Search

মহানবমী ।। বিশেষ সংখ্যা ।। বিশেষ ধারাবাহিকঃ- সৌভিক রাজ


বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো, এই উৎসব বহুবছরের প্রাচীন । ভবিষ্যপুরাণে রয়েছে যে, যে দেশে দেবীর পুজো হয় সেই দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না, কেউ কোন দুঃখ পায়না বা কারও কোনো অকালমৃত্যু হয় না।


পর্ব-৩

সৌভিক রাজ


দর্পনে বিসর্জন হলেই আপনি শাস্ত্রমতে বিজয়ার শুভেচ্ছা দিতেই পারেন; শুধু এইবার ওটা ভার্চুয়ালি সারুন কারণ কোলাকুলি করলে করোনা আসতে আর কতক্ষন!


এই বিজয়া দশমীরও একাধিক তাৎপর্য রয়েছে...



পুরাণ অনুযায়ী, মহিষাসুরের সঙ্গে একনাগাড়ে ৯ দিন ও ৯ রাত্রি যুদ্ধ করার পর দশম দিনে জয় লাভ করেন দেবী দুর্গা। সেই জয়ই বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। তবে উত্তর ও মধ্য ভারতে এই দিনে যে দশেরা উদযাপিত হয়, তার তাৎপর্য কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাল্মীকি রচিত রামায়ণে অনুসারে, আশ্বিন মাসের শুক্লা পক্ষের দশমী তিথিতেই  শ্রী রামচন্দ্র রাবণ কে বধ করেছিলেন। তাই এই দিনটিকে দশেরা হিসেবে পালন করেন উত্তর ও মধ্য ভারতের মানুষেরা।


 কালিদাসের লেখায়  ও তুলসিদাসের রামচরিতমানসে বলা হয়েছে যে, আশ্বিনের তিরিশতম দিনে লঙ্কা জয় করে সস্ত্রীক অযোধ্যায় ফিরেছিলেন শ্রী রামচন্দ্র। সেই প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ঘরে ঘরে জ্বলেছিল দীপ। সেই রীতিই দশেরা ও দীপাবলি রূপে পালন করা হয়েছিলো যা আজও পালিত হচ্ছে।



দেবী দুর্গার বিদায়ের দিনে বিষাদের সুরেই বিজয়া দশমী পালন করেন সকলে,এটা শাস্ত্র অপেক্ষা উৎসব শেষের ঐতিহ্য বলাই শ্রেয়। সধবা মহিলারা সিঁদূর খেলায় মেতে ওঠেন। আলিঙ্গন ও মিষ্টিমুখ চলতে থাকে।ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে পড়ে,ইছামতির বিসর্জন সম্প্রীতির এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। এখানেই বিজয়া দশমীর বিশেষত্ব, যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে লৌকিক প্রথাকে মিশিয়ে  দিয়েছে।  ঠিক যেনো বাড়ির মেয়েকে  বিদায় জানিয়ে "আবার এসো" বলা আর যাত্রা শুভ হওয়ার প্রার্থনা। সারা বছরের মঙ্গলকামনায় পূর্ববঙ্গের  মানুষদের যাত্রাঘট পাতার প্রচলন রয়েছে এই দিনে, সামর্থ্য অনুযায়ী জোড়া পুঁটি বা ইলিশ আনার নিয়ম রয়েছে অনেকেরই। 



কিন্তু পুজোও তো শেষ হয়েও শেষ হয়না!  


দুর্গাপূজা শেষ, দেবীর  প্রথামতো নিরঞ্জন হয়েগিয়েছে  কিন্তু উত্তরবঙ্গে জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারের কিছু কিছু এলাকায় তখন পুজো বাকি। একাদশীর দিন শুরু হয় একদিনের দুর্গাপূজা। একদিনের এই পূজায় মা দূর্গা রূপে নন, দেবী  পূজিত হন ভাণ্ডানি নামে।  মূলত উত্তরবঙ্গের রাজবংশী কামতাপুরী ভাষাভাষী প্রধান গ্রামগুলিতে আজও সপরিবারে ভাণ্ডানি রূপে পূজিত হয়ে থাকেন দেবী উমা। জনশ্রুতি রয়েছে, মা শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাওয়ার পথে এলাকার মানুষ শােকাহত হয়েছিলেন। তখন মা উমা তাদেরকে দেখা দেন এবং ওই সব অঞ্চল পুনরায়  শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠে। সেই থেকে মা দুর্গা  ভাণ্ডানি রূপে


