না অবিনাশের। পাহাড় তার বরাবরের পছন্দ। আর অন্য কাকে আর সঙ্গে নেবে অবিনাশ? কিন্তু ভ্রমণের পাশাপাশি আরও একটা উদ্দেশ্য অবশ্য ওদের ছিল। সেটাও রাহুলের অনুপ্ররেণাই বলা যেতে পারে। তবে সে বিষয়টা এখন থাক।


এবার দার্জিলিং যাচ্ছে অবিনাশরা। দূর রাজ্যের পাহাড় পর্বত এ ক'বছরে অনেক দেখেছে ওরা। কিন্তু ঘরের পাশের দার্জিলিং দেখা হয়নি। তাই এবার সেখানে যাওয়ার মনস্থির করেছে ওরা। রাতে শিয়ালদা থেকে ট্রেনে যাত্রা শুরু হল ওদের। পরদিন ভোরে নিউ জলপাইগুড়ি। বর্ষার সময়। এখন তুলনামূলক ভ্রমণ পিপাসুদের আনাগোনা কম। দুই-ই একদম পাহাড়ের জন্য আদর্শ।


এনজেপি স্টেশনে নেমে গরম চায়ে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে রাহুল বলল, "ম্যালের কাছাকাছি কোনও হোটেল নেব বুঝলি। সার্কিট হাউজটা না করে দে।"

অবাক হয়ে অবিনাশ বলল, "সে কি! আগে বললি না কেন? এখন, এখানে এসে সার্কিট হাউজ ছেড়ে দেব? ভেবেছিলাম...."

অবিনাশ গাইগুই করে আরও কিছু হয়তো বলত। মাঝপথেই তাকে থামিয়ে দিল রাহুল।

-"শোন, সার্কিট হাউজ অনেকটা দূরে। নির্জন জায়গায়। সেখান থেকে রোজ দু'বেলা এক কিলোমিটার হেঁটে ম্যালে যাওয়া সম্ভব না। তাই ম্যালে থাকাই শ্রেয়।"

অকাট্য যুক্তি। এরপর আর বেশি কিছু বলা চলে না। তাও মৃদু আপত্তি করতে গিয়েছিল অবিনাশ। কিন্তু তার আপত্তি ধোপে টিকল না। অগত্যা রাহুলের পাশাপাশি শেয়ারের গাড়িতে উঠে বসল।

চার ঘণ্টা একে বেকে পাহাড়ি পথে উঠতে থাকল ওদের গাড়ি। বাইরেটা অসম্ভব সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঠাসা। বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচছে পাহাড়ি নাম না জানা গুল্মলতার ঝোপে ফুটে থাকা থোকা থোকা ফুল গুলো। কখনও আবার মাঝে মাঝেই গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে মেঘ ঢুকে মুখের ওপর তার পেলব হাতের স্পর্শ বুলিয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে অসীম শূন্যে। স্বর্গীয় অনুভূতির চেয়ে এ কম কিছু নয় অবিনাশের কাছে।

রাহুলের অবশ্য এসবে মন নেই। সে কোন এক তিব্বতী লামার বই খুলে বসে আছে। এত বেরসিক ছেলে আগে দেখেনি অবিনাশ। এখন অবশ্য রাহুলের এই আচরন গুলো গা সওয়া হয়ে গিয়েছে অবিনাশের।


এমজি রোডের নীচে ওদের নামিয়ে দিল গাড়ি। তারপর ম্যালে গিয়ে এদিক ওদিক চক্কর কেটে একটা হোটেলও পছন্দ হয়ে গেল। হোটেলটা ম্যালের একদম ওপরেই। বাইরে থেকে দেখে সেটাকে ঠিক হোটেল বলে মনে হয় না। নীচে একটা কিউরিও শপ। বিভিন্ন রকমের বিভৎস মুখোশ, থাঙ্কা, রকমারি ঝলমলে পাথরের মালা, ক্ষুদে মানুষের করোটির মালা ঝুলছে দোকানের সামনে। ভিতরটা অন্ধকার। বাইরে থেকে দোকানের ভিতরের প্রায় কিছুই দেখা যায় না। বাইরে ঝোলানো ভয়ঙ্কর সব মুখোশ দেখে সেগুলোর দিকেই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল অবিনাশরা। ওদের ওভাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই সম্ভবত দোকান থেকে বেরিয়ে আসে একটা লোক।


-"কিছু লাগবে বাবুসাব?"


লোকটার কথায় চমকে ওঠে দু'জন। বলি রেখার প্রবল আধিক্যে মুখটা প্রায় ঢেকে গিয়েছে। আলাদা করে খুজে নিতে হয় চোখ, নাক, ঠোট। অথচ বেটে খাটো বেশ বলিষ্ট চেহারা। মুখের সঙ্গে চেহারার কোনও মিল নেই। মুখ দেখে লোকটার বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। কেউ যেন মনের আনন্দে তার সারা মুখে কাটাকুটি খেলেছে। লোকটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। অবিনাশ বুঝল, এভাবে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হয়নি ওদের। একটু অপ্রস্তুত হয়ে অবিনাশ বলল, "আমরা আসলে হোটেল খুজছিলাম। এখানে কোনও ভালো হোটেল আছে?"


লোকটার অবিন্যস্ত ছেড়া মুখটায় একটা হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। তার ছোট ছোট চোখ দুটো যেন আরও ক্ষুদ্র লাগছে এখন। মাথাটা হালকা নাড়িয়ে লোকটি বলল, "আছে তো। এখানেই আছে।"


"এখানে বলতে?" প্রশ্ন করল রাহুল।


ওর প্রশ্নটা যেন শুনতেই পায়নি এমন ভাব করে "আইয়ে" বলে লোকটি আবার পিছন ফিরে দোকানে ঢুকে গেল। অবিনাশরাও কতকটা সম্মোহিতের মতোই লোকটিকে অনুসরণ করতে লাগল।


দোকানটা বেশ পুরনো। তার গঠনশৈলী, রঙ, সাজসজ্জা দেখেই তা বোঝা যায়। দোকানটা প্রাচীন মূর্তি এবং না না রকম জিনিসে ঠাসা। সে সব মূর্তির ভয়ঙ্কর সব চেহারা। অদ্ভূত তাদের শরীরি বিভঙ্গ, অসাধারণ মুদ্রা।

-"এ সব কিসের মূর্তি?"

অবিনাশের প্রশ্নে মুখ ঘোরাল লোকটা। তারপর বলল, "ওগুলো আমাদের ভগবানের মূর্তি বাবু।"

বলে কী লোকটা? এরা ভগবান? অবিনাশ ভাবল, এই সব মূর্তি দেখে ভক্তি তো দূরস্থান, উপরন্তু রীতিমতো ভয় জাগছে। এদের দেখে ঠাকুমার ঝুলির রাক্ষসের কথা মনে পড়ে গেল অবিনাশের।

দোকানটার পিছনে কাঠের ছোট সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠতেই দৃশ্যটা সম্পূর্ণ বদলে গেল। এখানে সার দিয়ে বেশ কয়েকটা ঘর চোখে পড়ল ওদের। আর ঠিক সামনেই একটা খোলা জায়গা। অনেকটা খোলা ঝুল বারান্দার মতো। তবে এটা বারান্দা নয়, দোকানের ছাদ সম্ভবত। এখানে দাড়ালে কাঞ্চনজঙ্ঘা হয়তো স্পষ্ট দেখা যেত যদি বর্ষা না হয়ে এটা শীতকাল হত। অবিনাশের মনটা তেতো হয়ে গেল। এত কাছে এসেও কাঞ্চনজঙ্ঘা ফসকে গেল?

