Search

মহানবমী ।। বিশেষ সংখ্যা ।। ধারাবাহিক - ময়ূখ হালদার


পরিপ্রেক্ষিত  [পর্ব-পাঁচ (খ)]


ম য়ূ খ হা ল দা র


-কফি বানিয়ে দিই?

রোশনি বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। আমি ঘাড় নাড়লাম। ও নিজের ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা জামা কাপড়গুলো এক এক ক'রে কুড়িয়ে নিলো। আমি জাঙ্গিয়া জিন্স টি-শার্ট জ্যাকেট প'রে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালাম। তারপর চুল আঁচড়াতে গিয়ে শিউরে উঠলাম! কী বীভৎস! আমি স্পষ্ট দেখলাম-শরীর আছে অথচ মুখ নেই! আমার ঠোঁট অতর্কিতে আর্তনাদ ক'রে উঠতে চাইছিল কিন্তু মোক্ষম সময়ে হাত তাকে চেপে ধরলো। আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম-এই যে এতক্ষণ আমি ল্যাংটো হয়ে পড়েছিলাম আমার কোনও ভয় ছিলনা। যে মুহূর্তে আমি পোশাক পরলাম ঠিক তখন থেকেই আমার নগ্নতা প্রকাশ পাওয়ার ভয় কাজ করতে শুরু করেছে। আর এই বিপদ থেকে আমাকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করছে মন। সে যে মনে মনে কত মুখোশে এঁকে রেখেছে তা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে! আমি মানানসই একটা মুখোশ প'রে চুল আঁচড়াতে শুরু করলাম।




রোশনিকে বিদায় জানিয়ে যখন ভুটিয়া বস্তি লেনে উঠলাম ঘড়িতে তখন এগারোটা ষোলো। আমি বেশ দ্রুততার সাথে হাঁটা শুরু করলাম যদিও আমার কোনও তাড়া ছিলনা এবং নির্দিষ্ট ঠিকানাও ছিলনা তবুও এই জোরে জোরে পা ফেলার পেছনে একটা কারণ অবশ্যই ছিল। আসলে আমি চাইছিলাম রোশনির কাছ থেকে পালাতে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে সরে যেতে। অনেক, অনেক দূরে। দু'পাশে ব্যস্ত জীবন কোলাহল পেরিয়ে এগিয়ে চলেছি। রাস্তায় দু'টো ঝাঁকড়া লোমওলা কুকুর যাদের একটার গায়ের রং কালো অন্যটার সাদা, আমার পিছু নিল। আমি ওদের আচরণে ভয়ের কিছু পেলাম না এবং যথারীতি নিজের মতো হাঁটতে থাকলাম। কুকুর আমার খুবই প্রিয়। ওদের সঙ্গে সময় কাটাতে কিংবা খেলতে দারুণ লাগে। বিশেষ ক'রে যখন আমি শিস দিই তখন ওরা কান খাড়া ক'রে ঘাড় বেঁকিয়ে যেভাবে তাকায় লেজ নাড়ে তাতে যে মিষ্টি মুহূর্ত তৈরি হয় তা আমাকে ভালো থাকতে সাহায্য করে। আবার এমনও দেখেছি ওদের মধ্যে কেউ কেউ শিস দেওয়াটা মোটেও পছন্দ করেনা। এতে ওরা রেগে যায় এমনকি তেড়ে কামড়াতেও আসে। আমি বেশ টের পাচ্ছি যতই রোশনির থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করছি ততই ওর সঙ্গে কাটানো স্বর্গীয় মুহূর্তগুলো আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে চাইছে। যা কিছু সুন্দর তা তুলেপেড়েই ব্যবহার করতে হয়। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে তার সৌন্দর্য ফিকে হয়ে যায়। চাইলেই আমি আরও কিছুদিন রোশনিদের বাড়িতে থাকতে পারতাম। তাতে সাপও মরতো আবার লাঠিও ভাঙতো না। কিন্তু চরম উত্তেজনার সময়েই আমি মনে মনে ঠিক ক'রে ফেলেছিলাম-আর নয়, এটাই শুরু এবং এইই শেষ। এখন আমি খুশি। কারণ আমি কথা রাখতে পেরেছি। যৌনতার ব্যাপারে আমার কোনো ছুঁৎমার্গ নেই। সেক্স একটা সাধারণ বিষয় আর পাঁচটা কাজের মতো। এক কথায় যাকে বলে বেসিক নিড। সেখানে বৈধ-অবৈধ সেকেন্ডারি। মৌলিক চাহিদাই সব। আর সেটা যখন পূরণ হবেনা তখন সমস্ত তত্ত্বই বালির পাহাড়ের মতো ধ্বসে যাবে। এটাই নিয়ম। অংকের ফর্মুলা। এখানে যতই গোঁজামিল দিয়ে উত্তর মেলাও না কেন শেষ পর্যন্ত গরমিলটাই সত্য। আমি মনে করি আমি কোনও অন্যায় করিনি। রোশনির অসহায়তা, যন্ত্রণা আমার মনকে ভীষণরকম ছুঁয়েছিল। একটা অতৃপ্ত শরীরকে বুকে-পিঠে ব'য়ে বেড়ানো কতটা কষ্টের সেটা কেবলমাত্র ভুক্তভোগীই জানে। যখন আমি দেখলাম মিনিট পনেরো হয়ে গেছে অথচ কুকুর দু'টো আমার পিছু ছাড়ছে না তখন একটা দোকান থেকে দু-প্যাকেট বিস্কুট কিনলাম এবং ওদেরকে খেতে দিলাম। ওরা লেজ নেড়ে অভিবাদন জানালো। আমি খুশি হলাম। ওরা বেশ ভালোরকমই আন্দাজ করেছিল যে এই লোকটা ওদেরকে খেদিয়ে দেবে না। যাইহোক, ওদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে এবং যখন ওরা খাবার খেতে শুরু করলো তখন আমি নিঃশব্দে সরে এলাম।



