Search

বিশেষ সংখ্যা ।। ভয় ভৌতিকে ।। তন্ময় মুখার্জি 


পিশাচিনী



তন্ময় মুখার্জি 






ভরা শ্রাবণ মাসের সন্ধ্যা, বাড়ির ব্যাল্কনিতে চেয়ারে বসে সামনের কাঁচের জানলা দিয়ে বৃষ্টির অবিরাম বর্ষণ ধারা আর মৃদু মন্দ ঠান্ডা বাতাস প্রাণের অন্তর স্থল পর্যন্ত একটা আনন্দের তরঙ্গ তুলে মনটাকে আমার যেন মুখোরিত করে তুলেছিল। আমার পিছনে টেপ রেকর্ডারে তখন গানটা বাজছে -



         " শ্রাবণের ধারার মতো, ঝরুক পড়ে, 


          ঝরুক পড়ে,,"



বৃষ্টির ধারা যেন ভিজিয়ে দিয়ে গেল মনের বাকি থেকে যাওয়া চাওয়া টুকু। ঘরে বসে বৃষ্টি দেখার আনন্দটা ঠিক যেন মিলিয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। বৃষ্টি গায়ে না মাখতে পারলে তাকে দু'হাতে স্পর্শ না করতে পারলে মনের পিপাসাটা যেন বাকি থেকে যায়,তাই বেড়িয়ে পড়লাম বাড়ির বাইরে। সেই সময় মুশোল ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। কি আর করা যায় মনের আশা টুকু পুরণ করতে ছাতা নিয়ে সোজা রাস্তা ধরে জল কাঁদা পার করে হাঁটতে, হাঁটতে চলে এলাম বাড়ির কাছেই গঙ্গা নদীর ঘাটে। এই ঘাটের আবার একটা নাম আছে, এটাকে " শিব মন্দির ঘাট" বলা হয়। নিস্তব্ধতা আর অন্ধকারে ঢেকে থাকা ঘাটের ঠিক পাশেই তেলে ভাজার একটা গুমটি দোকান ঘর নজরে পড়ল,দোকানটার অর্ধেক ঝাপ খোলা আর তার ভিতর থেকে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা হ্যারিকেনের আলোটা দোকানের সামনের খাণিকটা অংশকে আলোকিত করে রেখেছে। দোকানের ভিতর থেকে ধোঁয়া বেড়তে দেখে বুঝতে পারলাম চপ ভাজা হচ্ছে। এগিয়ে গেলাম সেই দিকেই। এখানে এলাম প্রায় চার বছর পর এর আগে এই দোকানটি নজরে পরেনি,বোধহয় খুব বেশিদিন হয়নি দোকান এখানে হয়েছে। এগিয়ে গেলাম সেই দিকেই, দোকানের ভিতরে একজন বয়স্ক বৃদ্ধ লোককে দেখতে পেলাম তিনি উনুনে চপ ভাজছেন। দুটো আলুর চপের অর্ডার দিয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ভেজা রাতের অন্ধকারে সামনে যতদুর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত গঙ্গা নদীটাকে দেখছি। ওপারের নিয়ন বাতির আলো গুলো জলের উপর পরে জলের তরঙ্গের ধারাটাকে নির্দেশ করছে। ক্ষাণিক বাদে গুমটি দোকান থেকে বৃদ্ধ লোকটির ডাক শুনে তেলে ভাজার দোকানটার সামনে ফিরে গিয়ে গরম গরম তেলে ভাজা খেতে খেতে আবার ফিরে এলাম ঘাটের একটা টিনের সেডের তলায়,ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ধারা অব্যাহত। গাছের পাতায় হাওয়া আর বৃষ্টির ঝিরিঝিরি শব্দ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।



