Search

মহাসপ্তমী ।। বিশেষ সংখ্যা ।। ছোটগল্প - উত্তম চক্রবর্তী


থার্ড আই

উত্তম চক্রবর্তী



রজত সেনগুপ্ত ওঁর মোবাইল ফোনে সেট করা এলার্মের শব্দে চমকে উঠলেন। তখন নিউ ইয়র্কে বিকেল সাড়ে চারটা আর ভারতে মধ্য রাত্রি দুটো। রজত সেনগুপ্ত ওঁর নিউ ইয়র্ক অফিসে একটা জরুরী মিটিঙে ব্যস্ত ছিলেন। হটাত এই রিমোট সিকিউরিটি এলার্ম ওঁকে সতর্ক করে দিয়েছে। নিশ্চয়ই ওঁর ব্যাঙ্গালোরের খালি বাড়িতে চোর ঢুকেছে। রজত এখন সপরিবারে নিউ ইয়র্কে। প্রায়ই ওকে ব্যবসার কাজে লন্ডন, আমেরিকা, জাপান ও সিঙ্গাপুর যেতে হয়। বিয়ে করেছেন সবে তিন বছর আগে। কাজেই মাঝে মাঝেই রীতা মানে রজতের স্ত্রী ওঁর সাথেই বেরিয়ে পড়ে ঘুরতে।

রজত গতবার সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেই দেখেন ওঁর রাজ রাজেশ্বরী নগরের বাড়িতে পিছনের গেটের তালা ভেঙ্গে চোর ঢুকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার সোনা ও পঞ্চাশ হাজার টাকার মত ক্যাশ চুরি করে পালিয়েছে।



রীতাও ওঁর সাথে ছিল। মা বাবা সেই সময় কলকাতায় ওদের সল্ট লেকের বাড়িতে। ব্যঙ্গালোরে ওঁর নিজের বাড়ি ছিল একদম ফাঁকা, তালা দেওয়া। ড্রাইভার অঞ্জন মাঝে মাঝে এসে বাড়ি ঘর সব ঠিক আছে কিনা চেক করে যেত। তা সত্বেও সিঙ্গাপুর ট্যুরে থাকতে রজতের বাড়িতে ডাকাতি হয়। পরদিন বাড়ি ফিরেই চুরি হয়েছে দেখে অঞ্জনকে ডাকে রজত। অঞ্জন অবাক হয়ে বলে কাল সকালেও ও নিজে এসে দেখে গেছে সব ঠিক ঠাক আছে। তার মানে কাল রাতেই হয়েছে চুরিটা।



রজত পুলিশে খবর দেয়, পুলিশ সাথে কুকুর নিয়ে এসে এনকোয়ারি করে, এফ আই আর দায়ের করে। কিন্তু সেই চুরির আজ পর্যন্ত কোন কিনারা হয়নি। তবে রজতের একটা দারুণ শিক্ষা হয় এই ঘটনায়। ও আগেই শুনেছিল যে ব্যাঙ্গালোরে ফ্ল্যাট বাড়ি গুলিতে কোন সমস্যা নেই, কারন সব সোসাইটিতেই সি সি টিভি ক্যামেরা লাগানো আছে এবং সিকিউরিটি আছে। কিন্তু নিজস্ব ইন্ডিপেন্ডেন্ট বাড়িগুলি ততটা সুরক্ষিত নয়। সিঙ্গাপুর থাকা কালিন যে বার চুরি হয় তারপরেই রজত ওর বাড়িতে চারিদিকে সি সি টিভি ক্যামেরা লাগায় এবং ওঁর মোবাইলের সাথে নেট কানেকটিভিটির মাধ্যমে এমন সিস্টেম করে যে বাড়ি খালি থাকবার সময় কেউ ওখানে ঢুকলেই একটা এলার্ম বাজবে এবং রজত পৃথিবীর যেখানেই থাকুক ওঁর মোবাইলে বাড়িতে কে ঢুকেছে বা কী করছে সবই দেখতে পাবে।



