Search

মহাষষ্ঠী ।। বিশেষ সংখ্যা ।। ভৌতিক গল্প - অর্ঘ্যদীপ দাস  


অশরীরী 

অর্ঘ্যদীপ দাস  


প্রায় দশ বছর পর আসা হল দেশের বাড়িতে। এমনিতে কাজের চাপে ঘরের বাইরে খুব বেশি বেরোনো হয়না। কাজ বলতে আমি একজন সামান্য লেখক। নাম-পরিচিতি সামান্য আছে বৈকি। তবে সেলফি অটোগ্রাফের ভিড় এখনো করে উঠতে পারিনি। আসলে আমার আবার একটু ফাঁকা জায়গা না পেলে গল্পের প্লট মাথায় আসে না। বাড়িতে এমনিতে আমি আর আমার স্ত্রী থাকি। ছেলে কাজের সূত্রে বাইরে থাকে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে বাড়ি মোটামুটি ফাঁকাই থাকে। তবে ইদানিং বাড়িতে অনেক লোকজন আসছে। লোক বলতে আমার আত্মীয়-স্বজনই বটে, কিন্তু এতো লোক জমায়েত ভালো লাগেনা। কোথায় শান্তিতে বসে গল্পের প্লট ভাববো, তা না দুদন্ড তিষ্ঠোবার জো নেই। তাই একরকম বাধ্য হয়েই দেশের বাড়িতে আসা। তা অবশ্য একদিকে ভালোই হয়েছে, বেশ অনেকদিন বাদে প্রকৃতির কোলে বসে লিখবো। 




আমার দেশের বাড়ি রাজগোদা অঞ্চলে। জায়গাটা হলদিয়ার বেশ কাছেই। ট্রেনে করে গেলে ঘন্টা তিনেকের পথ। তাই বেশ সকাল সকালই চলে এলাম। অবশ্য এবার আসাটা অন্যান্যবারের তুলনায় বেশ তাড়াতাড়ি হয়েছে। জায়গাটা বেশ ছিমছাম। কাছাকাছি সেরকম কারুর বাড়ি নেই। সামনে একটা বিশাল পুকুর। ছোটবেলায় বাবার সাথে আসতাম মাছ ধরতে। 




বাড়ির দরজাটা বাইরে দিয়ে তালা দেওয়া। চাবি আমার কাছেই ছিল। তালা খুলে ঘরের ভিতর ঢুকলাম। অনেকদিন না আসায় ঘরে বেশ ধুলো জমেছে। বাড়ির রংটাও চটে গেছে। গাছগুলো বেড়ে জঙ্গলে পরিণত হয়ে গেছে। একজন লোককে রেখেছিলাম দেখাশুনা করার জন্য, সে যে কত কাজ করে, তা ঘরের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়। ভেতরর শোয়ার ঘরটাকে আগে পরিষ্কার করে নিলাম। ভেতরে সেরকম কিছু নেই। একটা বিছানা, একটা আলমারি আর একটা টেবিল। এঘরেই আগে নাকি আমার ঠাকুরদা থাকতেন। ঘরদোর পরিষ্কার করে একদম নিজের মত করে নিলাম। এদিকে লোডশেডিং হয় মাঝেমধ্যেই। এখনো হয়েছে, যদিও তাতে বিশেষ অসুবিধা নেই, অন্ধকার আমার বেশ ভালোই লাগে। 




রাজগোদা জায়গাটা বেশ ভালো। বেশ শান্ত একটা গ্রাম, শহরের ছোঁয়া এখনো সেভাবে লাগেনি। ধানের জমি, পুকুর ভর্তি মাছ, গাছের সারি, আঁকাবাঁকা মোরামের রাস্তা, নীল আকাশ... আহা!! অবশ্য গ্রাম পেরিয়ে একটু এগোলেই শহর। সেখানে সবসময় হৈচৈ চলছেই। সারা রাস্তা বেয়ে ছুটে যাচ্ছে দু চাকা, চার  চাকা। মানুষগুলো যেন একবর্ণ ধীরস্থির হয়ে চলতে পারে না। মানুষগুলো দিনকেদিন অমানবিক হয়ে যাচ্ছে। সুযোগ পেলেই ক্ষতি করবে। এই তো সেদিন রাতে প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে বাড়ি ফিরছি। একটা চারচাকা ব্রেকফেল করে মারলো ধাক্কা। ছিটকে পড়লাম আমি, জ্ঞান হারালাম। মাথায় বড় চোট লাগল, হাতে পায়েও লেগেছিল অবশ্য। তাই নিয়ে হাসপাতালে অনেকদিন পড়ে ছিলাম। এই তো একসপ্তাহ আগে মুক্তি পেলাম। যাকগে সে কথা, এরম সুন্দর পরিবেশে ওসব অলক্ষুণে কথা ভেবে লাভ নেই। 



দুপুরে সব কাজ শেষ করে বসলাম গল্প লিখতে। একটা ভূতের গল্পের প্লট মাথায় এসেছ। ওই নিয়ে লেখালিখি করছি। এমনিতে সময়টা শীতকাল। তাই লিখতে লিখতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গেছে বুঝতেই পারিনি। এদিকে এই একটা সমস্যা ইলেকট্রিসিটি। ঠান্ডাটা ভালোই পড়েছে এখানে। গ্রামের দিকে শীত একটু বেশি হয়। আজ গল্প লিখতে লিখতে মনটা বেশ উৎফুল্ল লাগছে। একে তো প্রায় বছর দশেক পর এখানে আসা। তার ওপর এই নির্জন রাতে ভূতের গল্প লিখতেও মন্দ লাগছে না। ভূতের গল্প লিখলেও মানুষটা আমি বড্ডো ভীতু। তাও আলো আছে বলে রক্ষে, নইলে যে কি হত। গল্পটা বেশ জমে উঠেছে। এ গল্প এবার পাঠকমহলে সমাদৃত হবেই।