দূরে কয়েকটা ডিঙি নৌকো দেখা যাচ্ছে। তারা বোধহয় মাছ ধরতে ব্যাস্ত। এই সময় গঙ্গায় বেশির ভাগ জেলেরা ইলিশ মাছে ধরে তাই রাতের দিকেই জোয়ার এলে তাদের নৌকোর আনাগোনা গঙ্গা বক্ষের সর্বত্র নজরে পড়ে। টিমটিমে আলোতে ডিঙি নৌকা থেকে মাঝে মধ্যে তাদের ব্যাস্ততাকে নজরে পড়ে। ইলিশ মাছ জ্যান্ত দেখা আমার এককালে ভীষণ শখ ছিল কিন্তু সুজোগ পাইনি কখনো,বাজারে তো বরফ চাপা দেয়া ইলিশ অনেক দেখেছি কিন্তু নৌকোর মধ্যে জল থেকে তুলে আনা ছটফট করে লাফাতে থাকা ইলিশ মাছ দেখার মজাটাই শুনেছি আলাদা, সূর্যের আলো পেলে নাকি ইলিশ মাছ মরে যায়। মনের এই ইচ্ছেটাকে পূরণ করতেই হবে। কিন্তু কি ভাবে? সেই সময় আমার পিছন থেকে একজনের কণ্ঠস্বর কানে ভেসে এলো -



" আরে, রজত না? কি ব্যাপার? কত দিন পরে দেখা " অন্ধকার হলেও গলা চিনতে ভুল করিনি,পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখলাম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে অধীর কাকা,আমার বাবা এনার কাছ থেকেই বরাবর মাছ নিতেন, তবে উনি আমার বাড়িতে গিয়ে প্রায় দিন দিয়ে আসতেন,তাই মাছ কিনতে আমার বাবাকে বাজারে যেতে হতনা, আজ বাবা মারা গেছেন বছর খানেক হল। অধীর কাকার মাছ দিয়ে আসাটাও বন্ধ হয়ে গেল আর আমি চলে গেলাম বেঙ্গালুরুতে অফিসের কাজে। কাকাকে বললাম 


" আরে অধীর কাকা যে, কি খবর তোমার? কতদিন পরে তোমার সাথে দেখা,তারপর খবর কি? "



" এই চলছে ভায়া, তা এতো দিন পরে এলে এই দিকে? কোথাও গিয়ে ছিলে নাকি? "



" হ্যাঁ, বাঙালোরে গিয়ে ছিলাম বছর খানেক হল,অফিস থেকে পাঠিয়ে দিল "



" ও, তা সব ঠিক আছে তো এখন? "



" হ্যাঁ চলে যাচ্ছে,তা চললে কোথায়? "



" ঐ আরকি,কাজের সময় চলে এসেছে,এখন নৌকো জলে ভাসিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে এখন, দুদন্ড যে বিশ্রাম নেব তার আর সময় কই,হারুনের মুখে শুনলাম রাতের দিকের জোয়ারে ইলিশের জোয়ার লাগবে তাই যাই দেখি ভাগ্য কতটা সঙ্গ দেয়, চলি ভায়া,দেখা হবে, বাড়িতেই আছ তো নাকি আপাতত ? "



" হ্যাঁ, আছি আপাতত,মাস তিনেকের ছুটি, তারপর আবার চলে যাব "



" তাহলে কাল সকালে একটা বড় সাইজের ইলিশ তোমার বাড়িতে দিয়ে আসব,কত দিন যাওয়া হয়নি, দাদাও মারা গেলেন আর তুমি চলে গেলে,কাল যাব, আসি তাহলে "



" সারা রাত মাছ ধরবে এখন? "



"  হ্যাঁ আরকি,জাল ফেলব এখন,আর সেই সকালে তুলব,তাতে যা ওঠে উঠবে "



" আমার না খুব ইচ্ছে করে এই সারা রাত ধরে ইলিশ মাছ তোমরা কি ভাবে ধরো দেখবার জন্য, জ্যান্ত ইলিশ মাছ দেখবার ইচ্ছে আমার অনেক দিনের,কিন্তু তা আর হলনা "



" সে অনেক কষ্ট বাবা,তুমি কি পারবে?"