রোশনি আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা বসন্ত ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে এল। যদিও আমি নিশ্চিত নই সেখানে ভালোবাসা ছিল কিনা। কারণ মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে সেটা সম্ভব কিনা সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা ছিলনা আমার। যদিও সিনেমায় দেখা যায় একঝলক চোখের দেখাতেই ভালোবেসে ফেলে নায়ক-নায়িকারা। কিন্তু সত্যি বলতে এসব ট্র্যাশ আমি বিশ্বাস করিনা। হ্যাঁ, অবশ্যই প্রথম দেখাতে কাউকে ভালো লাগতেই পারে তবে সেটা লভ নয়, ইনফ্যাচুয়েশন। রোশনি মারকাটারি সুন্দর। আমরা একসঙ্গে গল্প করতে করতে কফি শেষ করেছিলাম। ও আরও ঘন হয়ে বসেছিল আমার সাথে। ওকে দেখে ভীষণ সুখী মনে হচ্ছিল আর ঘনঘন আমার ঠোঁটদু'টো খেতে চাইছিল। রোশনি বলছিল যে ও গতরাতেই আমাকে খেতে এসেছিল কিন্তু আচমকা আমি ওকে ''তিথি" ব'লে ডাকাতে ওর মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছিল। ফলত সে রাতে কিছুই হয়নি আর আমি এতটাই মাতাল ছিলাম যে আমাদের মধ্যে কিছু হবার সম্ভাবনাও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সে জানিয়েছিল তারা খুবই সাধারণভাবে দিন কাটায়। মংলুর আয় খুব বেশি নয়। তাই দিয়ে সংসার চালিয়ে নিতে হয়। কখনও কখনও ধারবাকিও করতে হয় কিন্তু তাতে সমস্যার কিছু নাই। আসলে বলতে চাইছিল যে সে অভাবের সাথে লড়তে পারছিল। খুবই ভালো যোদ্ধা। কিন্তু সে মোটেও খারাপ নয়। নাহলে সে চাইলেই বিয়ের পরদিন থেকেই সেটা সম্ভব ছিল এবং তার জন্য মংলু কোনওরকম দোষারোপ করতে পারতো না কারণ সে ভালোমতোই জানতো তার অক্ষমতার কথা। এসব কথা বলার সময় রোশনির গলা কেঁপে যাচ্ছিল আর আমি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। ও জানতে চেয়েছিল আবার কবে আসবো। আমি বলেছিলাম, -খুব শিগগিরই ফিরে আসবো।

