Search

বিশেষ সংখ্যা ।। ভয় ভৌতিকে ।। গোবিন্দ মোদক


সাতটি সবেদা


গোবিন্দ মোদক 



          অনেকক্ষণ ধরে খোঁজবার পর সুজনের মনে হলো সে এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে জায়গাটা তার অভিপ্রেত জায়গা হতে পারে। বর্ণনার সঙ্গে সে মিলিয়ে দেখলো পশ্চিমে নদী, পূর্ব দিকে গভীর বন, উত্তরে ধূ-ধূ প্রান্তর আর দক্ষিণে জলা জমি। এরকমই জায়গার কথাই মাধব ঠাকুর বলেছিলো বটে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সুজন, তারপর উত্তরে ফিরল। এখানেই তাকে খুঁজে পেতে হবে পঞ্চমুন্ডির আসন। কিন্তু কেমন করে সে খুঁজে পাবে পাঁচখানি গাছের সমাবেশ ? মাধব ঠাকুর বলেছে সেখানে নাকি পাঁচখানি গাছ আছে আর তার মাঝখানে একখানি বেদি। সেইখানেই সাধনা করে সেই অত্যাশ্চর্য এক সাধুবাবা। অতঃপর নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে পেল সুজন। সত্যিই পাঁচ-পাঁচখানি গাছের মাঝখানে একটি বেদিমতো এবং তার ওপরে এক ভীষণদর্শন সাধুবাবা ধ্যানে বিভোর। এমতাবস্থায় কি করা উচিত ভাবতে ভাবতেই ভয়ঙ্কর এক ''ব্যোম !" শব্দে চমকে উঠল সুজন। তার হাত থেকে পথ নির্দেশের কাগজটা খসে পড়ে যাচ্ছিল। একটু ধাতস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুজন শুনতে পেল সাধুবাবা গম্ভীর স্বরে তাকে বলছেন -- কিরে ব্যাটা ! এতেই ভয় পেয়ে গেলি ! এখনও যে তোর অনেক কাজ ! সুজন ইতস্তত: করতে লাগলো। 



           --- বেটা, অতো ঘাবড়ে গেলে চলবে ! তুই যে কাজে এসেছিস সেই কাজটা তো পূর্ণ হওয়া দরকার ! সুজন কিছু বলতে পারলো না শুধু "সাধুবাবা .... সাধুবাবা ...." বলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।



          --- ব্যাটা, আমি সব জানি ! তোর মা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত --- তোকে সেই রোগের ওষুধ নিয়ে যেতে হবে --- কিন্তু বড় ভয়ঙ্কর, বড় কঠিন সে পথ ! পারবি কি তুই !



          --- পারব সাধুবাবা, পারব ! আমাকে পারতেই হবে ! মা ছাড়া যে এ জগতে আমার আর কেউ নেই সাধুবাবা ! মাকে আমার বাঁচাতেই হবে ! সাধুবাবার পায়ে পড়ে সুজন। 



          --- ওঠ, ওঠ বেটা, ওঠ ! মন শক্ত কর ! মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়া। তারপর আমার চোখে চোখ রেখে বল তো --- তোর নাম কি ?



          --- আমার নাম সুজন, সাধুবাবা।



          --- মিনমিন করে নয়, গর্ব করে বল ! শক্ত হয়ে বল !



         --- আমার নাম সুজন ! সুজন দৃঢ়স্বরে বলে।



         --- এই তো মরদের মতো কথা ! আরে, তুই তো 'সু-জন' ! তোর কাছে কোনও কু-জন ঘেঁষতে পারবে না ! তুই পারবি। মন শক্ত কর। 



           --- কিন্তু সাধুবাবা, আপনি কি করে জানলেন !