একটা টেবিলের সামনে দাড়াল লোকটা। অপর প্রান্তে মাঝ বয়সী তারই মতো একজন বসে আছে। নেপালি ভাষায় দু'জনের মধ্যে কিছু কথা হল। বুঝল না অবিনাশরা। তাপরই হন্তদন্ত হয়ে বসে থাকা লোকটা একটা ঘর খুলে দিল। মন্দ না ঘরখানা। দু'জন দিব্যি আরামে থেকে যাবে। আর রাতে শোয়াটুকু ছাড়া ঘরে থাকছেই বা কে?

রাহুল বলল, "ঘর তো খাসা। তা বাপু দক্ষিণা কত?"

লোকটি হাত কচলে যা বলল তাতে ওদের চক্ষু চড়ক গাছ। ম্যালের ওপরে এত কম ভাড়া কল্পাও করতে পারেনি অবিনাশরা। তা সত্ত্বেও রাহুল দামদর শুরু করল। শেষে দুই রফই একটা রফায় এল।

অবিনাশকে একটা খোঁচা মেরে মুখ টিপে হেসে রাহুল বলল, "বুঝলি না, ওটা একটু করতে হয়। দামদর করা বাঙালির ধর্ম। না করলে সে বস্তু ভোগে লাগে না।"

লাগেজ বলতে দু'টো পিঠের ব্যাগ। সেগুলো রেখে দু'কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে রাহুল বলল, "আজ কী করবি বল?"

অবিনাশ ভ্রুটা ঈষৎ কুচকে বলল, "যা ওয়েদার বেশি দূরে না যাওয়াই ভালো। তার চেয়ে কাছেপিঠে কোথাও ঘোরা যাক।"


ঠোঁট উল্টে মাথাটা খুব ধীরে বেশ কয়েকবার ওপর নীচে নাড়াল রাহুল। তারপর হাত দুটো নমস্কারের ভঙ্গিতে জরো করে ঠোটের ওপর রেখে টেনে টেনে বলল, "ভাবছিলাম একবার মহাকাল মন্দিরটা ঘুরে আসব।"

কথাটা যেন অবিনাশকে নয়, নিজেকেই বলল সে।

বিরক্ত হয়ে অবিনাশ বলল, "কী? কোথায় যাবি? জোরে বল। কিসব কাল, মন্দির বলছিস?"


এবার রাহুল বলল, "কাল নয়। ওটা মহাকাল। মহাকাল মন্দিরের নাম শুনিসনি?"


অবোধের মতো চোখ গোল গোল করে দু'পাশে মাথা নাড়াল অবিনাশ।

রাহুল কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় দরজায় টোকা মারার শব্দ। বিছানায় বসেই হাক দিল সে। চায়ের প্লেট নিয়ে হাসি মুখে ঘরে ঢুকল সেই দোকানের লোকটা। রাহুল একটা পেয়ালা তুলে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, "বাহ্। খাসা। তো বাপু তোমার নামটা তো জানা হয়নি। কি নাম তোমার?"

কাচুমাচু মুখ করে সে বলল, "বিনয় তামাং বাবু।" ভাবটা এমন যেন, নাম বলাটা খুব গর্হিত কাজের সামিল।

রাহুল বলল, "তা বিনয় মহাকাল মন্দির চেনো?"

এবার লোকটা একগাল হেসে প্রায় গড়াগড়ি খায় আর কি। অবিনাশ ভাবল, যার শরীরে এত বিনয়, তার নামকরণকারীর জীবন সার্থক।

হাসিটা একটু চেপে বিনয় বলল, "আমাদের ভগবান আছে। জানব না কেন? খুব জানি। আপনারা যাবেন?"

রাহুল আড় চোখে একবার অবিনাশের দিকে চেয়ে বলল, "হুম। ইচ্ছা আছে। ঠিক আছে তুমি এখন এস।"

বিনয় চলে যেতেই রাহুল বলল, "দেখেছিস একটা গেয়ো ভূতও জানে আর তুই মহাকাল মন্দিরের নামই শুনিসনি। ছ্যা ছ্যা।"


অবিনাশ খানিক অবাক হয়ে ভাবল এতে খামোখা ভর্ৎসনার কী আছে? বিনয় স্থানীয়। সে তো জানবেই। মুখে অবশ্য বলল, "মহাকালে কিছু আছে নাকি বলতো?"

গম্ভীর হল রাহুলের মুখ। কপালে বলিরেখার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে সে বলল, "দুটো হিসেব কিছুতেই মিলছে না রে অবিনাশ!"


-"হিসেব! কী হিসেব?"


বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে রাহুল বলল, "অবজার্ভেটরি হিলে আগে একটা বৌদ্ধমঠ ছিল। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে সিকিমের পেডং মঠের একটি শাখা হিসেবে এটি তৈরী হয়। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে গোর্খাদের আক্রমণে এই মঠ ধ্বংস হয়। পরে সংস্কার করা হয় ঠিকই কিন্তু ১৮৭৮-’৭৯-তে মঠটি স্থানান্তরিত হয়ে ভুটিয়াবস্তি এলাকায় চলে যায়। প্রশ্ন হল কেন? আর একটা সুরঙ্গ। সেটাই বা ওখানে কেন?"


শেষের কথা দুটো এত আস্তে বলল রাহুল, যে অবিনাশ ঠিক শুনতেও পেল না।


সে বলল, "চল তাহলে ঘুরেই আসি। তোর মনের অন্ধকার কিছুটা দূর হোক।"

কথাটা যে রাহুলের মনে ধরেছে তা বুঝতে পারল অবিনাশ। কথা না বাড়িয়ে ঝটপট তৈরী হয়ে নিল দু'জন। তারপর ম্যাল পেরিয়ে ডান দিকের অপেক্ষাকৃত ছোট রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেসে এগিয়ে গেল ওরা। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর একটা ছোট তোরণ। তার ওপারে খাড়া রাস্তা ওপরে সোজা উঠেই ফের ডান দিকে বেকে গিয়েছে। তোরণটা দেখে ঠিক ভক্তি হল না অবিনাশের। পাড়ার ছোট মন্দিরও অনেক বেশি সুন্দর গোছানো হয়। তোরণের সামনে কিছু স্থানীয় মানুষ পুজোর পসরা সাজিয়ে বসে আছে। ওরা বোঝেনি এখানেই শেষ মানুষের দেখা হবে।


অবজার্ভেটরি হিলের কিছুটা চড়াই ওঠার পরই আকাশ কালো হয়ে এল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেখতে ঝেপে বৃষ্টি নামল। জনশূন্য অন্ধকারাচ্ছন্ন, কুয়াশাঘন সেই রাস্তা এতটাই মোহময়ী লাগল অবিনাশের কাছে যে, নিজের অজান্তেই শিউড়ে উঠল। সেই কুহেলিকা ভেদ করে দুই তিনটে প্রেত মূর্তি বেরিয়ে এলেও অবাক হবার কিছু নেই।


পত পত করে উড়ছে বৌদ্ধ খাদা এবং রঙ বেরঙের ছোট ছোট কাপড়ের নিশান। লম্বা দড়ি, বাশের কঞ্চিতে লাগানো সারি সারি সেই নকশা করা নিশান গুলো অবাক দৃষ্টিতে দেখছিল অবিনাশ। রাহুল বলল, "এগুলো কী জানিস?"