" খুব পারব, তা নিয়ে যাবে নাকি আমাকে তোমার সঙ্গে? "



" হুম,আমার আরকি,তবে আমার নৌকোতে কিন্তু শোয়ার জায়গা কম,ঘুমতে চাইলে তা কিন্তু হবে না বাপু একটুখানি কষ্ট করতে হবে "



" ঘুমতে কি আর যাচ্ছি? ঘুমিয়ে পড়লে মনের বাসনা পূর্ণ হবে কি? "



" তাহলে চলো,ঐ দিকটার ঘাটে আমার নৌকোটাকে বেঁধে রেখেছি,এসো "



মনের ইচ্ছেটা যে এতো তাড়াতাড়ি পূরণ হয়ে যাবে তা আমি কল্পনাও করতে পারনি। মনের সেই তখনকার অনূভুতিটা আমি লিখে বোঝাতে পারব না। অধীর কাকা একটা হ্যারিকেন হাতে গঙ্গার ঘাটে নেমে পাড়ের দিকে গিয়ে তার নৌকোতে উঠে পড়ল। আমিও নৌকোতে উঠে পড়তেই অধীর কাকা হ্যারিকেনটাকে নৌকোর ছাউনির ছাদের একটা দঁড়ির সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে বলল -



" এই ছাউনির ভিতরেই থেক বাবা, বাইরে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থেকনা,এসো, আমি নৌকো পূজো দিয়ে তারপর বেড়িয়ে পড়ব "



আমি ঘাড় নেড়ে" হ্যাঁ " জানাতেই উনি নৌকো থেকে নেমে একটা ধূপ কাঠি জ্বালিয়ে দেখলাম প্রণাম করে, নৌকোর দঁড়ি খুলে দিল। আমি ছাউনির ভিতরে গিয়ে বসে আছি। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে, সাথে বেশ ভালোই হাওয়া এসে লাগছে আমার গায়ে। অন্ধকারাচ্ছন্ন চতুর্দিক, একটা অজানা পাখি ডাকতে, ডাকতে নৌকোটার পাশ থেকে চলে গেল। দূরে এখনো সেই ডিঙি নৌকোর টিমটিমে আলো গুলোকে চোখে পড়ছে। নৌকোটায় একটা ধাক্কা লাগল, আমি কেঁপে উঠলাম,বুঝতে পারলাম অধীর কাকা নৌকোটাকে ঠেলে জলে ভাসিয়ে দিয়েছে।



তারপর তার ছায়া মুর্তিটাকে দেখতে পেলাম উঠে পড়ল চলন্ত নৌকোতে। দাঁড় ঠেলে জোয়ারের জলে দুলতে দুলতে ভেসে চলল অধীর কাকার নৌকোটা। অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসে অধীর কাকাকে দেখলাম জাল হাতে নিয়ে জলে ফেলতে,ফেলতে যাচ্ছে। আমি বললাম -



" কাকা,ঐ মাঝখানের চরের কাছে তো ফাঁকা দেখছি,ঐ দিকে কি মাছ নেই ?"



" আছে কিন্তু ওদিকটায় যাওয়া বারণ আছে, কেউ চরে দিকে যায়না "



" কেন? ওখানে যাওয়া বারণ কেন?"