রজত ওঁর অফিসের মিটিং রুমে বসা আটজন বিভিন্ন ষ্টেটের ডিসট্রিবিউটারকে একটু বসিয়ে রেখে ওদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বাইরের বারান্দায় চলে এলো। ওঁর ব্যাঙ্গালোরের বাড়ির ঠিক পাশের বাড়িতেই থাকেন আরেক বাঙ্গালী ভদ্রলোক সুজন মুখার্জি। বি ই এল এর রিটায়ার্ড সিনিয়র ইঞ্জনিয়ার। স্ত্রী, ছেলে ও তার ফ্যামিলি নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে আছেন প্রায় পনের বছর। রজত ওঁকে কাকু কাকু ডাকেন এবং ব্যাঙ্গালোরে থাকলে একসাথে মর্নিং ওয়াক করতে বেড় হন। রজত জানে ইন্ডিয়াতে এখন মাঝরাত। তা সত্বেও রজত ফোন করলেন সুজন বাবুকে। ভদ্রলোক অতো রাতে রজতের আমেরিকা থেকে ফোন দেখেই বুঝতে পাড়লেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে রজতের বাড়িতে। রজত এবার যাবার সময় কাকুকে বলে গেছিলেন যে ওঁর বাড়িতে কোন সমস্যা হলে কাকুকে রজত ফোন করবেন।


ফোনের শব্দে ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠেই ফোনে জিজ্ঞাসা করলেন,’ হ্যাঁ, বল রজত। কী হয়েছে ?’

‘কাকু, বাড়িতে আবার চোর ঢুকেছে।একজন পিছন দিকে আছে এখন...ঐ রান্না ঘরের পিছনে গিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করছে। আরেক জন দেখছি সামনের বারান্দার গ্রিলের তালা খুলে এখন বসবার ঘরে ঢুকছে। আপনি শীগগির পুলিশে খবর দিন আর পাড়ার লোকদের জানান কাকু। আমি একটা জরুরী ব্যবসা সংক্রান্ত মিটিঙে আছি কাকু। প্লিস একটু দেখুন না।‘ রজতের গলার স্বরে অনুরোধের সাথে আকুতি ঝরে পড়ে। এখন কাকু কিছু করলেই এই চুরি ঠেকানো যাবে। না হলে আমেরিয়ায় বসে রজত আর কিছুই করতে পারবেন না, এই মোবাইল ফোনে শুধু বসে বসে চুরিটা দেখা ছাড়া।

সুজন মুখার্জি ভীষণ করিতকর্মা মানুষ। ঘর থেকেই আগে দুই পাশের ও সামনের রাস্তার ওপারের কয়েকজন বন্ধু ও জানাশুনা মানুষ, যারা ওঁর সাথে হাঁটতে বের হয়, তাদের ফোনে জানালেন যে রজতের বাড়িতে চোর ঢুকেছে। এরপর সাথে সাথে রাজ রাজেশ্বরী থানায় ফোন করলেন সুজিত বাবু। মিনিট দশের মধ্যে নিঃশব্দে পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ালো রজতের বাড়ির দুটো বাড়ি আগে রাস্তার একপাশে। ইন্সপেকটার মুরলী সেটটি কনস্টেবলদের দিয়ে আগে বাড়ির চারিদিক ঘিরে ফেললেন। সাথে রইল বেশ কিছু স্থানিয় মানুষ। রাত তখন প্রায় আড়াইটা বাজে। দুই চোর ততক্ষনে ভিতরে ঢুকে টর্চের আলোয় আলমারি খুলে ফেলেছে। দুই জন দুই ঘরে ব্যস্ত।



