Search

শ্যামাপূজা সংখ্যা ।। ধারাবাহিক ( পরিপ্রেক্ষিত ) ।। ময়ূখ হালদার


পরিপ্রেক্ষিত [পর্ব ৬(ক)]


ম য়ূ খ হা ল দা র


আজ সকালে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ভোররাতে ঘুমানোর ফলে বেশ খানিকটা দেরিতেই ঘুম থেকে উঠলাম। তারপর ফ্রেশ হয়ে যখন পাশের ঘরে গেলাম, দেখলাম- মা গালে হাত রেখে সোফায় ব'সে আছে আর বাবা হাতে সিগারেট নিয়ে পায়চারি করছে। এটা সত্যিই আনইউজুয়াল। জেনারেলি এই সময়টায় সাইট সিইংয়ের এর ব্যাপার না থাকলে ওরা চেয়ার নিয়ে ব্যালকনিতে ব'সে থাকে। অন্তত এই ক'দিনে এটা আমি ভালোমতোই নোটিশ করেছি। কিন্তু আজকে হাওয়া অন্যদিকে বইছে। দু'জনেই রীতিমতো গম্ভীর।




আমি ঘরে ঢুকতেই মা ফোঁস করে উঠলো।

-আমি ভাবতে পারছি না তুমি এতটা নীচে নেমে গেছ!

এরকম একটা কথা দিন শুরু করার জন্য মোটেও শুভ নয়। ইনফ্যাক্ট, এটা সত্যিই আনএক্সপেক্টেড। আমি দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরলাম।

- কী হয়েছে?

মা ঝনঝন ক'রে উঠলো।

-কী হয়েছে! হওয়ার আর কিছু বাকি রেখেছো তুমি!

-আরে কী হয়েছে সেটা তো বলবে?

-ওটা কী?



মায়ের আঙুল টেবিলের ওপর তাক করা। সেখানে আমার কাঁধব্যাগটা বিধ্বস্ত হয়ে প'ড়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে সবকিছু বের করা হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে দুটো রুমাল-একটা গোলাপি আরেকটা ভায়োলেট, টিস্যু পেপার, ল্যাকমের লিপস্টিক সেট, মেইবলিন-এর মাস্কারা, আইলাইনার, চিরুনি, আয়না, দুটো কাঠের রিস্টব্যান্ড- শান্তিনিকেতনি, নিভিয়ার কৌট আর...একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট, কালচে সবুজ রঙের পাতা, শুকিয়ে কাঠ, কুচি কুচি ক'রে কেটে ওটার ভেতর ঢোকানো হয়েছে। কলেজে ইউনিভার্সিটিতে অনেকেই গাঁজা খেত। তাই চিনতে অসুবিধে হলোনা। কিন্তু আমি কোনওদিনই ওই বস্তুটা টেনে দেখিনি। বাট, এই প্যাকেটভর্তি গাঁজা আমার ব্যাগে এল কোত্থেকে! আমি এগিয়ে গিয়ে ওটাকে হাতে নিতেই ঝটকা খেলাম! গাঁজার পাতা তো খুবই হালকা ওয়েট প্রায় থাকে না বললেই চলে। এটা মোস্ট প্রোবাবলি আড়াইশোর প্যাকেট। কিন্তু এত ভারী লাগছে কেন!

-বুঝতে পেরেছো? নাকি আরোও ভেঙে বলতে হবে?

মা ফুটন্ত তেলে মাছ ছাড়লো।

-আহ্! তুমি থামবে? আমাকে দেখতে দাও।

-হ্যাঁ, এবার একটা জুতসই অজুহাত তৈরি করো আর কী!



মায়ের কথাগুলোকে আমি পাত্তা দিলাম না। বাবার পায়চারি থেমে গেছে। এখন এদিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু মুখে কিছু বলছে না। আমি সন্দেহ দুর করতে প্যাকেটটা ছেঁড়ার চেষ্টা করছি।

-কী হচ্ছে আমি তো মাথা মুন্ডু কিস্যু বুঝতে পারছি না! -তোমাকে কিচ্ছু বুঝতে হবে না মা। কারণে-অকারণে সন্দেহ করাটা এবার ছাড়ো। আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি তোমরা আমার সম্পর্কে এমনটা কী ক'রে ভাবলে!

-এই কথাটাই তোর মাকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না।

বাবা উত্তেজিত হয়ে বলল। আমি ততক্ষণে প্যাকেটটা ছিঁড়ে ফেলতেই এক ঝটকায় ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা বুদ্ধমূর্তি। সোনার! 2/3 ইঞ্চির। মা-বাবারও চক্ষু চড়কগাছ! সবার বলতি বন্ধ। বেশ কিছুক্ষণ ধ'রে ওটা নেড়েচেড়ে দেখার পর টেবিলে রেখে দিলাম। ওরাও এখন হাতে নিয়ে দেখছে মূর্তিটা।

-হ্যাঁরে! এটা কী রকম হলো?

-আমিও তো সেটাই ভাবছি মা।

-মূর্তির গায়ে কিছু একটা লেখা আছে মনে হচ্ছে। তবে মানে বোঝা যাচ্ছে না। এটা নিশ্চয়ই অ্যান্টিক পিস। বাবা আমাদের লেখাটা দেখালো। মূর্তির একদম নিচে বাঁদিকে কোনায় খোদাই করা- "Die Lichter!"