" ঐ দিকের চরে ভূতের বাস তাই যাওয়া বারণ "



" ভূতের বাস? হাহাহা,কি যে বলনা কাকা, ভূত বলে কি কিছু আছে নাকি? তাছাড়া তুমি নিজে চোখে কি দেখেছ কখনো? "



" হাসছ,কে বলেছে ভূত বলে কিছু নেই,আমি দেখেছি অনেক দিন দেখেছি,তাছাড়া ঐ চরের দিকেই বছর পাঁচেক আগে আমার তিনজন  


জেলে বন্ধু তাদের ডিঙি নিয়ে মাছের খোঁজে গিয়ে ছিল,কিন্তু তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি,শুনেছিলাম তাদের মৃতদেহ গুলো নাকি ঐ চরায় পাওয়া গিয়ে ছিল,তাদের মাথা গুলো ছিল চরার বালি মাটির নিচে আর তাদের পা গুলো ছিল উপরের দিকে,পুলিশ নৌকো নিয়ে গিয়ে ছিল তাদের মৃতদেহ গুলোকে উদ্ধার করতে,আর ওদের নৌকোটা ছিল চরের একেবারে ঐ ভিতরের ঘাসের জঙ্গলের মধ্যে, এইবার তুমি বলো চর থেকে নৌকোটাকে তুলে নিয়ে ঐ এতোটা উপরে এতো বড় বড় ঘাসের জঙ্গলের মধ্যে টেনে নিয়ে গেল কে? "



" তুমি ভুল শুনেছ,খোঁজ নিয়ে দেখ এখানে অন্য কোনো ব্যাপার ঘটেছে, ভূতে করেছে হাহাহা,সত্যি তুমিও পার কাকা,আচ্ছা তাহলে তুমি আমাকে ভূত দেখাতে পারবে? "



" কপাল ভালো থাকলে আজকেও দেখতে পার,তবে রাতের দিকে মাঝে মধ্যে নৌকোয় সএ এসে চেপে বসে পড়ে আর,একটা দুটো মাছ খেয়ে চলে যায়"



" সে? সে আবার কে ? "



" পিশাচিনী,পিশাচিনীর নাম শুনেছ?"



" পিশাচিনী হাহা হোহো,আবার মাছ খায় হাহাহা"



" হেসো না হেসোনা,দেখবে,দেখবে আজ না হয় অন্য একদিন ঠিক তোমাকে দেখাব "



এইবলে অধীর কাকা ছাউনির ভিতরে ঢুকে এসে,ভেজা গা হাত, পা মুছে বসে বলল,এই ঘাটেই আজ রাতে থাকব বুঝলে,ভোরবেলায় জাল তুলতে তুলতে শিব মন্দির ঘাটে গিয়ে জাল তুলব,এসো খেয়ে নাও তারপর কথা হবে "



খেয়াল করিনি যে অধীর কাকা কখন আবার ঘাটে এসে তার নৌকোটাকে ভিড়িয়ে দিয়ে ছিল। নৌকোটা জলের তরঙ্গে তখন দুলছে। ছাউনির ভিতরে ঢুকে এসে একটা টিফিনকারি থেকে চারটে রুটি আর তরকারি বার করে এনে আমাকে দিয়ে বলল -" এই আছে, খেয়ে নাও "



" কিন্তু  তোমার? তোমারটা কোথায়?"



" আমি পরে খেয়ে নেব,আসার সময় বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে এসেছিলাম তাই এখন আর ক্ষিদেটা নেই,তুমি খাও আমি ঘাটে নেমে নৌকোটাকে ভালো করে বেঁধে দিয়ে তার সাথে জালটাকে একবার দেখে আসি, তুমি ভিতরেই থেক, বাইরে বেড়িয়েনা যেন "



