Search

বিশেষ সংখ্যা ।। ভয় ভৌতিকে ।।রবীন জাকারিয়া


বট গাছের ভূত


রবীন জাকারিয়া



আমার বাড়ির চারদিকে মোট ছয়টি স্কুল৷ গাদাগাদি৷ ৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়৷ ২টি উচ্চ বিদ্যালয়৷ উচ্চ বিদ্যালয় দু'টির ১টি বয়েজ অন্যটি গার্লস৷ আমার বোধগম্য হয়না যে সরকারের নির্দিষ্ট ক্যাচমেন্ট এলাকার নিয়ম থাকার পরেও এমন গাদাগাদি ছয়টি স্কুল কীভাবে অনুমোদন পেয়েছিল৷ এদেশে সবই সম্ভব৷ 



আমাদের শিক্ষা জীবন শুরু হয় বাড়ির আঙ্গিনায় অবস্থিত মুনসীপাড়া কেরামতিয়া প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে৷ উপমহাদেশের নামকরা ধর্মপ্রচারক, রাজনীতিক ও পীর সাহেব মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরী ভারত থেকে এদেশে এসেছিলেন ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে৷ তিনি মুনসীপাড়ায় বিয়ে করেন এবং শশুর বাড়িতেই আমৃত্যু অবস্থান করেন৷ মুনসীপাড়া কেরামতিয়া জামে মসজিদ -যেখানে পীর সাহেবের সস্ত্রীক মাজার আছে-সেই কর্তৃপক্ষের অবদানে ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথমে এটি শুরু হয় মাদরাসা শিক্ষা কেন্দ্র দিয়ে৷ পরবর্তিতে এটি প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হয়৷ তাই তাঁর নামানুসারে স্কুলটির নামকরন করা হয় কেরামতিয়া ৷ আর মসজিদ থেকে স্কুল পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ হয় মাদরাসা রোড৷ শুধু তাই নয় এ স্কুলের শিক্ষার্থিদের জন্য যে আবাসন ছিল৷ পরবর্তিতে সেখানেই নারী শিক্ষা উন্নয়নের জন্য নির্মাণ করা হয় মুনসীপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়৷ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ স্কুল দু'টি পরিদর্শন করতে এসেছিলেন৷ কেরামতিয়া স্কুল সেসময় রংপুরের অন্যতম ভাল স্কুলের একটি ছিল৷ উপড়ে টিনের দোচালা পাকা লম্বা কাঠামো৷ প্রতি ক্ল্যাশের জন্য আলাদা আলাদা বড় বড় কক্ষ৷ একাডেমিক ভবন, ল্যাবরেটরী আর প্রধান শিক্ষকের বিল্ডিংটা ছিল ছাদ পেটানো৷ সামনে বিশাল মাঠ৷ চারিদিকে প্রাচীন ফলের গাছ৷ আম৷ জাম৷ লিচু৷ কাঁঠাল৷ কত কি৷ মাঠের দু'দিকে দুটি অতি পুরাতন গাছ ছিল৷ একটি পাইকর গাছ কিন্ত সকলে বট গাছ বলতো৷ অন্যটি ছিল লম্বা কদম গাছ৷ কদম গাছ এত বড় আর ডালপালা ছড়ায় তা কখনো দেখানি৷ এ গাছ দুটিকে সকলে ভূতুরে বলতো৷ এখানে নাকি ভূত আছে৷ গাছের কোঠরে বিষধর সাপের আবাসস্থল৷ 



কদম গাছটির ঠিক নীচে প্রখ্যাত লেখক, গবেষক ও সমাজ সংস্কারক মৌলভী খেরাজ আলী অত্র এলাকার মানুষের জ্ঞান ও শিক্ষা উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন "খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী"৷ সে সময় এই লাইব্রেরী সমাজ উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে৷ বিখ্যাত সব লোকেদের আনাগোনা আর মিলন কেন্দ্রে পরিনত হয়৷ এখানে বই পড়তে আসতেন রংপুর মুনসীপাড়ার পুত্রবধু, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির (ঘাদানিক) নেতা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম৷



স্কুলের কোন প্রাচীর নেই৷ পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে পাকা রাস্তা৷ পুরো স্কুরের চারিদিকে প্রসস্থ ড্রেন যেন প্রাচীরের গুরুত্ব কমিয়েছে৷


কেরামতিয়া স্কুলের মাঠ রংপুরের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক ও খেলাধুলার কেন্দ্রবিন্দু সর্বদা৷ সব সময় মাঠে মানুষের আনাগোনা৷ কেউ খেলছে৷ কেউ নিজের গামছা পেতে রেডিওতে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছে৷ কিংবা কোন পথিক গাছের নীচে একটু জিড়িয়ে নিচ্ছে৷ নব উদ্যম তৈরির আশায়৷ প্রচন্ড গরমকালে রাতের বেলাতেও নারী-পুরুষ, আবালবৃদ্ধবণিতা মাঠে হাঁটাহাঁটি করে৷



