Search

রামধনু ।। ২৫তম সংখ্যা ।। গল্প ।। মিঠুন মুখার্জী


নীরব ভালোবাসা

মিঠুন মুখার্জী

আপন বলতে সুনীলের কেউ ছিলেন না। বয়স যখন চোদ্দ, এক ভয়ঙ্কর পথদুর্ঘটনায় বাবা-মা মারা যান। সেই থেকে এক দূরসম্পর্কের মামার বাড়িতে মানুষ। মামা শঙ্খ ঘোষ রিটার্ড স্কুলশিক্ষক। বিয়ে করেননি। তাই তার দেখাশোনা সুনীল করেন। আজ সুনীলের বয়স ত্রিশ বছর। মামা অনেকবার বিয়ে করার কথা বলেছেন সুনীলকে, কিন্তু সুনীল রাজি হন নি। সুনীল মামাকে বলেছেন-- "আমার মতো বেকার ছেলের সঙ্গে কোনও মেয়ের বাবা-ই বিয়ে দেবেন না। তাছাড়া এখনকার মেয়েরা মা- মাসিদের মতো নন। কাউকে তোয়াক্কা করেন না।" সুনীলের এই কথায় মামা বলেছেন-- "দ্যাখ তুই যা ভাল বুঝিস কর। আমি আর বেশি দিন বাঁচবো না। আমার থাকতে থাকতে যেটুকু আছে তুই বুঝে নে। আমার তো তুই ছাড়া আর কেউ নেই। যদি তোর বউটা দেখে যেতে পারতাম, তবে আমার কোনো অনুশোচনা থাকতো না।"



মামার প্রচেষ্টায় বি.এ. পর্যন্ত পাস করেছেন সুনীল। পড়াশোনায় খুব ভালো না হলেও, খুব খারাপ ছিলেন না। বহু কষ্ট করেও, এখনো একটা চাকরি জোগাড় করতে পারেননি। কলেজ জীবনে তার মন দেওয়া-নেওয়া একেবারে হয়নি, এমনটা বলা যায়না। তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় প্রথম বর্ষের শ্যামা নামক একজন ধনী বাবার সুশ্রী মেয়েকে ভালো লেগেছিল সুনীলের। অনেকবার চেষ্টা করেও তার সম্মুখে প্রেম নিবেদন করতে পারেন নি সুনীল। ভয় পেয়েছেন, নিজের পরিস্থিতির চিন্তা করেছেন বার বার। তারপর পরীক্ষায় পাশ করে আর কলেজ মুখো হন নি। এখনো মনে মনে শ্যামাকেই ভালোবাসেন। তাই অন্য কাউকে জীবনসঙ্গিনী করার কথা ভাবেন না।




সুনীলের জীবনে এই দুঃসম্পর্কের মামা ছাড়াও অনিতা নামের এক মাসি আছেন। মায়ের কাকার মেয়ে। রানাঘাটে বিয়ে হয়েছে, তখন সুনীল অনেক ছোট।। বাবা-মা চলে যাওয়ার পর মাত্র দুইবার সুনীল মাসির বাড়ি গিয়েছেন। মেসো মশায়ের মস্ত বড় মুদিখানার দোকান আছে। এক মেয়ে রাধিকা সুনীলের থেকে বছর পাঁচেকের ছোট, ও এক ছেলে রবীন্দ্র সুনীলের থেকে বছর তিনেকের ছোট। তারা দুজনেই বড়লোক বাবার সন্তান হওয়ার সুবাদে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছেন। রাধিকা ও রবীন্দ্র গতবছর মামাবাড়িতে পুজোর ছুটিতে ঘুরতে এসেছিলেন। রবীন্দ্র সুনীলের সাথে বন্ধুর মতো মেশেন। তার জীবনের সব কথা সুনীলকে জানান। কখনো চিঠি লিখে, কখনো দেখা হলে। সুনীলকে সে বলেন -- "জানিস দাদা, বাবা আমার ও বোনের বিয়ের জন্য সম্বন্ধ দেখছেন। বলেছেন একই ঘরের ভাইবোনের সঙ্গে আমাদের বিয়ে দেবেন। তাহলে মজার সম্পর্ক হবে।" সুনীল মৃদু হেসে বলেছিলেন-- "ভালো তো, আমাকে নিমন্ত্রণ করতে ভুলিস না কিন্তু।" রবীন্দ্র বলেছিলেন-- "তোকে নিমন্ত্রণ করবো না, তুই কি করে ভাবলি! আমার বিয়েতে তোর অনেক দায়িত্ব।"

রবীন্দ্র বাংলায় এম.এ. পাস করার পর, চাকরির জন্য চেষ্টা না করে, বাবার সঙ্গে মুদিখানা দোকান সামলান। সুনীলের মাসি সুনীলকে অনেকবার তাদের কাছে গিয়ে থাকতে বলেছেন। কিন্তু একমাত্র মামাকে ছেড়ে যেতে সুনীল রাজি হন নি ।