এইবলে ধীরেন কাকা চলে গেলেন, ঝপ করে একটা শব্দ হল আর নৌকোটাও খানিকটাও দুলে উঠল,বুঝতে পারলাম কাকা জলে নেমে ঘাটের দিকে অন্ধকারে মধ্যে থেকে কোথাও চলে গেলেন। আমি খেতে থাকলাম। পাড়ের কোনো এক জঙ্গলের ভিতর থেকে কয়েকটা শেয়াল ডেকে উঠল। শরীরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল,মনের মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। বৃষ্টিটা খানিকটা কমে এসেছে কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেল ধীরেন কাকার দেখা নেই। খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে ছাউনি থেকে মাথা বার করে অন্ধকারের মধ্যে পাড়ের দিকে চেয়ে দেখলাম,নাঃ,আসে পাশে কেউ কোত্থাও নেই। ছাউনি থেকে বেড়িয়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে ভালো করে চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম,গঙ্গায় এতোক্ষণ ভাসমান ছোট, ছোট ডিঙি নৌকো গুলোকেও আর কোথাও দেখতে পেলাম না। বোধহয় ওপারের কোথাও তারা তাদের ডিঙি নৌকো গুলোকে বেঁধে রেখে ভোরের অপেক্ষা করছে। অধীর কাকাই বা কোথায় গেল, এদিক,ওদিক দেখে ভাবছি, কি জানি ঘাটের আসে পাসেই আছে বোধহয়, ভোরের দিকেই হয়ত ফিরে আসবে আর না হয় এতোক্ষণ ধরে জলের মধ্যে যে জাল ফেলে এসেছে সেটাই বোধহয় দেখতে গেছে, এইসব ভাবছি যখন তখন আবার মুশোল ধারে বৃষ্টি নেমে গেল, আমি ছাউনির ভিতরে ঢুকে পড়লাম। বৃষ্টির ছাট গায়ে এসে লাগছিল তাই ছাউনির সামনেটায় বৃষ্টির ছাট থেকে বাঁচার জন্য একটা প্লাস্টিকের পর্দা টানানোর ব্যাবস্থা ছিল,সেটা দিয়ে ছাউনির  সামনের অংশটাকে ঢেকে দিয়ে হ্যারিকেনের আলোটাকে সামন্য একটুখানি কমিয়ে দিয়ে বসে আছি পিছনের ব্যাড়ার বাঁশের খুঁটিতে হ্যালান দিয়ে। এখন বেশ ঘুম ঘুম পাচ্ছে,ছাউনির চালে ঝুপঝুপ করে জলের ফোঁটা পড়ছে, হাওয়াতে নৌকোটা সামান্য দুলছে আর কুলকুল শব্দ করে নদীর জলের শ্রোতের শব্দ ভেসে আসছে। হাওয়ায় সামনে টানানো প্লাস্টিকের পর্দাটা ফটফট শব্দ তুলে মাঝে মধ্যে নড়ে চড়ে উঠছে। চোখে ঘুম চলে এলো,আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। বেশ ক্ষাণিকক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম কিন্তু একটা ঝাকুনিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। চোমকে উঠে চোখ খুলে বসে পড়ে দেখলাম নৌকোটা বেশ ভালোই দুলে উঠেছে,গঙ্গায় বান এলো নাকি? তাছাড়া তো আর কিছুই মনে আসছেনা, তখনও বৃষ্টি চলছে, ছাউনির উপরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ পাচ্ছি। হঠাৎই কেন জানিনা আমার  মনে হল নৌকোটায় আমি ছাড়া আর একজন কেউ বাইরে নৌকোটার ঠিক সামনের দিকে বসে আছে, তাহলে কি অধীর কাকা ফিরে এসেছে? কিন্তু তিনি এই বৃষ্টিটার মধ্যে এইভাবে বাইরে বসে ভিজছে কেন? ভোর হয়ে এলো নাকি? অধীর কাকা কি জাল গুটোচ্ছে আর তার জন্যই কি নৌকোটা এইরকম করে দুলে উঠেছিল। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত আড়াইটে বাজে,তাহলে তো ভোর হতে এখনও প্রায় দেড় ঘন্টা বাকি, তাহলে?