           --- আমি সব জানি রে ব্যাটা ! তোর মায়ের আয়ু খুব বেশিদিন আর নেই কবিরাজ বলে দিয়েছে। আর তার প্রতিকার স্বরূপ সে একটা ওষুধের নাম করেছে যেটি নিতে তুই এসেছিস। কিন্তু বড় কঠিন সে পথ ! অত্যন্ত একাগ্র মনে কোন দিকে ভয় না পেয়ে তুই যদি দৃঢ় পদক্ষেপে সংকল্পের দিকে এগিয়ে যাস তবেই তোর মনোবাসনা পূর্ণ হবে। মনে রাখিস তোর পথ বড়ই কঠিন। 



           --- সাধুবাবা, আমি তো বুঝতে পারছি না আমি কি করব ! আপনি আমাকে সব বলে দিন সাধুবাবা ! সুজন আবার সাধুর পায়ে পড়ে।


 


           --- আরে ব্যাটা, এতো কাতর হলে চলে ! আমি মহাকালের পূজারী, আমি যোগবলেই দেখেছি তোর ইপ্সিত বস্তুটি হলো সাতটি সবেদা।



          --- সবেদা ? সবেদা এখানে কোথায় পাবো ?



          --- এখান থেকে উত্তরদিকে সোজা এগিয়ে যাবি শ্মশানভূমির মধ্যে দিয়ে। 



          --- শ্মশানভূমির মধ্যে দিয়ে ? আঁতকে ওঠে সুজন।



          --- হ্যাঁ, শ্মশানভূমির মধ্যে দিয়ে। আরে ব্যাটা, শ্মশানভূমির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে শুনেই ভয় পেয়ে গেলি ? তবে এটা ঠিক যে এইটা যে সে শ্মশানভূমি নয় ! এ এক ভয়ংকর শ্মশানডূমি ! অপবিত্র আত্মাদের শ্মশানভূমি ! অনেক অশুভ আত্মা এই শ্মশানভূমিতে বিচরণ করে তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। তারা পারে না এমন কোনও কাজ নেই। খুব সাবধান ! দৃঢ় সংকল্প মাথায় রেখে একাগ্র মনে কোনও ভয় না পেয়ে এগিয়ে যেতে হবে। মনে রাখিস তুই মায়ের ব্যাটা ! কোনো অশুভ আত্মা তোকে স্পর্শ করতে পারবে না ! কিন্তু ভয় পেলে চলবে না ! ভয় পেলেই ওই অশুভ আত্মারা সুযোগসন্ধানী হয়ে উঠবে ! তাই সাবধান, সাবধান বেটা ! এই হরিতকীটা তোকে দিলাম। মন্ত্রপূত হরিতকী ! যেন কোনোভাবেই হাতছাড়া না হয় ! তাহলেই কিন্তু অশুভ আত্মারা সুযোগসন্ধানী হয়ে উঠবে !



          --- তারপর বাবা ?



          --- তুই এই হরিতকী হাতে করে সোজা এগিয়ে যাবি। তারপর খুঁজে পাবি একটি সবেদা গাছের বন। সেই বনে একটি ছোট গাছে মাত্র সাতটি সবেদা ফল পুষ্ট হয়ে আছে। খুঁজে খুঁজে সেই গাছ বের করে সেই সাতটি সবেদা সংগ্রহ করে সোজা ফিরে যাবি বাড়িতে। পথিমধ্যে কোনও প্রলোভনেই কোনভাবেই কিন্তু কারোর বাড়ি দাঁড়ালে চলবে না।



          --- কিন্তু বাবা ... !



          --- কোনও কিন্তু নেই ! যা, এগিয়ে যা ! মহাকাল তোর সহায় হোন ! ব্যোম !