মাথা নাড়ল অবিনাশ।

রাহুল হেসে বলল, "বৌদ্ধরা তোর আমার থেকে অনেক বেশি ভূত প্রেতে বিশ্বাস করে। ওদের ধারণা উচু পাহাড়ে বা বাড়ির ছাদে এই মন্ত্রপূত থাঙ্কা ওড়ালে প্রেত ভয় থেকে নিস্তার মেলে। দেখ প্রতিটা থাঙ্কায় মন্ত্র লেখা আছে।"


রাহুলের কথা শুনে আরও মনযোগ দিয়ে সেই উড়ন্ত থাঙ্কা গুলোকে দেখতে ওপরে উঠতে লাগল অবিনাশ।


আর পাচটা সাধারণ হিন্দু দেবতাদের যে মন্দির দেখতে অভ্যস্ত অবিনাশরা, এটা ঠিক তেমন নয়। গম্বুজাকৃতি মন্দিরে আলাদা কোনও গর্ভগৃহ নেই। জাকজমকেরও বড় অভাব। একেবারেই সাদামাটা ছোট মন্দির।

সামনের দু-তিন ধাপ সিড়ি উঠে মন্দিরের সামনে গিয়ে যখন ওরা পৌঁছল তখন হাতঘড়ি বলছে বারবেলা অতিক্রান্ত হয়েছে বহুক্ষণ। তবে পরিবেশ দেখে তা বোঝার উপায় নেই। কালো মেঘটা আরও জমাট বেধেছে। মন্দিরের ভিতরে যেন সেই অন্ধকারটা মিশকালো কোনও জন্তুর মতো কুণ্ডুলী পাকিয়ে বসে আছে। গা টা আবার শিউড়ে উঠল অবিনাশের।

গর্ভগৃহে কোনও আলো নেই। কয়েকটি ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে তাতেই যতটুকু আলো হচ্ছে তাতেই অবিনাশ দেখল, ঘরের পিছনের দেওয়ালে তিনটে পর পর ডিম্বাকৃতি শিলা খণ্ড গাথা আছে। মাঝেরটা একটু বড়। পাশের দুটো তুলনামূলক ছোট। দেখেই বোঝা যাচ্ছে শিলা খণ্ডের নীচের অংশটা বেদীর মধ্যে প্রোথিত। আরও একটা বিষয় লক্ষ্য করে অভিভূত হয়ে গেল অবিনাশ। মূর্তি তিনটিই আগাগোড়া সোনায় মোড়া। পিচঢালা সেই অন্ধকারে সোনার ওপর প্রদীপের আলো পড়ে অসম্ভব একটা মায়াবী অলৌকিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। গোগ্রাসে ভয় মিশ্রিত সেই সৌন্দর্য সম্মোহিতের মতো চেটেপুটে উপভোগ করছিল অবিনাশ। ডান দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল। একটা লোক অন্ধকারের মধ্যে বসে অছে। আর মিটমিট করে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। বাইরে থেকে হঠাৎ করে অন্ধকার ঘরে ঢুকে লোকটিকে দেখতে পায়নি ওরা। এখন অন্ধকার অনেকটা চোখ সওয়া হয়ে যেতে লোকটিকে দেখা গেল।


লোকটার বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ পঞ্চান্ন। পেশিবহুল মজবুত শরীর। পরণে উজ্জ্বল কমলা আর গাঢ় মেরুন রঙের জোব্বা মতো কিছু একটা জড়ানো। মাথা মসৃণ করে কামানো। তার মানে এ কোনও লামা! কিন্তু হিন্দু মন্দিরে লামার কাজ কী? এতক্ষণে অবিনাশ দেখল, চুপ করে বসে নেই লামা। অনবরত তার ঠোট দুটো নড়ছে। সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনে রাখা একটা বড় ব্রোঞ্জের পাত্রে মদ ঢেলে চলেছেন। খুব সম্ভবত রাম। এই পুজোর অর্থ বা তাৎপর্য কিছুই বোধগম্য হল না অবিনাশের। উল্টে পাহাড়ের এত ওপরে এই নির্জন অন্ধকার মন্দিরে লামার এই অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে গা ভার হয়ে গেল তার।

রাহুল কিন্তু খুব মনোযোগ দিয়ে লামাকে পর্যবেক্ষণ করছে। লামাটিও ওর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়া আছে। অবিনাশ ওর জামাটা ধরে একটা হাল্কা টান মেরে চাপা গলায় বলল, "চল এবার। আমার ঠিক গতিক সুবিধার লাগছে না।"

রাহুল তার কোনও জবাব না দিয়ে হাতের মুদ্রায় বসতে বলল অবিনাশকে। তারপরই দুম করে লামার উদ্দেশে বলল, "কোন সাধনা করছেন?"

লামাটি বেশ কিছুক্ষণ রাহুলের দিকে চেয়ে থাকল। সে চোখের দৃষ্টি বর্নণাতিত। অবিনিশের মনে হল কুতকুতে দুটো চোখ যেন মুহূর্তে মশালের মতো জ্বলে উঠেই দপ করে নিভে গেল।

তারপর একটা রাইটিং প্যাডের পাতায় খসখস করে কীসব লিখে রাহুলের দিকে বাড়িয়ে দিল। তারপর হাসি মুখে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে ডান হাতটা ওপরে তুলল।

কাগজটায় এক ঝলক চোখ বুলিয়ে উঠে গেল রাহুল। তারপর মন্দির থেকে সোজা বেরিয়ে নীচে নামার পথ ধরল। কী হচ্ছে কিছুই বুঝল না অবিনাশ। এক পলকে লামাকে দেখে সেও রাহুলের পিছন পিছন চলতে লাগল। লামাটি কিন্তু তখনও বিড়বিড় করে চলেছে।

মন্দির থেকে বেশ খানিকটা দূরে এসে উত্তেজিত হয়ে অবিনাশ বলল, "কী হল আমাকেও কিছু বলবি তো? তুই কী করে বুঝলি ও...ও সাধনা করছে? বৌদ্ধ লামা হিন্দু মন্দিরে কীসের সাধনা করবে? আর তোকে কী লিখে দিল?"