-তোমার নম্বরটা দাও।

আমি ওকে নম্বরটা দিলাম ঠিকই কিন্তু মনে মনে স্থির করেছিলাম এবাড়িতে জীবনে আর কখনও পা রাখবো না।



আমি যখন ওকে জানালাম আমার বন্ধু হয়তো ঘুম থেকে উঠে পড়েছে এবং সে আমার জন্য অপেক্ষা করছে অতএব আমি আর বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারবো না তখন রোশনি আধঘন্টা সময় চেয়ে নিয়েছিল এবং তারপর আমাকে আলু-পরোঠা আর স্কোয়াশের চাটনি রান্না ক'রে খাইয়েছিল। আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম এমন চমৎকার সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করার জন্য। আর এই মুহূর্তে আমি প্রায় ম্যালের কাছাকাছি চলে এসেছি। আমার মন এবং পেট দু'টোই ভ'রে থাকার কারণে নিজেকে বেশ ঝরঝরে লাগছিল। আমি সিগারেট ধরিয়ে খোশমেজাজে হাঁটছিলাম। আমার আশপাশে এখন প্রচুর লোক যারা ম্যালের থেকে নিচে নেমে আসছে অথবা ওপরে উঠছে। তারা কেউই থেমে ছিলনা। সবকিছুই একটা ছন্দে চলছিল। আমার যে বন্ধু অপেক্ষা করছে হোটেলে তার মুখ মনে পড়ছে না কারণ পরিচিত কারও আদলের সাথেই আমি তাকে মেলাতে পারছি না, আসলে সে ছিল আমার কল্পনা প্রসূত, আমার কোন বন্ধুই এখানে আসেনি, আসার কথাও ছিলনা। সুতরাং সত্যিই আমার কোনো তাড়া নেই, উদ্দেশ্য নেই, এটা ভেবে স্বস্তি পেলাম এবং এই অফুরন্ত সময়ের ভেতর থেকে কিছুটা সময় মাল খাওয়ার জন্য ব্যয় করা যেতেই পারে। আমি দ্রুত পায়ে উঠে এলাম চৌরাস্তায়। আমার চোখ খুঁজছিল এমন একটা বার কাম রেস্তোঁরা যেখানে ভিড় অপেক্ষাকৃত কম আর দুরন্ত সার্ভিস। কিন্তু এমনটা খুঁজে পাওয়া মুখের কথা নয়। অনেক ঘোরাঘুরির পর শেষ পর্যন্ত একটা বারের সন্ধান পেলাম এবং দ্বিধাহীন ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। বারটা মোটামুটি সাজানো-গোছানো। খুব বড় না আবার একেবারে ছোটও না। সেখানে সুসজ্জিত পাঁচটা টেবিলের মধ্যে একটা টেবিল যেটা কিনা এখনও পর্যন্ত কেউ দখল করেনি আমি সেটার দখল নিয়ে সবেমাত্র নিজেকে জমিদার ভাবতে শুরু করেছি ঠিক তখনই দু'টো বিদেশি আমার সামনের চেয়ার দু'টো দখল ক'রে বসলো। সম্ভবত ওরা নিজেদের ভাষায় কথা বলছে। ফলে ওদের কনভারসেশনের মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে একটা ব্যাপার আমার নজর এড়ালো না আর সেটা হয়ত খুবই সাধারণ ঘটনা কিন্তু কেন জানি না আমার ভেতরটা খচখচ করতে লাগল কারণ ওরা ভীষণ আস্তে প্রায় ফিসফিসিয়ে কথা বলছিল এবং ঘনঘন বাইরে তাকাচ্ছিল।

( ক্রমশ...)

25 views0 comments