          হঠাৎ সুজন তাকিয়ে দেখে কেউ কোত্থাও নেই ! ভয়ে থর থর করে কেঁপে উঠে সুজন। ভয়াবহ জায়গাটার চারিপাশে তাকায় সে। এমন ভয়ানক জায়গা সে কোনোদিন দেখেনি। দিনের বেলাতেও ঝিঁঝিদের ডাক ! এক-একটা পাখি ভয়ার্ত চিৎকার করছে ! কি যেন এক বিভীষিকাময় আওয়াজ চারিপাশ থেকে ভেসে আসছে ! একটা ভীষণদর্শন সাপ সরসর করে চলে গেল। এদিক ওদিক ছড়ানো মড়ার খুলি আর হাড় ! গায়ে কাঁটা দিল সুজনের। কিন্তু না, তাকে তো ভয় পেলে চলবে না ! তার মা মৃত্যুশয্যায়। তাকে বাঁচাতেই হবে। বাম হাতের তালুতে হরিতকী চেপে ধরে এগিয়ে চলে সুজন। কী ভয়ানক রাস্তা ! পথের দু'ধারে আধপোড়া চুল্লি, আধপোড়া মরদেহ ! চামড়া পোড়ার গন্ধ ও মাংস পোড়ার গন্ধ ! বিভীষিকাময় এক দুর্গন্ধ ! বমি আসে সুজনের। কিন্তু সে দৃঢ় সংকল্পে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। 



          হঠাৎ একটি অন্ধকার মতন জায়গা পার হতেই ভীষণ ভয় পেয়ে যায় সুজন। দেখে কতকগুলো প্রেতায়িত মূর্তি একটি মৃতদেহ খুবলে খুবলে খাচ্ছে ! জীবনে তো এমন ভয়ানক দৃশ্য কোনওদিন দেখেনি সুজন। তাই এসব দেখে দমবন্ধ হয়ে ওঠার উপক্রম হয় সুজনের। এমন সময় সাধুবাবার গম্ভীর গলার স্বর যেন কানে শুনতে পায় সে --- ভয় পাবিনা। তাহলেই কিন্তু সুযোগসন্ধানী প্রেতাত্মারা হুঙ্কার দিয়ে পড়বে ! হরিতকীটা শক্ত করে চেপে ধরে সুজন, তারপর সামনের দিকে এগিয়ে যায়।



           ভয়ঙ্কর এক প্রেতায়িত ভূমি ! আর কতক্ষণ ! আর কতক্ষণ তাকে যেতে হবে ! মনে হয় অনন্ত সময় ধরে এক বিভীষিকাময় পথের পথিক হয়ে চলেছে সুজন ! চারিপাশে ঝিল্লির আওয়াজ ! ডাহুক পাখির আর্তচিৎকার কানে আসে ! তার কাছেই কোথাও একটা পাখি অত্যন্ত ভয়ার্ত সুরে গুব-গুব-গুব-গুব করে ডেকে ওঠে ! সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে ওঠে সুজনের ! সে হরিতকীটাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে। ঠিক সেই মুহূর্তেই এক ভয়ানক পিশাচ আর এক ভীষণদর্শন প্রেতাত্মা তার সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর অঙ্গভঙ্গি করে তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। সুজন আরো শক্ত করে মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে হরিতকীটা। তারপর চিৎকার করে ওঠে সাধু বাবার মতো - ব্যোম !



          মুহূর্তের মধ্যে পিশাচ দু'টো অদৃশ্য হয়ে যায় ! দৃঢ় সংকল্পে এগিয়ে চলে সুজন । ওই তো -- ওই তো দেখা যাচ্ছে স্বপ্নের সবেদা বন !