রাহুল পিছন ফিরে লামার দেওয়া কাগজটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "এখন আর কিছু নয়। সব কথা নীচে গিয়ে।"

অবিনাশ দেখল লাল কালির পেন্সিলে পাকা হিন্দিতে দুটো লাইন লেখা কাগজটায়। প্রথমটা- "তুমহারা অন্ত নিকট" আর দ্বিতীয়টা- "কাল শাম কো ঘুম মনাস্ট্রি"। কাগজের শেষে লেখা "বড়া লামা"।

একটা জিনিস অবিনাশ বুঝল, ইনি ঘুম মনাস্ট্রির বড় মানে প্রধান লামা। আর তিনি কাল সন্ধ্যায় সেখানে ওদের যেতে বলেছেন। কিন্তু প্রথম লাইনটার অর্থ কিছুই উদ্ধার করতে পারল না অবিনাশ।


চড়াই ওঠা যতটা কষ্টকর নামা ততটাই সহজ। ঢালু রাস্তা নিজেই একরকম জোর করে নামিয়ে দেবে। শুধু দেহের ভারসাম্যটা ধরে রাখতে হয়। দ্রুত নীচে নেমে ম্যালের একটা বেঞ্চে আয়েস করে বসল দু'জন। তারপর অবিনাশের দিকে ফিরে বলল, "তোর সব প্রশ্নের উত্তর এখনই আমার কাছে নেই। তবে লামাটি তন্ত্র সাধনা করছিল সেটা স্পষ্ট। বৌদ্ধরা আমাদের থেকেও অনেক বেশি এক্সপার্ট এসব ক্ষেত্রে। আর ওদের তান্ত্রিক ক্রিয়া মারাত্মক ফলপ্রদ। আমাদের ওই পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা ভণ্ডামি ওরা করে না। কিন্তু কোন মার্গের উপাসনা উনি করছিলেন বা ওঁর আরাধ্য দেব বা দেবী কে সেটা বুঝতে পারলাম না।"

কথা শেষ করে উদাস চোখে সামনের পাহাড়ের দিকে চেয়ে রইল রাহুল। অবিনাশ এ সুযোগে বলল, "আর এই 'অন্ত্'? কার মৃত্যুর কথা বলছেন উনি?"


রাহুল একটা বিষন্প হাসি হেসে বলল, "কাগজটা যখন আমাকে দিয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবেই মৃত্যর বিষয়টাও আমাকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু কবে, কোথায় আর কখন আমার ঘাড়ে নেমে আসবে সেই কালদণ্ড?"

নিজের মৃত্যু সময় ঘণিয়ে এসেছে দেখেও একটা মানুষ এত স্বাভাবিক কী করে থাকতে পারে বুঝল না অবিনাশ। তবে কী এই লেখা দেখে গভীর আঘাত লেগেছে ওর মনে? কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিবেশটা কেমন ভারী হয়ে গেল। অবিনাশ ভাবল, আজ মন্দিরে না গেলেই হত। তারপর প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলল, "আজ কী খাবি বল? হুইস্কি না স্কচ?"

রাহুল অন্যমনস্ক হয়ে বলল, "রাম।"


ম্যাল সংলগ্ন বাজার ঘুরে টুকটাক কেনাকাটা করে একটা পানশালায় বসল ওরা। অ্যান্টিক জিনিসের প্রতি অবিনাশের একটা অদ্ভূত টান আছে বরাবর। আর এখানে তো অ্যান্টিকের ভাণ্ডার। প্রতিটা কিউরিও শপে থরে থরে সাজানো অ্যান্টিক বস্তু। তার মধ্যে থেকেই বেছে বেছে একটা মূর্তি পছন্দ করেছিল অবিনাশ। পাচ ইঞ্চির মতো লম্বা ব্রোঞ্জের একটা মূর্তি। দেখতে সেই রাক্ষসের মতো। তবে এটা নারী মূর্তি। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি বললেন, মূর্তিটা উগ্রতারা। দামও অনেক কম। লাফিয়ে উঠল অবিনাশ। এত কম দামে এমন সুক্ষ নিপুন কারিগরি আর মিলবে না। মূর্তিটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে রাহুল অবশ্য বলল, "এটা নিস না। আমার ঠিক ভালো লাগছে না।"

অবিনাশ মুখটা বিকৃত করে বলল, "কী বলছিস? এত সুন্দর মূর্তি এত কম দামে পাচ্ছি নেব না? না, না বাধা দিস না।"

আরও দু-এক বার মৃদু আপত্তি কলেছিল রাহুল। অবিনাশ ওর কোনও কথাই কানে নেয়নি।

পানশালাটা মোটামোটি ফাঁকাই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকজন। ওরা কোনার দিকে একটা টেবিল দখল করল। তারপর রাহুলের জন্য রাম আর অবিনাশ নিজের জন্য হুইস্কি অর্ডার করে বলল, "মূর্তিটা কিনতে না করছিলি কেন বলতো?"

সিসারেট ধরিয়ে তাতে লম্বা একটা টান দিয়ে বলল, "ওটা বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবীর। তবে দোকানদার একটা ভুল বলেছে। মূর্তির গঠন দেখে মনে হচ্ছে ওটা উগ্রতারা নয়, নীল সরস্বতী হবে।"


হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে অবিনাশ বলল, "ধুর ধুর। নীল-লাল-হলুদ, তারা, সরস্বতী যাই হোক তাতে কী এসে গেল? মোদ্দা কথা এত সুক্ষ্ম কারুকার্যের একটা আর্ট অব পিস ঘরে রাখলে একটা বেশ ইয়ে ইয়ে ব্যাপার হবে। আর সেটাই আমার কাছে মূল কথা।"


অবিনাশের কথার কোনও উত্তর দিল না রাহুল। শুধু হেসে বলল, "দেখ কী হয়!"


পানশালা থেকে ওদের হোটেল দেখা যায়। মদ্যপানটা একটু বেশিই হয়েছে। ভেজা স্যাতস্যাতে ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় মৌজটা উপভোগ করতে করতে খানিক টলতে টলতে ওরা ম্যালের ঠিক মাঝখানে এসে দাড়াল। ম্যাল তখন জনশূন্য। দোকান গুলোও বন্ধ হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর কুয়াশার দাপটে হাত দুই দূরের ছবিও অস্পষ্ট, আবছা।

রাহুল বলল, "কী রে হোটেলে যাবি নাকি এখানে একটু থাকবি?"

অবাক হয়ে অবিনাশ বলল, "তুই বলছিস এ কথা! মঠ, মন্দির, তন্ত্র মন্ত্র, ভূত, প্রেত ছাড়া আর কিছু  বুঝিস? কবে থেকে এত প্রকৃতি প্রেমী হয়ে উঠলি? বেশ দেরীতে হলেও শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে। চল বসা যাক।" বলেই বন্ধুর পিঠে একটা চাপড় মেরে এগিয়ে গেল অবিনাশ।

খাদের ধারে ঝাউ গাছের নীচে একটা বেঞ্চে বসল ওরা। পরিবেশ এতটাই নিস্তব্ধ যে নিজেদের হৃদস্পন্দন নিজেরাই শুনতে পেল। চুপ করে বসে প্রকৃতির অদ্ভুত খেলা দেখছিল ওরা। একটার পর একটা মেঘ ভেসে এসে দূরের পাহাড়, গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে। আবার দেখতে দেখতে জল শূন্য সেই মেঘ ভেসে চলে যাচ্ছে অন্যদিকে। অন্য কোনখানে। কতক্ষণ এভাবে ওরা বসে মেঘ পাহাড়ের লুকোচুরি দেখছিল খেয়াল নেই। আচমকা একটা ধরা গলার প্রশ্নে চমকে উঠল দু'জনেই। কখন কুয়াশার চাদর ছিড়ে একটা লোক ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি ওরা।


আপাদ মস্তক কালো চাদরে ঢাকা শীর্ণকায় লোকটা। মনে হয় যেন হারের ওপরেই চাদরটা জড়ানো। চোখ দুটো দেখে নেপালি বা টিবেটিয়ান মনে হয় না। এতো বাঙালি!