আন্দাজ তখন দশটা বাজে। ঝুপ করে কারেন্টটা গেল চলে। এই হয়েছে মুশকিল। কখন যে কারেন্ট যায়, আর কখন যে আসে বোঝা দায়। যদিও সাথে মোমবাতি আর টর্চ দুটোই আছে।  তবু জ্বালালাম না। থাক এরকম নির্জন জায়গায় অন্ধকারের মজাই আলাদা। বাইরে ঝি ঝি পোকার ডাক। দু-একটা জোনাকিও আছে। বেশ ভালো লাগলো। হঠাৎ বাইরে একটা ঝুপ করে আওয়াজ হল। প্রথম বারে খুব একটা গা করিনি। আমার ঘরের বাইরে বড় একটা বারান্দা আছে। সেখানে বেশ কয়েকটা ছুঁচো আছে। তাদেরই ছটফটানি আওয়াজ হয়। দুপুরে বেশ কয়েকবার সে আওয়াজ হয়েছে। ছুঁচো না হয়ে বিড়াল হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। হয়তো ছুঁচোর খোঁজেই এসেছে। দূর যাক গে ওসব ভেবে কি হবে। আবার ডুব দিলাম গল্পের ভাবনায়। এই অন্ধকারে ভৌতিক গল্পের ভাবনা জমে ভাল। কিছুক্ষুণ সব চুপচাপ ছিল। তারপর কিছুক্ষুণ বাদে আবার সেই শব্দ। আগের থেকেও আওয়াজ বেশি। এটাতো ইঁদুর বা বিড়ালের আওয়াজ না। মনে হচ্ছে বারান্দায় কয়েকজন মানুষ হাঁটাচলা করছে।  আমার বাড়ির কাছাকাছি কেউ  থাকে না। আর তাছাড়া এই শীতের রাতে কোনো মানুষই বেরোনোর সাহস দেখাবে না। তবে কি চোর? কিন্তু চোরই বা আসবে কেন? আমার কাছে এমন কিছু নেই যেটা চোরকে আকর্ষিত করবে। তাছাড়া চোর কি দলবল নিয়ে চুরি করতে আসবে নাকি। মরুক গে যা। এরপর আবার হাঁটাহাঁটি আওয়াজ যেন বেড়ে গেল। যেন সারা বারান্দায় কেউ খুব জোরে পায়চারি  করছে। আমি চিৎকার করে হাঁক দিলাম, 

“কে? কে ওখানে?” 

তারপর কোনো  কিছু না ভেবেই টেবিলে রাখা টর্চ নিয়ে দরজা খুলে বারান্দায় ফেললাম। দেখলাম কেউ কোথাও নেই। তবে আমি কি ভুল শুনলাম। হতে পারে বাইরে হাওয়ায় গাছের পাতা গুলো নড়চড় হওয়ায় এরকম শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। আমি দরজা ভেজিয়ে বসলাম। মনকে সান্ত্বনা দিলাম অহেতুক ভয় পেলে ভয় জাঁকিয়ে বসে। 

        

এরপর যেন তাদের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। অনেক লোক মিলে একসাথে ফিসফিস করলে যেরকম আওয়াজ হয় সেরকম। এই ঠান্ডাতেও মনে হল ঘামছি। হাত পা গুটিয়ে আসছে। হাতের সামনে রাখা মোমবাতিটা জ্বালিয়ে দিলাম। ঘরে আমি বাদে দ্বিতীয় কোনো জীব নেই। তবে কি...??



পায়ের আওয়াজ দরজার কাছে এগিয়ে আসছে বুঝতে পারলাম। ইতিমধ্যে জানলা থেকে একরাশ দমকা হাওয়ায় মোমবাতিটা নিভে গেল। আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে বিছানার ওপর গিয়ে বসলাম। একটু পর প্রচণ্ড শব্দ হয়ে দরজাটা ধড়াম করে খুলে গেল। বুক রীতিমতো ধুকপুক করছে। ভয়ে হাত পা কাঁপছে। প্রচন্ড ভয়ে কথা বলতেও যেন ভুলে গেছি। কোনরকমে কাঁপা হাতে লাইটার বের করে মোমবাতিটা আবার জ্বালালাম। তাতে দেখলাম দরজার সামনে চারটে ছায়ামূর্তি। ছায়াগুলো এগিয়ে আসছে খাটের দিকে। বুঝতে পারছি প্রচন্ড ভয় পেয়েছি। এরম ভয় আগে কখনো পাইনি।


উহ.. না.. না ভুল বললাম, এরকম ভয় এর আগে একবারই পেয়েছিলাম। ঠিক এক সপ্তাহ আগে নিজেকে দেখে। যখন আমার শরীরটা শ্মশানের ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢোকানো হচ্ছিলো। সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম নিজের ঠান্ডা নিথর শরীরটাকে দেখে।



1 view0 comments