আমি প্লাস্টিকের পর্দাটাকে সামান্য ফাঁকা করে বাইরে তাকিয়ে একেবারে চমকে গেলাম। বুক কেঁপে উঠল,দেখলাম অন্ধকারের মধ্যে নৌকোটার ঠিক শেষ মাথায় পা ঝুলিয়ে পিছন ঘুরে বসে আছে সাদা শাড়ি পড়া একটা মেয়ে, তার মাথার সমস্ত চুল গুলো যেন হাওয়ায় উড়ছে। সেই দৃশ্য দেখে শিঁউড়ে উঠলাম, আমার বুকের হৃদ স্পন্দন যেন বেড়ে দ্বিগুন হয়ে গেল। 



কে এটা? মনে পড়ে গেল অধীর কাকার বলা কথাটা পিশাচিনী,এইকি সেই পিশাচিনী নাকি



যদি তাই হয়,তাহলে এখন কি হবে? যদি সে আমাকে কোনো রকম দেখে ফেলে তাহলে তো গঙ্গার মাঝের চরটায় নিয়ে গিয়ে আমাকে বালি কাঁদায় ডুবিয়ে মারবে আর অধীর কাকার নৌকোটাকে নিয়ে গিয়ে ফেলবে একেবারে চরের মাঝখানের ঘাসের জঙ্গলের মধ্যে। ভয়ে  চুপ করে বসে রইলাম,একটা টুশব্দ করলেই আর আমার রক্ষা নেই। এখন অধীর কাকা সঙ্গে থাকলে তাও ক্ষাণিকটা সাহস পেতাম কিন্তু সেতো,কোথায় আছেন তিনি জানিনা। আমি চুপ করে বসে রইলাম। মুহূর্তের মধ্যে দেখলাম সে তার মাথাটাকে খুব ধীরে,ধীরে ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে যেন দেখছে,কিন্তু তার মুখটাকে অন্ধকারে ঠিক দেখতে পারছিনা। আমি ভয়ে একেবার সিটিয়ে গেলাম,প্লাস্টিকটাকে নিঃশব্দে ধীরে ধীরে আটকে দিতে যাব,দেখলাম নৌকোটা আরও একবার বেশ জোরে দুলে উঠল আর আমি টাল ঠিক রাখতে না পেরে ছাউনির বাইরের দিকে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেলাম আর সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখের কাছে চলে এলো সেই পিশাচিনীটা,আর তার ভয়ঙ্কর সেই চেহারা দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম সেখানেই। একটা তীব্র আলো চোখে পড়তেই আমার জ্ঞান ফিরে এলো,চোখ খুলেতেই দেখলাম সকালের রোদ এসে মুখে পড়ছে,আমি নৌকোটার মধ্যেই গতকাল রাতে শুয়ে আছি আর নৌকোটা। উঠে বসলাম, দেখলাম নৌকটা মাঝ গঙ্গার চরের ভিতরের ঘাসের জঙ্গলের ভিতরে আছে বলে মনে হল। বুঝতে পারলাম আমার বাড়ি ফেরার পথ সেই ওপারের দিকে। শিব মন্দির ঘাটের পাশে কালি মায়ের মন্দিরটাকে দেখতে পেলাম, কিন্তু চোখ যাকে খুঁজছিল সে এখনো ফেরেনি, কেন? অধীর কাকা কোথায় গেল জানিনা, আর সে বলে ছিল এই চরে কেউ মাছ ধরতে আসেনা ভয়ে তাহলে সে গতকাল রাতে এই ঘাটে?কথা ভাবতেই ভয়ে আমার শরীরটা কেঁপে উঠল, ঘাট কোথায় এটাতো সেই চরের ঘাসের জঙ্গলের মাঝখানটা,কিন্তু অধীর কাকা যে বলল সে অন্য একটা নৌকোটাকে ভিরিয়ে ছিল,তাহলে সেই ঘাট কোথায় আর এখানেই বা নৌকো এলো কি করে জানিনা। একটা ডিঙি নৌকোকে দেখলাম এই চরের দিকেই আসছে,আমি উঠে গিয়ে ঘাসের জঙ্গল পেরিয়ে চরের কাছে নেমে নৌকোর মাঝিকে হাত নেড়ে ডাকলাম। মাঝি আমায় দেখতে পেয়ে তার নৌকো নিয়ে এগিয়ে এসে আমাকে সেখানে দেখেতে পেয়ে যেন হা হয়ে গেল,চরের কাছে তার নৌকোটাকে ভিরিয়ে দিয়ে,বলল -" আইপনি?এই চরের মইধ্যে কি করতাসেন? এইখানে আইলেনই বা কি কইরা? সিগগিরি আমার ডিঙাটায় উইঠা আসেন " 