আমরা সব বন্ধু রাতের খাওয়া শেষে মাঠের এককোণে আড্ডা দেই৷ ধুমপান করি৷ কলেজে কোন মেয়ের সাথে ইটিশপিটিশ চলছে৷ কিংবা কাকে ভাল লাগে এইসব৷ চলে রাত ১২-১টা পর্যন্ত৷ স্কুলের নাইট গার্ডের নাম আবুল৷ সে সকলের কাছে পরিচিত আবুল ভাই নামে৷ ভীতু প্রকৃতির মানুষ৷ সহজ-সরল৷ আমরা আড্ডা মারলে সে খুশি হয়৷ গল্প করে৷ তার বেশির ভাগ গল্প চাপা৷ ভূত-প্রেতের৷ সে বলতে থাকে এই বট গাছে প্রেতাত্মা থাকে৷ তাকে বহুদিন দেখা দিয়েছে৷ কথা বলেছে৷ সে যেন কখনো তার কথার অবাধ্য না হয়৷  কথামতো চললে তাকে সোনার ড্যাগ (হাড়ি) দেবে৷ গাছের গোড়ায় সাবল দিয়ে দুই চাপ মাটি তুললেই সে সোনা পাবে৷ আর বেয়াদবি করলে ঘাড় মটকাবে৷ আমি বললাম সোনাগুলো নিচ্ছনা কেন? সে বললো না! লোভ করা যাবেনা৷ ও একদিন নিজে থেকেই দেবে৷ সেই আশাতে আছি৷ গাঁজাখুড়ি কাহিনী৷ কিন্ত মুখে বলিনা৷ কী দরকার? বরং খুশি রাখলে ওকে দিয়ে সিগারেট আনার কাজটা করানো যায়৷ সেটাই ভাল৷ Win-win conditoin.



পাড়ায় আমাদের Immidiat senior ব্যাচটা খুব ভয়ংকর৷ গুন্ডামী, টেন্ডারবাজি, নেশা করা, মাস্তানীসহ এমন কোন অপকর্ম নেই যে করেনা৷ এদের জন্য প্রায় সময় পাড়ায়-পাড়ায় মারামারি লেগে থাকতো৷ বাড়িতে বাড়িতে পুলিশ রেইড করতো৷ অগত্তা আমাদেরকেও শহর ছেড়ে পালাতে হতো৷ বিশ্রী৷ কিন্ত কিছু বলা যাবে না৷ ওদের ব্যাচের একটা ভাই ছিল৷ নাম শরিফুল৷ কোরআনে হাফেজ৷ পাড়ার ছোট একটা মসজিদে ইমামতি করায়৷ সময় পেলে শরিফুল ভাই স্বাভাবিকভাবেই ন্যাংটাকালের বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবে এটাই নিয়ম৷ কিন্ত ওর বন্ধুরা এতই খারাপ যে কোল্ড ড্রিংকসের নাম করে সুকৌশলে তাকে মদ খাওয়ায় দিত৷ তারপর ওকে একা ছেড়ে দিত৷ মদ খেলে মানুষ গালিগালাজ করে৷ বেশি কথা বলে৷ কিংবা বাড়িতে চলে যায়৷ কিন্ত শরিফুল ভাই মদ খেলে স্কুলে ছাদে কিংবা গাছের ডালে অথবা সারারাত ধরে ড্রেনে পানি ছেঁকতো৷ 



প্রতিদিনের মতো সেদিনও আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম মাঠে৷ আবুল বানানো গল্প বলে যাচ্ছে৷ শুনছি৷ একটা সময় সবাই বাড়ি চলে গেল৷ শুধু আমি, আমার বন্ধু রবু আর আবুল ভাই রয়ে গেলাম৷ বিদ্যূত চলে গেছে৷ প্রচন্ড গরমে ঘুম ধরবেনা বলে থেকে গেলাম৷ বিদ্যূত নেই৷ দোকান পাঠ বন্ধ৷ অমাবশ্যা কিংবা পূর্ণিমার হিসেব করা হয়নি কখনো৷ কিন্ত আজ খুব অন্ধকার৷ কিছুই দেখা যাচ্ছেনা৷ কোথাও কেউ নেই নেই৷ কখনো ভূত-প্রেত বিশ্বাস করিনি৷ তাই আবুল ভাইয়ের গল্পকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছি৷ কিন্ত এখন ভয় করছে৷ কথায় আছেনা যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়৷ আসলে হবে যেখানে অন্ধকার হয় সেখানে ভূতের ভয়৷ আমি নিশ্চিত মুখে যতই বলিনা কেন৷ কেউ কোন বাঁশবাগানে, অশত্থ গাছ, পুরোনো বট গাছের নীচে নিকষ অন্ধকারে ভূতের ভয় পাবেনা এমন লোক নেই৷ 