পুজিতা হয়ে আসছেন উত্তরবঙ্গে। এই  ভাণ্ডানি পুজো উপলক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে মেলাও বসে। ভাণ্ডানী দেবী মূলত দ্বিভূজা এবং ব্যাঘ্র বাহিনী ও রক্তিম বর্ণা।  দেবী পশ্চিম অভিমুখে বসেন। 


এই ছিলো ভাণ্ডানি দেবীর সাধারন বর্ণনা, যদিও সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় দেবীর রূপে পরিবর্তন এসেছে। যেমন কোথাও কোথাও বাহন বাঘ হয়েছে সিংহ। কখনো দ্বিভূজা দেবী হয়েছেন চতুর্ভুজা। 


এই দেবী ভাণ্ডানিইকে কোথাও দুর্গা, কোথাও বনদুর্গা রূপে পুজো করার  প্রথাও চালু হয়েছে॥ দশমীর রাতেই ভাণ্ডানি  পুজোর সমস্ত প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়ে যায়। রাজবংশী সমাজের পুরোহিত দেউসি একাদশীর ভোরে দুধ, দই, চিনি, বাতাসা দিয়ে  নৈবেদ্য সাজিয়ে পুজো শুরু করেন। 


উত্তরবঙ্গের এই দেবী ভাণ্ডারনি এবং কোনো কোনো জায়গায় ভাণ্ডলী নামেও পরিচিত,  ব্যাঘ্র বাহিনী দেবীকে নিয়ে  গল্পগাঁথার শেষ নেই।অনেকে মনে করেন, দেবী দুর্গা দশমীতে কৈলাসে ফিরে যাওয়ার পথে গ্রামের পর্ণ কুটিরে আশ্রয় নেন।  সেখানে তিনি একাদশীতে ভাণ্ডানি রূপে পূজিত হন আবার একদল দাবি করেন, ভাণ্ডানি হলো দেবী দুর্গার জিনিসপত্রের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন।  পুজোর পরে কোচবিহারের রাজবাড়ি থেকে দেবী শ্বশুরালয়ে ফিরে যাওয়ার পথে ভাণ্ডানি অসুস্থ হয়ে পড়েন।  দেবী বাধ্য হয়ে আরও তিনদিন থেকে যান। ওই সময় ফের তাঁর পুজোর আয়োজন হয়।


তবে ঐতিহাসিক এবং গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী , ভাণ্ডানি হলো  আদতেই মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভুত। কৃষি ভিত্তিক সমাজের শস্যের দেবী রূপে  শস্যের প্রাচুর্যের আশায় ভাণ্ডানি দেবীর আরাধনার সূচনা হয়। প্রকৃত অর্থেই মা ভাণ্ডানি হলেন কৃষির দেবী।  গবেষকেদের একাংশের  দাবি  অবশ্য, ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল শ্বাপদসঙ্কুল ঘন জঙ্গলে ভরা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভুত নানা গোষ্ঠীর বসতি এলাকা। এখানে ভালুকের উপদ্রব ছিলো অত্যন্ত বেশি। স্থানীয় সমাজে ভালুক ভাণ্ডি নামে পরিচিত। ওই ভাণ্ডির হাত থেকে রক্ষার জন্য তাঁরা যে দেবীর আরাধনা শুরু করে সেটাই ভাণ্ডানি নামে পরিচিতি পায়।



 'ভাণ্ডি' শব্দটি কামতাপুরী বা রাজবংশী ভাষার  শব্দ যার ভাণ্ডি অর্থ ভালুক, এই জনশ্রুতি ছেড়ে ঐতিহাসিক গবেষকদের মতকেই প্রামাণ্য ধরতে হয়। কামতাপুরী বা রাজবংশীদের প্রাচীন (টোটেম অর্থাৎ কুলপ্রতীক) যুগ ও তাঁদের ঐতিহ্যের নিদর্শন এই ভাণ্ডি খেলা।  উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার জেলা এবং বাংলাদেশের নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও জেলায় ভাণ্ডি খেলা প্রচলিত। উত্তরবঙ্গের অরন্য প্রধান অঞ্চলে একসময় মানুষ ভালুককেই পোষ মানিয়ে নাচিয়েছিলো। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে ভালুককে আর কতদিন   মানুষের আনুগত্যে রাখা যায় আর সব ভালুক কে পোষ মানানো যায় না। তাই অগত্যা  মানুষই এখন ভাণ্ডি সাজে এবং ভালুকের মতো বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে বাজনার তালে নাচে আর গান গায়। 

(ক্রমশ..)

2 views0 comments