নৌকোটা কাছে আসতেই আমি উঠে পড়লাম, মাঝি ভাই দাঁড় ঠেলে চরের কাছ থেকে খানিকটা দূরে চলে আসতেই আমি পিছনে ঘুরেই চরার ঘাসের জঙ্গলের দিকে চেয়ে আৎকে উঠলাম "একি? এতো একটা ভাঙা নৌকো,এই নৌকোতে করেই কি আমি গতকাল রাতে অধীর কাকার সাথে মাছ ধরতে গিয়ে ছিলাম? নৌকওটার নিচের দিকে তো বিশাল বিশাল ফুঁটো আর নৌকোর সমস্ত কিছু ভাঙা,আর ছাউনিটা? ছাউনি কোথায়?সেখানে তো ছাউনি বলে কিচ্ছু নেই,তাহলে? তাহলে কি সেই পিশাচিনী গতকাল রাতে অধীর কাকার নৌকোটা থেকে তুলে এনে চরের এই ভাঙা নৌকোটায় এনে ফেলে দিয়ে গেছে আমাকে?কিন্তু তা কি করে সম্ভব,পিশাচিনী তো চরের বালি কাঁদার মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে মানুষকে মেরে ফেলে,তাহলে আমি বেঁচে গেলাম কি করে? তাহলে কি অধীর কাকা? "



একটা গলার শব্দ পেয়ে চমকে উঠলাম 



" এই নেন জল,এই নেন জল খান "



দেখলাম একটা জলের বোতল এনে আমার সামনে এসে মাঝি ভাই কথাটা বলল, আমি তার হাত থেকে জলের বোতলটাকে নিয়ে,আমার চোখে মুখে ভালো করে জল দিয়ে কয়েক ঢোক জল খেয়ে বোতলটাকে তার কাছে ফেরত দিয়ে, পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছে নিচ্ছি,সেই সময় আবার মাঝি ভাই বললেন -



" আইপনি ঐ চরে কি করতা ছিলেন,গেলেনই বা কেমনে, জানেন না ঐ চরে যাওয়া বারণ "



আমি একটুখানি ধাতস্থ হয়ে গতকাল রাতের সমস্ত ঘটনাটা মাঝি ভাইকে খুলে বললাম, আমার কথা শুনে মাঝি ভাই বললেন -



" আইপনার ভাইগ্য ভালো ছেল যে আইপনি বাঁইচা গেসেন,এইবার যা কই শুনেন,আইপনি যে অধীরের কথা কইলেন ওতো বছর খানেক আগেই মইরা গেসে "



আমি চমকে উঠলাম " কি? কি?বললেন? অধীর কাকা মারা গেছেন? কিন্তু গতকাল রাতে তো তার সাথেই আমি? কিন্তু এটা কি করে সম্ভব? "