           সবেদা বনের কাছে এসে স্বস্তির শ্বাস ফেলে সুজন। তারপর খুঁজতে থাকে তার ইপ্সিত গাছ। এমন সময় ভয়াবহ এক কঙ্কাল ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। তার "খিঃ! খিঃ! খিঃ! খিঃ!" অমানুষিক শব্দের ভয়ঙ্কর হাসিতে কেঁপে ওঠে প্রান্তর ! এখন উপায় ! কিন্তু না, তাকে তো হেরে গেলে চলবে না ! তার মাকে সুস্থ করতেই হবে ! হরিতকীটা তালুবন্দী করে আরও চেপে ধরে সুজন, তারপর দৃঢ় পদক্ষেপে কঙ্কালকে অতিক্রম করে এগিয়ে যায়।



           হ্যাঁ, এই তো পেয়েছে সে তার  ইপ্সিত গাছ। এই গাছে সাতটি সবেদা ফলে আছে। সবেদাগুলো তুলে নিতে যায় সুজন। সেই মুহূর্তে এক জীবন্ত প্রেত দু'হাত বাড়িয়ে তার গলা টিপে ধরতে আসে। অমনি সুজন হরিতকীটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে। প্রেত অদৃশ্য হয়। আবার সবেদা সংগ্রহ করার জন্য হাত বাড়ায় সুজন  ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ভয়াবহ কালসাপ প্রকাণ্ড ফণা তুলে তাকে ছোবল মারতে ছুটে আসে। ভীষণ চিৎকার করে মূর্ছা যায় সুজন।



                         

চমকে ওঠে সুজন। দু'চোখ খুলে দেখে সে তার নিজের বিছানায় ! এতক্ষণ তাহলে স্বপ্ন দেখছিল ! এমন ভীষণ স্বপ্নও কেউ বুঝি দেখে ! ইস, ইপ্সিত লক্ষের কাছে গিয়েও তাকে ফিরে আসতে হলো ! তাহলে তার মাকে কি বাঁচানো যাবে না ! অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়ে সুজন। বুঝতে পারে এমন ভয়াবহ সব দুঃস্বপ্ন দেখে তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে, তার পোশাক আর বিছানাও যথেষ্টই ভেজা। আস্তে আস্তে উঠে চোখে-মুখে জল দেয় সুজন। তারপর মায়ের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার মা শুয়ে আছেন, দেখে মনে হয় প্রাণহীন। সে আস্তে আস্তে মায়ের কাছে গিয়ে মাকে ডাকে-  মা ! মা সাড়া দেয় না ! সুজন মায়ের মাথায় হাত রেখে নাকের কাছে হাত রাখে, ধীরে নিঃশ্বাস বইছে। বুকটা খুব সামান্য উঠানামা করছে। দু'চোখে জল চলে আসে সুজনের। সে দু'হাত জোর করে আকুল প্রার্থনা জানান থাকে ঈশ্বরের কাছে। তারপর মায়ের জন্য পথ্য আনতে কবিরাজ বাড়ির দিকে এগোয়।



          ফিরে এসে সে দেখে তার মা বারান্দায় বসে আছে। সুজনকে দেখেই বলে ওঠে -- বাবা, তুই যে ছেলেটিকে সবেদা দিয়ে পাঠিয়েছিস, সে কিছুক্ষণ আগে সবেদা দিয়ে গেছে।



        --- সবেদা ! আমি ! সেকি ! আমি তো কাউকে পাঠাই নি !



           --- সে কি রে ! ছেলেটি যে বললো সুজন আমাকে সবেদা দিয়ে পাঠিয়েছে -- এই সাতটি সবেদা স্নানের পর সাত দিন খেলে আমি নাকি ভালো হয়ে উঠবো !



             দু'হাত জোর করে ভীষণ কান্নায় ভেঙে পড়ে সুজন --- ঈশ্বর ! তুমি অসীম করুণাময় ! আমার ওপর এতো দয়া তোমার !



            সুজনের এই আচরণে অবাক হয়ে পড়ে মা ---  কি ব্যাপার, সুজন !



            সুজন তখন সমস্ত ঘটনা আনুপূর্বিক বলে। ওর মা দুই হাত কপালে স্পর্শ করে, তারপর সুজনকে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে। সুজন টের পায় আর কোথাও কোনও ভয় নেই।

17 views0 comments