লোকটা ভাঙা গলায় বলল, "বাবুসাব ও জিনিসটা নেবেন না। ও জিনিসটা ভালো নয়। ওটা দিয়ে আসুন।"


কোন জিনিস? কাকে দেবে? জিনিসটাই বা কার কাছে আছে? লোকটা বলতে কী চাইছে? বাকরুদ্ধ অবস্থায় লোকটির দিকে চেয়ে থাকল ওরা। রাহুল আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই অবশ্য ফের কুয়াশায় মিলিয়ে গেল লোকটা।

রাহুল বলল, "কী ব্যাপার বলতো? কিছু বুঝলি?"


অবিনাশ চুপ। ভ্রু কুচকে এক ভাবে লোকটা যেদিকে গেল সেদিকেই তাকিয়ে আছে।

আবার রাহুল বলল, "কীরে কী ভাবছিস?"

এবার অবিনাশের মুখ খুলল। কাটা কাটা ভাবে বলল, "লোকটা কী বলল? কোন জিনিসের কথা বলল?"

-"ও কিছু না। এত রাতে এই বৃষ্টিতে কোন সুস্থ মানুষটা আছে এখানে? চল উঠি।"

নেশার ঘোর কেটে গিয়েছে অবিনাশের। সে বেশ দৃঢ় সুরে বলল, "রাহুল, লোকটা পাগোল না। একে আমি চিনি।"


-"তুই চিনিস! কে লোকটা?"


-"হুম। আলবাত চিনি। আমার চোখ আর কান এতটা বেইমানি করবে না। কিন্তু কোথায় দেখেছি সেটা পেটে এসেও মাথায় উঠছে না।"


অবিনাশ দুঁদে গোয়েন্দা। এতটা ভুল যে তার হবে না সেটা ভালো মতোই জানে রাহুল। এখন না মনে পড়লেও নেশা কাটলে ঠিক মনে পড়বে। এক রকম টেনে অবিনাশকে হোটেলে নিয়ে গেল রাহুল।


হোটেলের নীচে দোকানটার একটা পাল্লা খোলাই ছিল। দোকান দিয়েই হোটেলে ঢুকতে হয়, তাই এই ব্যবস্থা। সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বিনয় তামাঙের গলা পেল ওরা। খোলা জায়গাটায় বিনয় আর একজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। অবিনাশদের দেখে উত্তেজিত হয়ে বিনয় বলল, "এই তো বাবু একটু আগে আপনাদের খোঁজে একজন এসেছিল। আপনারা পুলিশ?"


হতবাক বিস্ময়ে নিজেদের মুখ চাওয়াচায়ি করল অবিনাশ আর রাহুল। বিনয়ের তো জানার কথা নয়। হোটেলের রেজিস্টার বুকেও নিজেদের কোনও পরিচয় দেয়নি ওরা। পেশার জায়গায় শুধু চাকরি লিখেছে। পরিচয় পত্র হিসেবে দিয়েছে ভোটার কার্ড। তবে লোকটা জানল কী করে?


রাহুল একটু গলাটা ঝেড়ে অবিনাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, "ও পুলিশের লোক। কিন্তু তুমি কী করে জানলে?"


রাহুলের কথা শেষ হতে না হতেই পাশের লোকটির উদ্দেশে বিনয় বলল, "দেখলি। আমি বলেছিলাম না।" তারপর উত্তেজনার বশে আধা বাংলা আধা হিন্দিতে বিনয় যা বলল তা অনেকটা এরকম, আজ সন্ধ্যা থেকে দু'বার অবিনাশের খোজে একটি লোক হোটেলে ঢু মেরেছিল। তিন বারের বেলা বিনয়ের প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে লোকটি বলেছে, এই হোটেলে যে পুলিশ বাবু আছেন তার সামনে খুব বড় বিপদ। তিনি নাকি ওকে চেনেন বলেও দাবি করেছে লোকটা। এর বেশি কিছু সে আর বলেনি। হোটেলে মোট চারটে ঘরে লোক আছে। সব ঘরে গিয়ে খোঁজ নিয়েছে বিনয়। কিন্তু পুলিশে কেউ চাকরি করে না। বাকি ছিল অবিনাশরাই।


রাহুল জিজ্ঞাসা করল, "তা বিনয় তুমি লোকটিকে চেনো? স্থানীয় কেউ? ওর চেহারা তোমার মনে আছে? মানে কেমন দেখতে?"


বিনয়ের মুখের সেই হাসির রেশটা উধাও হয়ে গিয়েছে। সেখানে জমা হয়েছে এক রাশ ভয়। সেই ভয় মেশানো সুরে বিনয় বলল, "সেই চেহারা ভোলার নয় বাবু। লোকটার মুখটা যেন পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে। শীর্ণ কঙ্কাল সার চেহারা। কিন্তু লোকটার চোখ দুটো অসম্ভব জীবন্ত। ভাটার আগুনের মতো ধিক ধিক করে জ্বলছিল সেগুলো। আমি....আমি হলপ করে বলতে পারি বাবু ও.... ও মানুষ নয়। প্রেত ছিল।"


পাহাড়ি মানুষ গুলো এমনই। এআ সহজ সরল মানুষ গুলোকে বোকা বানানো ভয় দেখানো খুবই সহজ। আর কথা বাড়াল না রাহুল। রাতের খাবার তাদের ঘরে দিয়ে দিতে বলে অবিনাশকে নিয়ে বিদায় নিল। তবে খচখচানি একটা তার মনেও থেকে গেল। মিথ্যা বিনয় বলছে না সেটা পরিষ্কার। তবে লোকটা কে ছিল? আর সে এখানেই বা অবিনাশের খোঁজ পেল কী করে?


ঘরময় পায়চারি করছে অবিনাশ। রাহুল তাকে বুঝিয়েছে, অস্বাভাবিক কিছুই নেই এখানে। হয়তো ওকে সত্যি চেনে। সকালে ম্যালে দেখেছে। তাই এসেছিল। কিন্তু অবিনাশের এক গোঁ। রাতে ম্যালের সেই লোকের সঙ্গে হোটেলে যে এসেছিল তার চেহারার কোনও ফারাক নেই। আর লোকটিকে সে চেনে।


এক সময় ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় রাহুল। একে রামের নেশা তার ওপর ঠাণ্ডা মিঠে আবহাওয়া। কখন চোখ বুজে এসেছিল রাহুল বুঝতে পারেনি। ঘুম ভাঙল একটা প্রবল ঝাকুনিতে। ধরমর করে উঠে বসতে গিয়ে তার মুখের ওপর অবিনাশের গম্ভীর মুখ দেখে আঁতকে ওঠে রাহুল।


চোখ কচলাতে কচলাতে রাহুল বলল, "কী রে এত রাতে এরকম ধাক্কধাক্কি করছিস কেন? কী হয়েছে?"


সিগারেটে টান দিতে দিতে থমথমে গলায় অবিনাশ বলল, "উঠে বোস। আগে চোখে মুখে জল দিয়ে আয়। কারণ যা বলব তা শোনার ধৈর্য্য থাকতে হবে।"


রাহুলও একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, "ঠিক আছি। বল কী হয়েছে?"