" আইপনারে যে অধীরের গল্পটা কইলেন তাতে বুইঝতে পারলাম যে সে ভূত হইয়া আইসা আপনারে চরে লইয়া গেসিল,আমি তারে চিনি, আমরা একই পাড়ায় থাকি, ঐ চরেই তো ওর মরাটারে পাওয়া গেসিল,ওর মাথাডারে এক্কেরে চরের কাঁদার মধ্যি ঢুকায় দিসিল,আমিই তো প্রথম দেইখতে পাইয়া হগলেরে জানাই ছিলাম, তারপর পুলিশ আইসে অধীর মন্ডল,হারণ সরকার আর নিকুঞ্জ সাধুখাঁ এই তিন জনের মরা গুলারে চরের কাঁদা তিকা তুইলা নৌকায় তুইলা থানায় নিয়া যায়,তা আইপনি থাকেন কুথায় যে এইসব খবর জানেন না দেখতাসি, এই তল্লাটে কি নতুন আইসেন নাকি ? "



মাঝি ভাইয়ের কথা গুলো শুনে আমি হা হয়ে গেলাম, কি বলব জানিনা , ক্ষাণিক চুপ করে থাকার পরে শুধু বললাম -" আমার বাড়ি ঐ শিব মন্দির ঘাট থেকে মিনিট কুড়ি লাগে যেতে,আমি বাজারের পাশের পাড়াটায় থাকি, এক বছর বাইরে ছিলাম,দুই দিন আগেই বাড়িতে ফিরেছি, তাই এইসব ঘটনা আমি জানতাম না, কিন্তু অধীর কাকা আর বাকি তিন জনকে কি সেই পিশাচিনীটাই মেরে ফেলেছিল নাকি ? "



" শুনিচি তো ওরা তিন জনা একটা নৌকা নিয়া নাকি রাইতের বেলায় মাছ ধরতি গিয়ে ছিল চরের দিকে,তারপর কি হইছিল জানিনা, লোকেতো কয় ওগো ভূতে মারসে,এই তুমার মুখে শুইনা জানতি পারলাম যে তাদের কোন পিশাচিনী না কিসে মাইরে ফেলসে,তবে চরের দিকে তারপর থিকা আমরা কেউ আর যাইনা, যাইনা মানে সাহস পাইনা,অনেকে নাকি মইরা যাওনের পরেও নাকি অধীর আর বাকি দুই জনরে রাইতের বেলায় ঐ নৌকায় বইসা থাকতি দেখছিল,তাই আর ও মুখো যাইতে আর আমার সাহস হয়নাই "



মাঝি ভাইয়ের কথা শুনে এইবার বুঝতে পারলাম  পুরো ব্যাপারটা,তাই আর কিছু বললামনা। আমাকে শিব মন্দির ঘাটের কাছে নামিয়ে দিয়ে মাঝি ভাই তার নৌকো নিয়ে চলে গেলেন। আমি বাড়িতে ফিরে এলাম কিন্তু আজ পর্যন্ত এই ঘটনার কথা কাউকে বলিনি, আজ তোমাদের বললাম, জানিনা তোমরা এই ঘটনাটা বিশ্বাস করবে কিনা কিন্তু আমি সেই দিন রাতে নৌকোর মধ্যে সত্যিই একটা পিশাচিনীকে দেখেছিলাম,আর তার রুপ আজও আমার স্বপ্নে এসে আমাকে চমকে দিয়ে যায়,আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘটনাটার দিন দুইয়েক পরে আমাদের পাসের মাছ বাজারে গিয়ে পরিচিত একজন মাছ বিক্রেতাকে অধীর কাকার কথাটা জিজ্ঞেস করতেই তিনি মাঝি ভাইয়ের কাছে শোনা সেই সমস্ত কথা গুলো আমাকে বলেছিলেন আর তার পর থেকে ঐ শিব মন্দির ঘাট চত্তরে আমি আর আজ পর্যন্ত যাইনি। তোমাদের বিশ্বাস না হয় চলে এসো একদিন এইরকমই শ্রাবণ মাসের বৃষ্টির দিনে। আশাকরি আজও অধীর কাকা তার নৌকো নিয়ে অপেক্ষা করে আছে তোমাকে জ্যান্ত ইলিশ মাছ দেখাবে বলে। 



একবার যাবে নাকি? 


57 views0 comments