Search

শ্যামাপূজা সংখ্যা ।। ধারাবাহিক ( ধুলোমুঠির গান-৫ )।। অয়ন ঘোষ


ধুলো মুঠির গান

অয়ন ঘোষ



সুখের সওদা করতে গিয়ে তিল তিল করে দূরে ফেলেছি নিতান্ত সরল জরুরী অনুভূতিগুলোকে তাই আমাদের আজ এতো কঠিন সময়। বাউলের ফেলে যাওয়া উদাসী একতারার মতো পড়ে আছে আমাদের যাপন, রিক্ত, হতাশ, নিঃস্ব। Eliot এর কবিতার সেই নগরবাসী ক্ষয়াটে ঘোলাটে চোখের বুড়োগুলোর মতো আধ খোলা জানালার এপারে বসে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছি সামনের ফাঁকা রাস্তার দিকে। পাশাপাশি ইমারত যা ছিল, সেখানেও ওই একই দৃশ্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অনেকক্ষণ থেকে দেখছি সামনের বাড়ির ছাদে গত কালের জমা বৃষ্টির জলে হাপুস হুপুস নাইছে চারটে শালিখ। ছোট বেলায় বৃষ্টি হলেই বন্ধুরা রেলগাড়ি হয়ে ভিজে ভিজে চান করতাম। জানিনা সেই শৈশব আবার আমার উত্তরসূরি পাবে কিনা! কি নির্মম সুন্দর সেজেছে বাইরের পৃথিবীটা, যেনো আমাদের হাত থেকে নিস্তার পায়ে মনের সুখে রঙ ঢেলেছে নিজের সারা শরীরে, সাজিয়েছে তাদেরও, যারা আমাদের নিষ্ঠুরতায় সাজা তো দুর বাইরে বেরোতেই পারত না। নিষেধের পথে এতো রাঙা কৃষ্ণচুড়া যে কবির কল্পনায় গোটা শহরটাই রাধা বলে মনে হচ্ছে। তাই নিশ্চিত জানি যে আসার সে এসেছে, কিন্তু এবারের আসরে আমাকে ডাকেনি সে। না ডাকুক, আমি কিন্তু তৈরি হয়েই আছি, যাতে ডাক একলেই পাল তুলে দিতে পারি। কদিন না ডেকে থাকবে, আজ না হোক কাল তাকে ডাক দিতেই হবে। আমার মতো বেহিসেবী নাগর সে পাবে কোথায়!




একটা ঘাসের চাবড়ার ওপরে বেশ জমিয়ে বসেছি। সামনে রেল লাইনের ওপারে একটা উচু মাটির টিবি। সেটা পেরিয়ে দৃষ্টি নামালে একখানি মজা পুকুর, জল যা আছে তার সবটাই নধর পানার নিচে, আলোবাতাস না পেয়ে তার বোধহয় পরান আইঢাই। কাছে গেলে বেশ বোঝা যায় জিয়ল মাছেদের ভরা সংসার। ওপরে দু চোখে যতটা ধরে, সাজগোজ করে আসর জমিয়ে রেখেছে পানা ফুলের দল। নরম বাতাসে দুলছে তাদের আদুরে শরীর। আমার আর ওই পুকুরের মাঝে এই রেল পথ। ঠিক যেনো দুই স্কুল পালানো বন্ধু। দুজনেরই কথার খই হয়ে ফুটে আছে ভেজা ভেজা পাথুরে অক্ষর। ওরা পণ করেছে যতদূর যাওয়া যায় একসাথে যাবে, যতদিন থাকা যায় একসাথে থাকবে। নাই বা পেলো ইস্কুলের পাঠ, না শিখল চলতি জল হাওয়ার সহবত। এই যে একসাথে চলার ফাঁকে দুজনেই কুড়িয়ে নিচ্ছে কতো রঙিন নিমেষ যার পরতে পরতে লেগে আছে প্রতীক্ষা, রক্ত, ঘাম, প্রবঞ্চনা, শঠতা, অসূয়া আবার নিঃশর্ত ক্ষমা, ভালোবাসা, প্রেম প্রীতি, যাপন সব সব। দুই বন্ধুতে ভারী ভাব, কেউ কাউকে চোখের আড়াল করে না আবার হাত ছোয়া দূরত্বে থাকলেও, কেউ ইচ্ছে মতো কাউকে স্পর্শ করে না, ছোঁয়াছুঁয়ির প্রশ্ন তখনই যখন কোনো বাঁকে এসে দাঁড়ায় বা অন্য খাতে বইয়ে দিতে হবে স্রোত। ভার বইতে বইতে ওদের শরীরে ব্যাথা বাজলেও কোনো মালিন্য ছুঁতে পারেনি ওদের মন। নিশুতি রাতে প্রাণ কাঁপিয়ে হুইসেল বাজিয়ে যখন চলে যায় শেষ ট্রেন পেটের মধ্যে নিয়ে কিছু ঘুমন্ত ঠিকানা আর অপেক্ষা, তারপর শুরু হয় ওদের দিন। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে মুখোমুখি জিরেণ বেলা, গল্পের দুপুররাত। নিম জোৎস্নায় ভিজে টুপটাপ করে হিম ঝরছে মায়া চোখে। ভারী হচ্ছে পাতা, ভেজা আস্তিনে বিজন শোকের ছায়া।