অবিনাশ সিগারেটের শেষ অংশটা ছাইদানে গুজে দিয়ে বলল, "শোন তবে। মাস আটেক আগে জোড়াসাঁকো এলাকায় একটা খুনের তদন্তের ভার আসে গোয়েন্দা বিভাগের ওপর। স্থানীয় থানার পুলিশ কিনারা করতে পারেনি। আমি নিজেই গিয়েছিলাম সরেজমিনে দেখতে। অদ্ভুত খুন। চার তলার ফ্ল্যাটের দরজা ভিতর থেকে লক। জানালার গ্রিল ইনট্যাক্ট আছে। অথচ ভিতরে রক্তাক্ত দুটো দেহ পড়ে আছে। স্বামী স্ত্রী দু'জনকেই নৃসংশ ভাবে খুন করা হয়। গলায নলি ছিন্নভিন্ন। এক দু'বার নয়। যেভাবে গলা দুটো হা হয়ে আছে তাতে স্পষ্ট খুনি বেশ কয়েক বার অস্ত্র চালিয়েছে গলায়। তীব্র আক্রোশ বশেই খুন। স্থানীয় থানা সন্দেহ বশেই ফ্ল্যাটের কেয়ায টেকারকে আটক করেছিল। লোকটি আমাকে বার বার বলেছিল সে নির্দোষ। সে খুন করেনি। তাও তাকেই শেষে গ্রেফতার করা হয়। অথচ লোকটির বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ বা মোটিভ পাওয়া যায়নি। আর একদিন লালবাজার লকআপে...."


বলে থামল অবিনাশ। রাহুল ব্যাগ্র সুরে বলল, "তারপর কী হল?"


আর একটা সিগারেট ধরিয়ে জানালার পাশে দাড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে অবিনাশ বলল, "সেও খুন হল। এক ভাবে। গলা কাটা অবস্থায় তার দেহ পাওয়া যায়। তার নাম ছিল বিশু পাল।"


তারপর আচমকা রাহুলের দিকে ফিরে সে আবার বলল, "আজ যে লোকটা হোটেলে এসেছিল, ম্যালে দেখা দিয়েছিল সে আর কেউ নয়, সে বিশু পাল।"

অবিনাশের কথায় বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল রাহুলের। কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না প্রথমটা। তারপর কাপা গলায় বলল, "তুই সিওর? মানে কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?"


জানালা থেকে মুখ ফিরিতে অবিনাশ ঠোটের কোনে একটা তির্যক হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল, "ভুলে যাস না, আমি পেশায় গোয়েন্দা। তবে প্রথমে আমিও একটু ধোকা খেয়েছিলাম বৈকি! তবে এখন একেবারেই কনফর্ম। উহু, এক চেহারা, এক কণ্ঠস্বর। এ বিশু না হয়ে যেতেই পারে না। কিন্তু খটকাটা অন্য জায়গায়। বিশু মারা গেছে আজ প্রায় আট মাস। আমি নিজে ওর বডি রিলিজের অর্ডারে সাইন করেছি! সে আজ এই দার্জিলিংয়ে এল কী করে? হাউ ইজ ইট পসিবল?"


-"না সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।"


চমকে উঠে অবিনাশ কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাকে হাথ দেখিয়ে থামতে বলে রাহুল বলল, "তিব্বতিরা বিশ্বাস করে, মৃত ব্যক্তিদের আত্মা বড় কোনও বিপদের আগেই কাছের মানুষদের সাবধান করে দেয়। এক্ষেত্রেও তেমনই কিছু ঘটেছে বলে আমার ধারণা। লোকটার মৃত্যু হয়েছে ঠিকই কিন্তু মৃত্যুর আগে তোর প্রতি কোনও কারণ বশত ওর একটা মমত্ব বোধ জন্মে ছিল। সেটা কেন, তা বলতে পারব না। আর সেই টানেই সে তোকে সাবধান করে দিতে এই দার্জিলিং এসেছিল। এবার প্রশ্নটা হল, তোর সামনে কী বিপদ হতে চলেছে বা হতে পারে?"


দু'জনেই চুপ। ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। নিস্তব্ধ চরাচর। গোটা দার্জিলিং শহরটাই যেন রাতারিতি প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে। চিন্তা করে কী আর বিপদকে রোখা সম্ভব? তবুও অনেকক্ষণ কেউ কোনও কথা বলল না। ভারী হয়ে ওঠা পরিবেশটা একটু হাল্কা করতে অবিনাশ বলল, "যাক একটা ইচ্ছা আমার পূর্ণ হল। সাক্ষাৎ ভৃত এসে আমাকে দর্শন দিয়ে গেল। আরও একটা দিকে নিশ্চিন্ত। বিপদ দু'জনেরই। সকালে লামা তোকে বলেছে, রাতে ভূত আমাকে বলল।" বলেই জোরে হেসে উঠল অবিনাশ।

রাহুল কিন্তু গম্ভীর। সে থমথমে গলায় বলল, "দুটোই যদি তোর জন্য হয়! মানে লামা যদি তোর কথাই বলতে চায়?"


হাসিটা মিলিয়ে গেল অবিনাশের মুখ থেকে। তারপর জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল, "তা কী করে হবে? লামা তো কাগজটা তোকে দিয়েছিল। আর..."


কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল অবিনাশ। কপালটা কুচকে গিয়েছে তার। রাহুল একটু হেসে বলল, "বল থামলি কেন? আচ্ছা আমি বলছি। 'ওই জিনিসটা' তোকে ফেরত দিয়ে দিতে বলেছিল বিশুর আত্মা। এমন কোন জিনিস তোর কাছে আছে?"


-"কী আছে এমন আমার কাছে?"

-"আছে। তারা মূর্তি।"


উত্তেজিত স্বরে অবিনাশ বলল, "তাই যদি হবে, সে তো বিকালে কেনা। সকালে লামা তবে বলবে কেমন করে?"

-"শোন অবিনাশ ভাগ্যের ফের একেই বলে। তুই মূর্তিটা কিনবি সেটা না জানলেও লামা বুঝতে পেরেছিল কোনও একটা অসুবিধা তোর আসছে। আর সে কারণেই হয়তো তিনি সাবধান করে দিয়ে ছিলেন।"


কার্যত ফুৎকারে রাহুলের কথা উড়িয়ে দিয়ে অবিনাশ বলল, "একটা চার-পাচ ইঞ্চির মূর্তি মানুষকে বিপদে ফেলতে পারে, এটা হাস্যকর। আর যদি বিপদে পরি তখন দেখা যাবে।"


সকালে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে খোলা জায়গাটায় এসে দাড়াল অবিনাশ। সারা রাত বৃষ্টির পর আকাশ এখন ক্লান্ত। তবে মেঘ আছে। দূরে ঘণ কুয়াবৃত পাহাড়রাজিকে স্বর্গ বলে ভ্রম হয়। দেখতে দেখতে দু-একটা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মেঘের ভেলা ভাসতে ভাসতে একেবারে অবিনাশের মুখের ওপর দিয়ে চলে গেল। সেই ঠাণ্ডা স্পর্শে শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল ওর। অবিনাশ ভাবল, এমন নৈসর্গিক পরিবেশে মৃত্যুও পরম সুহৃদ। আসুক না সে। ক্ষতি নেই।


এতটাই তন্ময় হয়ে গিয়েছিল যে কখন রাহুল ওর পছনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি অবিনাশ। পিঠের ওপর আলতো হাতের স্পর্শে চমকে পিছনে ঘুরল।


-"ওহ্, তুই!"