এক বছর পর মামার বাড়িতে মামার নামে একটি বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র ও একটি চিঠি আসে। রবীন্দ্র ও রাধিকার বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র। একই লগ্নে দুই ভাই বোনের বিয়ে। তাই সুনীলের উপর অনেক দায়িত্ব। বিয়ে অবশ্যই মাসির বাড়িতেই হবে। সুনীলকে মামাকে সঙ্গে নিয়ে এক সপ্তাহ আগে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন সুনীলের মাসি। পাঠানো চিঠিতে এই অনুরোধ লিপিবদ্ধ ছিল। বিয়ে মাঘ মাসের চব্বিশ তারিখ, গোধূলি লগ্নে।

বিয়ের এক সপ্তাহ আগে মাসির কথামতো মামাকে নিয়ে রানাঘাটে পৌঁছে যান সুনীল। প্যান্ডেল, লাইট, খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন, ফুল দিয়ে বাড়ি সাজানো, গাড়ি সাজানো, এক কথায় সব কিছুই দায়িত্ব নিয়ে দেখাশোনা করেন সুনীল। ভাই বোনের বিয়ে বলে কথা। সারা বাড়ি আনন্দে, হৈ-হুল্লোড়ে পরিপূর্ণ। রবীন্দ্র ওর বন্ধুদের সঙ্গে সুনীলের পরিচয় করিয়ে দিলেন। রাধিকাও ওর প্রিয় বান্ধবীদের সঙ্গে সুনীলের পরিচয় করিয়ে বললেন -- "বিয়ের দিন কোন সমস্যা হলে, এই দাদাকে দেখে রাখ, ইনাকে বলবি। সব সমস্যা ভ্যানিশ করে দেবেন।"

বিয়ের দিন সারা বাড়ি জুড়ে আনন্দের মধ্যে সুনীলের দুচোখে অশ্রু ধারা দেখা দিল। রবীন্দ্রের চোখে পড়েছিল সুনীলের চোখের জল। সে ভাবল-- 'হঠাৎ দাদার কি হলো ? ওর চোখে জল কেন ?" সুনীল বিয়ের দিনই জানতে পারলেন রবীন্দ্রের বিদিশা সেনগুপ্ত নামের যে মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে, সে আর কেউ নন, সুনীলের একতরফা ব্যর্থ ভালোবাসার সেই শ্যামা ,যার ভাল নাম বিদিশা।

আনন্দের অনুষ্ঠানটি সুনীলের কাছে বিরহের যন্ত্রনায় পরিণত হল। এরকম কত প্রেম পরিণতি পায় না, প্রেমিক অথবা প্রেমিকার নীরবতার জন্য। নিজেকে সামলে নিলেন সুনীল। বিয়ে বাড়ির কারোকে সুনীল জানতেই দিলেন না তার কষ্টের কথা। গোধূলিলগ্নে একই মণ্ডপে ভাই-বোনের বিয়ে হয়ে গেল। সুনীল সব দেখাশুনা করলেন মনের যন্ত্রণাকে চেপে রেখে। রবীন্দ্র সুনীলের সঙ্গে শ্যামার পরিচয় করিয়ে দিলেন। শ্যামা ও রবীন্দ্র সুনীলকে নমস্কার করে আশীর্বাদ নিলেন। সুনীল বুকভরা ব্যথা পুষে রেখে দুজনকে বলেছিলেন-- "তোমরা সুখী হও।" নিজের সুখকে ভাইয়ের হাতে সঁপে দিয়ে বিয়ের পরদিন মামাকে নিয়ে মামার বাড়ীতে ফিরে আসতে চাইলে মাসি সুনীলকে বলেছিলেন-- "তুই ছিলি বলে ভাই-বোনের বিয়েটা এত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হলো। তোর কাছে আমরা ঋণী হয়ে রইলাম। তবে আর দুদিন পরে গেলে পারতিস। বাড়িটা আনন্দে ভরে থাকতো।" সুনীল নীরব থাকেন, তার মাসির কথার কোন উত্তর দেন না। মামা বলেন-- "এতদিন বাড়িতে আমরা নেই। কি হচ্ছে কে জানে। আর নয়, আবার আসব দাদুভাই হলে।" সুনীলের নীরবতা রবীন্দ্রের কাছে ভালো লাগেনি। তিনি বুঝেছিলেন, এমন একটা ঘটনায় দাদা ভুগছেন, যার জন্য এমন প্রতিক্রিয়া। সুনীলের কিছু হয়েছে কিনা রবীন্দ্র জিজ্ঞাসা করায়, তিনি জানান, শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না তার।



সেই দিন তারা গ্রামে ফিরে যান। বার বার সুনীলের চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল টুকটুকে কনের সাজে সজ্জিতা শ্যামার অসাধারণ সুন্দর মুখখানি। সে হাসছে, আর বলছে-- "আবার এসো কিন্তু সুনীল দা।" বারবার চোখের সামনে এই দৃশ্য ভেসে ওঠায়, সে প্রচন্ড কষ্ট পায়। কান্নায় ভেঙে পড়ে চিৎকার করে বিধাতার উদ্দেশ্যে জানান-- "গরীবের স্বপ্ন দেখা পাপ। ভালোবাসা অন্যায়। সেটা প্রকাশ করতে না পারা আরো বেশি অপরাধ। এ ভালোবাসার কোনই মূল্য নেই।"

3 views0 comments