হটাত পুলিশ বড় বড় টর্চ ফেলে ঢুকে পড়ল বাড়িতে। চোর ছেলে দুটো ভাবতেই পারেনি যে পুলিশ ও পাড়ার লোকেরা টের পেয়ে যাবে। একজন পিছন দিয়ে পালাবার চেষ্টা করে পুলিশের গুলিতে পায়ে হাত চেপে ওদের স্থানিয় কন্নর ভাষায়, ‘বাবা গো’ বলেই বসে পড়ল। আরেকজন ইন্সপেকটার মুরলীর হাতে ওঁর পিস্তলের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোর করে হাঁটু গেঁড়ে বসে সারেন্ডার করল। রজত মিটিঙে বসে মোবাইলে সব দেখছিল। সঙ্গে সঙ্গে সুজন বাবুকে ভিডিও কল করে ইন্সপেকটার মুরলীকে দিতে বলে। ভদ্রলোক নিউ ইয়র্ক থেকে বাড়ির মালিক কথা বলতে চান শুনে অবাক হয়ে গেলেন। সুজন বাবুর ফোনে খবর পেয়েই তার পাশের বাড়িতে চোর ধরতে এসেছিলেন এবং ওরা হাতে নাতে চোরকে ধরেছেন ও।

রজত সেনগুপ্ত এর আগের চুরির এফ আই আর যখন করেছিলেন তখন এই ইন্সপেকটার মুরলী ছিলেন না। ওঁর কাছে এটা আজ ছিল এই পাড়ায় প্রথম চুরির কেস। অবাক হয়ে ফোন তুলে দেখলেন একটা বিশাল অফিস বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে একজন বাঙ্গালী ভদ্রলোক। রজত হাত দিয়ে স্যালুটের ভঙ্গি করে ইংরাজিতে বললেন, ‘আপনি আমাকে চিনবেন না স্যর। আমি আপনাদের থানায় আগেও আমার বাড়ির চুরির কমপ্লেন করেছি। তারপরেই আমি বাড়িতে সি সি টিভি লাগাই। এই চোরেরা বাড়িতে ঢুকতেই আমি নিউ ইয়র্কে অফিসে বসেই সেটা টের পেয়ে যাই ও সুজন বাবুকে ফোন করে বলি আপনাদের জানাতে। আপনারা যে এতো তাড়াতাড়ি এসে চরদের ধরে ফেলবেন সত্যি ভাবতেই পারিনি। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের। এদের এরেস্ট করে নিয়ে যান। আমি চারদিন বাদেই দেশে ফিরে আপনার সাথে দেখা করব।‘

সুজন বাবুর দিকে তাকিয়ে ইন্সপেকটার মুরলী রজতকে জানাল,’আমি আপাতত সুজন বাবুর সাথে যোগাযোগ রাখব। আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমরা আপনি না আসা পর্যন্ত বাড়িতে তালা দিয়ে একজন পুলিশ পোস্টিং করে দিচ্ছি। আপনি নিশ্চিন্তে আপনার কাজ সেরে ফিরুন মিস্টার রজত। আমি আপনার এই ক্যামেরা লাগিয়ে মনিটরিং করার বন্দোবস্ত করার উদ্যোগের প্রশংসা করছি। আমরা দেখব এই শহরে যাদের নিজস্ব বাড়ি আছে তারাও যাতে আপনার মত ব্যবস্থা নেন। ধন্যবাদ স্যর।‘



রজত লাইনে থাকতেই সুজন বাবু লাইনে এসে বললেন,’পাড়ার সবাই এসেছে এখানে রজত। তুমি এদের একবার হাই বলে থাঙ্কস বলে দাও......’ সুজন বাবু মোবাইলটা ঘুড়িয়ে ওঁর বন্ধু ও প্রতিবেশীদের দেখালেন রজত ওদিক থেকে সবাইকে হাই বলে হাতজোর করে ধন্যবাদ জানালেন। মনে মনে আধুনিক টেকনোলজির কৃপায় ওঁর থার্ড আইকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে আবার ওঁর মিটিঙে ফিরে গেলেন রজত সেনগুপ্ত। ব্যাঙ্গালোরের একটা সফট ওয়্যার কোম্পানির মালিক ও বাঙ্গালী এন্টারপ্রুনার।

* সত্যি ঘটনা অবলম্বনে রচিত।


7 views0 comments