আবুল ভাইকে গল্প থামাতে বললাম রাগী গলায়৷ দূরে বটগাছটার নীচে যে ড্রেন আছে৷ সেখানে হালকা আলো প্রতিফলন হচ্ছে৷ সবকিছু আবছা আবছা৷ আমরা তিনজন চুপ! তাকিয়ে আছি বট গাছের দিকে৷ দেখলাম ড্রেনের পানি থেকে কী যেন একটা উঠে এলো৷ বটগাছটার নীচে দাঁড়াল৷ প্রায় অদৃশ্য মূর্তিটার কোন কিছুই দেখা যাচ্ছেনা শুধু উপরের দিকে সাদাটে আভা৷ সেখান থেকে মাঝে মাঝে তারার মতো আলো চমকাচ্ছে৷ মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে৷ হার্ট বিট বেড়ে গেছে৷ কান্না পাচ্ছে৷ কাঁদতে পারছিনা৷ অশরীরিটা হঠাৎ জড়ানো কন্ঠে হাঁক দিল "আবুল তোরা এদিকে আয়"৷ ভয়ে নিজেদের মুখ চাওয়া-চাউয়ি করলাম৷ আর রক্ষে নেই৷ আবার আদেশ করা হলো "কীরে এখনো আসলিনা যে?" আবুল ভাই ধপাস করে পড়ে গেল৷ কাঁপতে লাগলো৷ মুখে ফ্যানা৷ ওরতো মৃগীরোগ আছে বলে জানতাম না৷ ও মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে৷ লুঙ্গি স্থানচ্যূত৷ ছিঃ নোংরা৷ শরীরটাও ভাল ভাবে পরিষ্কার করেনা৷ মায়া লাগছে৷ ভয় লাগছে৷ হঠাৎ মনে হলো এ অবস্থায় মৃগীরোগিকে চামড়া পোড়া বা চামড়ার স্যান্ডেল নাকে শুঁকাতে হয়৷ সবার পায়ে স্পঞ্জ৷ চামড়া নেই৷ স্পঞ্জের স্যান্ডেলই নাকে ধরলাম৷ কিছুক্ষণ পর ও ঠিক হলো৷ বললো তোরা যা৷ দেখা কর৷ বেয়াদবি করিস না৷ ঘাড় মটকাবে৷ আর শোন সাথে লোহা কিংবা দেশলাই রাখ৷ ক্ষতি করতে পারবে না৷ বললাম আমাদের ও দুটোর কোনটাই নেই৷ তাহলে কী হবে? সে তার গোছা থেকে দুটি চাবি খুলে দুজনের হাতে দিয়ে বললো আল্লাহ্ ভরসা৷



শক্তহাতে চাবি হাতে আধমরা ভয়ে দুজন হাঁটতে থাকলাম অশরীরির দিকে৷ চাবি নিয়ে কেন জানি একটু সাহস পেলাম৷ কিন্ত রবু ভয়ে কাঁপতে থাকায় চাবিটা হারিয়ে ফেললো৷ কাছাকাছি প্রায় এসেছি৷ এমন সময় বন্ধু রবু চিৎপটাং হয়ে পড়ে গেল৷ কাটা কলাগাছের মতো৷ যেন ধুপ করে পড়ে চুপ৷ লুঙ্গিতে পেচ্ছাব করে দিয়েছে৷ আকারে ছোট্ট বন্ধুটি দিগম্বর হয়ে যেভাবে পড়ে আছে৷ যেন ছোট খোকা এইমাত্র বিছানায় হিসু করে ঘুমিয়ে পড়েছে৷ ওর বুকটা নাড়লাম৷ কোন শব্দ নেই৷ ভয়েই শেষে মরে গেল কী-না? আচ্ছা রবুর ঘাড়টা মটকালো না-তো? বুক ঢিপ ঢিপ করছে৷ আয়াতুল কুরশী পড়তে থাকলাম৷ বুকে ফুঁ দিলাম৷  যতটা দূরত্ব রেখে অশরীরির কাছাকাছি যাওয়া যায়৷ অশরীরি বললো "এতো রাতে তোরা এখানে কেন?" কী উত্তর দেব ভাবতেই মাথায় বিদ্যূত খেলে গেল৷ আরেকটু কাছে গেলাম৷ আবছা আলোয় দেখতে পেলাম সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি খুলে মাথায় বেঁধে উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন৷ তার মাথায় বাঁধা পাঞ্জাবির বোতামে হালকা আলোর রিফ্লেকশন তারার মত জ্বলছে৷ সাহস করে আরো একটু কাছে গিয়ে দেখলাম অশরীরি আর কেউ নয় আমাদের মাতাল শরিফুল ভাই৷

73 views0 comments