-"কেন, তুই কী অন্য কারও আশা করছিলি?"


বলেই হেসে ওঠে রাহুল। রীতিমতো তাড়া দিয়ে বলল, "নে চল এবার। বেরোবি তো নাকি এখানেই বসে কাটিয়ে দিবি?"


এক চুমুকে চা'টুকু শেষ করে অবিনাশ বলল, "হুম সে তো বেরোব। কিন্তু যাবি কোথায় কিছু  ঠিক করেছিস?"


-"কাছাকাছি কিছু মনাস্ট্রি, চা বাগান, চিড়িয়াখানা, সিস্টার নিবেদিতার বাড়ি। অনেক কিছু আছে। একটা গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে যাব। আরও একটা জায়গায় যেতে হবে।"


শেষের বাক্যটা এতটাই আস্তে বলল রাহুল, মনে হল যেন, সেটা অবিনাশকে আদতে ও বলতে চায়নি। কিন্তু তা কানে গিয়েছে অবিনাশের। একটু অবাক হয়ে সে বলল, "আর কোথায় যাবি?"


-"সেই দোকানে, যেখান থেকে তুই গতকাল মূর্তিটা কিনেছিলি। একবার দোকানের মালিকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।"


কোনও আপত্তি করল না অবিনাশ। তার মনেও একটা খটকা দানা বেধেছে। একটা মূর্তিকে নিয়ে এত রহস্য কেন জট পাকাচ্ছে? এর পিছনের কারণ জানার জন্য সেও ছটফট করছিল বৈকি। এখন রাহুলের কথায় দ্বিগুণ উৎসাহে অবিনাশ বলল, "তবে আগে সেখানেই চল। ওই দোকান থেকেই যাত্রা শুরু হোক।"



দোকানটা বেশ বড়। আশপাশের অন্যান্য দোকানের তুলনায় বেশ সাজানো গোছানো। পালিশ করা কাঠের মেঝে, দেওয়ালে থাকে থাকে সাজানো সব অ্যান্টিক জিনিস। গতকালের মতো আজও খুব একটা খদ্দের নেই দোকানটায়। দু-এক জন টুকটাক জিনিস দেখছে। কোনও দিকে না তাকিয়ে সোজা ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল ওরা। একজন মাঝ বয়সি মাথায় গোর্খা টুপি পরা ভদ্রলোক বসেছিলেন ক্যাশে। সেই যে দোকানের মালিক তা বুঝতে অসুবিধা হল না অবিনাশদের। কোনও ভূমিকা না করেই লোকটিকে রাহুল সরাসরি প্রশ্ন করল, "এই মূর্তিটা আপনি কোথায় পেয়েছিলেন?"


আচমকা এমন প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে লোকটি প্রথমে রাহুল পরে মূর্তির দিকে চেয়ে বলল, "মূর্তি কোথায় পেয়েছিলাম তা জেনে আপনার কী? এসব অত্যন্ত গোপনীয়। আমরা এগুলো ডিজক্লোজ করি না।"


প্রায় এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলে দমের অভাবে হাপাতে লাগল লোকটা। প্রয়োজনের একটু অতিরিক্ত কথাই বলল না লোকটা? তার মধ্যে চাপা একটা উত্তেজনাও দৃষ্টি এড়াল না অবিনাশের। সোজা আঙুলে এই ঘি উঠবে না। রাহুলকে সরিয়ে এবার ক্যাশ কাউন্টারের সামনে গিয়ে পেট থেকে পরিচয়পত্র বের করে লোকটার সামনে রাখল অবিনাশ। তারপর বলল, "এবার কী বলবেন? নাকি...."


অবিনাশের কথা শেষ হওয়ার আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিল লোকটা। তার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। কোনও রকমে কাউন্টারের বাইরে এসে লোকটা বলল, "আসুন আমার সাথে। আমি সব বলছি আপনাদের।"


লোকটাকে অনুসরণ করে দোকানের এক কোনে রাখা সিড়ি দিয়ে উঠে আর একটা ঘরে ঢুকল ওরা। ঘরটা আয়তনে এবং উচ্চতায়ও যথেষ্ট ছোট। সোজা হয়ে দাড়ানো সম্ভব না। ঘরে ঢুকে বেতের চেয়ারে বসে পড়ল তিন জনেই।


এ ঘরে দাঁড়িয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। দুপুরের দিকে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন হয় তার, সেকারণেই ঘরটা বানানো হয়েছে বলে জানাল লোকটা। অবিনাশ বলল, "এবার তবে আসল কথায় আসা যাক? মূর্তিটা আপনি পেলেন কোথায়?"


প্রশ্নটা সরাসরি হলেও উত্তরটা সহজে এল না। মানে প্রথমে একটু ভনীতা করলেন দোকানের মালিক। তারপর যা বললেন তাতে রক্ত জল হয়ে গেল অবিনাশদের। গল্পটা এরকম, বর্তমানে এই কিউরিও শপের মালিক দিলকুশ থাপা। দোকানটা প্রথম থেকেই তার ছিল না। স্থানীয় একজনের থেকে বছর পাচেক আগে এটি কিনেছিলেন দিলকুশ। একেবারে জলের দরে পেয়েছিলেন। তার কারণ অবশ্য দোকানটা পুড়ে গিয়েছিল। যাইহোক দোকান আবার নতুন করে তৈরী করায় দিলকুশ। এই ঘরটাও তখনই তৈরী করা হয়েছে। নতুন দোকান বেশ ভালোই চলছিল। সমস্যা হল তিন মাসের মাথায় গিয়ে। আচমকা শর্ট সার্কিট হয়ে যায় দোকানে। জিনিসপত্র তো দূর দিলকুশ এবং দোকানের অন্য কর্মচারীদেরও বাচার আশা ছিল না। সেবার আগুন লাগতে লাগতেও লাগেনি। খুব ভাগ্য জোরে বেচে গিয়েছিল সেবার দিলকুশরা। কিন্তু সেই শুরু। এরপর থেকে কিছু না কিছু গণ্ডগোল প্রায় রোজ লেগে থাকত। কোনদিন কোনও দামী জিনিস ভাঙছে, কোনদিন দোকানের ভিতর এত বাজে গন্ধে ভরে যেত যে খদ্দের থাকত না। কখনও আবার কর্মচারীদের আচমকা শরীর খারাপ হয়ে যেত। দোকান থেকে বেরোলে আবার সব ঠিক। পরিস্থিতি এমন হয়ে যেতে থাকল যে রোজ একটা আতঙ্ক নিয়ে দোকান খুলত দিলকুশ। আজ আবার কী হয়, এই ভয়ে ব্যবসা ক্রমে লাটে ওঠার জোগাড়। শেষে এক লামাকে দোকানে নিয়ে আসল দিলকুশ। সে অনেকক্ষণ ধরে দোকান ঘুরে দেখে একটা মূর্তি দেখিয়ে বলেছিল এটার জন্যই সব অনিষ্ট হচ্ছে। কিন্তু মূর্তি কোনও মনাস্ট্রি নিতে রাজি হয়নি। আর এতটাই সুক্ষ্ম কাজ যে বিনা পয়সায় মূর্তি ছাড়তেও মন চায়নি দিলকুশের।