খুব ভালো মতো ওরা দুজনেই জানে এই রাত স্থায়ী না। একটু পরেই মোরগের ডাকে ভোর ভাসিয়ে দেবে তার জাফরানি আলো। সকালের আলস্য কেটে গেলেই, দুপুরের খর তাপ গিলে খাবে এই আয়ুষ্কাল। তখন আবার তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকা অন্য এক ঘুম রাতের দিকে।



অন্তরা -


বাহ রে, আমি বুঝি শুধু ওদেরই দেখব? এদিকে যে আমার পেট ঢু ঢু। সেই কখন নেমেছি তারপর কে যে কোথায় ভিড়লো, কারো কোনো পাত্তা নেই। সামনের সেই মেঘ কন্যে বা বাঁশি হাতে ড্রাইভার তারা সব আমাকে এই চুপ কথার দেশে নামিয়ে দিয়ে বেমালুম বেপাত্তা। শুধু ভেবে ভেবে কারো দিন যায় বলুন। দিদুন বলত, "পেটে না পড়লে ডানা, সব হিসেব কানা"। কি আর করা যাবে এখন, কথায় আছে, 'আপন হাত জগন্নাথ'। দেখি কিছু জোটে কি না, এই ভরা আসরে? বেশি কিছু দাবি নেই। ওই ঝাঁকড়া গাছের নিচে দুটো ইট সাজিয়ে একটা উনুন বানিয়ে নেবো।



চেয়েচিন্তে, একটা মাটির সরা আর অল্প চাল জুটে গেলে আজ রাজা বাদশার ভোজ। কাঠকুটো অঢেল আছে। আগুন তাপে যেই ফুটতে শুরু করল মাধুকরী, গাছে গাছে, লতায় পাতায় ছড়িয়ে গেলো পরমান্নের গন্ধ। গন্ধেই অর্ধেক ভোজ সারা। তারপর আঙ্গট পাতায় ঢেলে দিলাম ঈশ্বরের প্রসাদ। এই অমৃত আয়োজনে এসে জুটল অপেক্ষায় থাকা বন্ধু সুজন। তাই দেখে আর কি দূরে থাকতে পারে, রাজাধিরাজ? তিনিও যথারীতি এসে বসেছেন মাটির আসনে বিনা দ্বিধায়, ভাগ করে নিতে আমাদের গোপন ভালোবাসা। ওই দূরে একটা ডাহুক একটানা ডেকে যাচ্ছে সহজ সুরে ফিরিয়ে দিয়ে সেই অলীক সন্ধ্যে গুলো, আমাদের চড়ুইভাতির ঝিম ঝিম সন্ধ্যে। আগের দিনই গেছে ঘেঁটু সংক্রান্তি। ঘোষ পাড়া, বোস পাড়া ঘুরে, মুঠো মুঠো বা পালি পালির মাপে উপচে পড়েছে আমাদের ঝুলি। পরের দিন মিত্তিরদের বাগানে আমাদের ফিস্টি, ডিমের ঝোল ভাত। উনুন জ্বালতে গিয়ে ধোঁয়ায় ধাঁধা লেগে যাচ্ছে চোখে, হাওয়ায় কাঁপছে কেরোসিন লম্ফ আর ম্যাজিক কিশোরবেলা। অবশেষে রান্না নেমেছে, পাঁচ ছ মাথা গোল করে ঘিরে বসেছে কলাপাতা পেতে। হুপহাপ উরে যাচ্ছে আলোনা ঝাল ঝাল ছেলেমানুষী। মাথার ওপর নির্ভার আকাশ সাক্ষী ছিল সেইসব মুখর সান্ধ্য বাসরের, নেপথ্যে দূর থেকে কেউ বইয়ে দিয়েছে খুলুঞ্চির মিঠে হাতের ঘুম ঘুম বোল, কান থেকে মন মজে এখনো মজে চেনা রাত্রি ভ্যাষ্যে।


(ক্রমশ...)

24 views0 comments