একদিন এক খদ্দের বেশ চড়া দামেই মূর্তিটা কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু দিন দুই বাদে ফের লোকটি এসে একরকম জোর করে মূর্তি ফেরত দিয়ে গেল। এমনকি টাকাও ফেরত নিল না। এরপর অবশ্য অনেকেই মূর্তিটা পছন্দ করেছিল। দাম শুনে পিছিয়ে যায় সকলেই। বাধ্য হয়ে মূর্তির দাম কমিয়ে দিয়েছিল দিলকুশ। তারপর অবিনাশদের কাছে মূর্তিটা বিক্রি করেছে সে।


গল্প শুনে রাহুল বলল, "সবই তো বুঝলাম। কিন্তু মূর্তিটা আপনি পেলেন কোথা থেকে?"


মাথাটা ঝুকিয়ে দিলকুশ বলল, "আমি মূর্তিটা কিনিনি বাবু। এটা এখানেই ছিল। মনে হয় আগের মালিকের এটা।"


অবিনাশ বলল, "সে কী করে হয়? তার তো দোকান পুড়ে গেছিল? এটা যদি এখানেই থাকত তবে তা অক্ষত থাকল কী ভাবে?"


অবাক বিস্ময়ে দিশকুশ বলল, "তা জানি না বাবু। কিন্তু ও জিনিস এখানেই ছিল।"


এবার রাহুল বলল, "বেশ আগের মালিকের নাম ঠিকানা নিশ্চই আছে আপনার কাছে। সেটা দিন। আমরা তায থেকেই জেনে নেব।"


রাহুলের কথা শুনে হাসল লোকটি। এই প্রথম তার মুখে হাসি দেখা গেল। কাষ্ঠ হাসি হেসে দালকুশ বলল, "নাম ঠিকানা আমি দিচ্ছি। কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনও লাভ নেই বাবু। অগের মালিক বা তার পরিবার কেউই বেচে নেই। ওর ভায়ের থেকে আমি দোকানটা কিনেছিলাম। সেও তারপর কোথায় চলে গেল! অনেক খোঁজ করেছিলাম আমিও। কিছুই জানতে পারিনি।"


নীচে নেমে আগের মালিকের ঠিকানা দিল দিলকুশ। হিলকার্ট রোডের সেই ঠিকানায় গিয়ে জানা গেল সত্যি কথাই বলেছিল দিলকুশ। তবে এই মূর্তির সম্পর্কে কে তাদের বলতে পারে? চক বাজারে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ওরা দু'জনেই আকাশ পাতাল ভাবছিল। কীভাবে এর রহস্য জানা সম্ভব? রাহুল বলল, "এখানে টিবেটিয়ান মিউজিয়ামে গিয়ে দেখলে হয় একবার। ওরা যদি কিছু বলতে পারে!"


হাতড়ে বেড়ানো ছাড়া অন্য উপায় নেই অবিনাশের। লাগলে তুক, না লাগলে তাক। সে বলল, "চল দেখি কোনও সুরাহা হয় কিনা।"


এমজি রোডের মোড় থেকে ম্যালের রাস্তার বিপরীত দিকের রাস্তাটা ধরে কিছু দূর গেলেই ডান হাতে টিবেটিয়ান মিউজিয়াম। কাচের দরজা খুলে উকি মেরে অবিনাশ দেখল খা খা করছে গোটা মিউজিয়াম। একটা লোকও নেই। শুধু ঘরের এক কোনে চেয়ার টেবিল নিয়ে একটি সুশ্রী মেয়ে বসে আছে। ভিতরে ঢুকে তো ওদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। বিভিন্ন জিনিসের মডেল, পাথর-পিতল-ব্রোঞ্জের মূর্তি, বড় বড় বিভৎস সব ছবি, মুখোশে ঠাসা মিউজিয়াম কক্ষ। তবে বেশ সুন্দর পরিপটি করে সাজানো। হাল্কা আলোয় কেমন একটা আলো-আধারি মায়াবী পরিবেশ তৈরী হয়েছে। হাল্কা একটা পোড়া গন্ধও নাকে এল ওদের। অনেকটা শুকনো ডাল পাতা পুড়লে যেমন গন্ধ হয়। এদিক ওদিক খানিক ঘুরে সেই মেয়েটির সামনে গিয়ে দাড়াল ওরা। মেয়টি মুখ তুলতে রাহুল বলল, "আচ্ছা এখানে কেউ আছেন যার সাথে কথা বলা যায়? আসলে আমাদের কাছে একটা জিনিস আছে। মনে হয় সেটা তিব্বতের। সেই বিষয়ে একটু কথা বলার ছিল।"


মেয়েটা কিছুক্ষণ ওদের দু'জনকেই বেশ ভালো মতো দেখল। তারপর কোনও কথা না বলে উঠে গটগট করে পাশের একটা ঘরে গিয়ে ঢুকল। খানিক বাদে বেড়িয়ে এসে শুধু বলল, "ওই ঘরে চলে যান।"


অবিনাশ চাপা গলায় বলল, "বাব্বা, কী দেমাক দেখলি?" রাহুল অবশ্য কোনও জবাব দিল না। অবিনাশের কথা শুনতেই যেন পায়নি এমন ভাব করে পাষের ঘরখানায় ঢুকে গেল।


ঘরটা আয়তনে একটু ছোট। সাদা দেওয়াল। ঘরের আসবাবও সব সাদা। মাঝে একটা সোফায় বসে আছেন জোব্বা পরিহীত একজন বৌদ্ধ লামা। সব লামাকেই এক রকম লাগে অবিনাশের। আগের দিনের মতো এও হাতে জপমালা নিয়ে বিড়বিড় করছিল। ওদের দেখে হাসি মুখে ইশারায় বসতে বলে বললেন, "কী হয়েছে বলুন।"


রাহুল বলল, "একটা মূর্তি আমার বন্ধু কিনেছে। মূর্তিটা তিব্বতের বলেই মনে হয়। মূর্তিটা কোন দেবতার সেটা যদি আপনি একটু বলতেন তো খুব উপকার হয়।" মূর্তির সঙ্গে অলৌকিক ঘটনার বিষয়টি অবশ্য আগাগোড়া চেপে গেল রাহুল। কথা বলতে বলতেই মূর্তিটা ব্যাগ থেকে বেড় করে টেবিলে রাখে সে।


মূর্তিটা দেখেই মুখের ভাবভঙ্গি বদলে যায় লামার। মূর্তিটা হাতে নিয়ে ভ্রু কুচকে বেশ কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে করতে আপন মনেই বলে ওঠেন, "আশ্চর্য!" তারপর ধীরে ধীরে মূর্তিটা রাহুশকে ফেরত দিয়ে বললেন, "এ মূর্তি তিব্বতের নয়। বৌদ্ধদেরও দেবী ইনি নন।"


এবার অবাক হওয়ার পালা রাহুলের। "এটা কোনও বৌদ্ধ দেবী নন!