-আমার মনে হয় সুভাষকে জানানো উচিত।

-না বাবা। ওকে এসব জানিয়ে কোনও লাভ হবেনা। কোনও হোটেল মালিকই চাইবে না সমস্যায় জড়াতে। আমরা পোলিশ স্টেশন যাবো। মা আঁতকে উঠলো! -ওরে বাবা থানায়! কী দরকার এসব ঝামেলায় যাবার! -সবসময় নেগেটিভ কথা বলো কেন তুমি?

-তিথি তাড়াহুড়ো ক'রে সিদ্ধান্ত নেবার দরকার নেই। আরেকটু ভাবি। দেখি কোনও ওয়ে আউট পাওয়া যায় কিনা।

বাবা আমার কাঁধে হাত রাখলো। মাও ঠোঁট নাড়লো, -সেটাই ভালো। থানা-পুলিশের ঝামেলায় কাজ নেই। তাছাড়া মূর্তিটা তোর ব্যাগে কীভাবে এল, এর উত্তর কী দিবি?

আমি বাকি জিনিসগুলো ব্যাগের ভেতর চালান করতে লাগলাম।

-যেটা সত্যি সেটাই বলবো।



-সেটা পুলিশ বিশ্বাস করবে?

-না করলে কিছু করার নেই। শুধু শুধু মূর্তিটা বয়ে বেড়ানোর কোনও মানে হয়না।

মা আমার হাত চেপে ধরলো।

-বোকার মতো কথা বলিস না। ফালতু হয়রানির মধ্যে কেন যাবি? জানিস না মনমতো জবাব না পেলে কেমন বিহেভ করে পুলিশ!

আমি মায়ের চোখে চোখ রাখলাম।

-ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে রাখবে, প্রশ্ন করবে, তিথি আমরা এখানে ঘুরতে এসেছি। এসব ফালতু ব্যাপারে আমাদের না জড়ালেও চলবে।



আমি ব্যাগটা টেবিল থেকে সরিয়ে খাটের ওপর রাখলাম। মূর্তি আর প্যাকেটটা যেখানে ছিল সেখানেই রইলো। এই আনওয়ান্টেড হ্যাজার্ড কীভাবে সালটানো যায়, ভাবতে ভাবতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। কী ক'রে এল ওটা আমার ব্যাগের ভেতর? আমিতো একবারের জন্যও সেটা কাছছাড়া করিনি। আর এ ব্যাপারে আমি ওভার-স্যাঙ্গুইন। তাহলে? নানারকম ভাবনা দানা বাঁধতে শুরু করলো। কিন্তু কোনও কূল-কিনারা পাওয়া গেল না। আমি ভেতরে ভেতরে অধৈর্য হয়ে উঠছিলাম। এরকমটা কীভাবে সম্ভব! কীভাবে? দুনিয়ার যা কিছু সুন্দর সমস্তকিছুই হঠাৎ ক'রে তেতো হয়ে গেল। টেনশনে আমার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে। তবে কি কোনও হদিস পাওয়া যাবে না? এখন ওই মূর্তিটা নিয়ে কি করা যায়? ওটা এই মুহূর্তে বিষফোঁড়ার মতো চিড়বিড় চিড়বিড় করছে। কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না। আচ্ছা, যদি কাউকে কিছু না জানাই? যদি বাইরে বেরিয়ে চুপচাপ সময়-সুযোগ বুঝে পাহাড়ের খাদের ফেলে দিই? তাহলেই তো ঝামেলা মিটে যায়। কেউ জানতেও পারবে না এবং ওটার সাথে সাথেই সমস্ত প্রশ্ন মুছে যাবে...এরকম একটা ইতিবাচক ভাবনা মাথায় আসতেই আকাশের বুক থেকে সরে যেতে লাগলো মেঘ, নিজেকে হালকা মনে হচ্ছিল আর তখনই মাথায় উঁকি দিল শব্দটা! Die Lichter! আমি বুঝতে পারছি না এটা কোন ভাষায় লেখা।



কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এভাবে হাত কামড়ানোর মানেই হয়না। মোবাইলটা বের করে গুগল সার্চ করলাম। এটা একটা জার্মান শব্দ। দ্য লাইট। প্রোনানসিয়েশন "ডি লিখটা", যার অর্থ আলো। আমি এই শব্দ মূর্তি আর ঘটনার কানেকশন কী হতে পারে সেটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। এই দুনিয়ায় হরবখত কত কী ঘটে চলেছে তার কতটুকুই বা খবর রাখি আমরা। এখানে প্রতিটা রাস্তার বাঁকে লুকিয়ে থাকে বিস্ময়। কখন কীভাবে কার সামনে দাঁত বের ক'রে দাঁড়াবে কেউ জানিনা। যেমনটা আমার সাথে ঘটলো। এই আনসার্টেন ঘটনার জন্য আমি একেবারেই তৈরি ছিলাম না। তাই হঠাৎ করেই কিছুটা ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য হলাম। তবে এটাও ঠিক যে জীবনে যদি কোনও মোচড় না আসে তাহলে তা বড্ড মোনোটোনাস হয়ে যায়। কিছু ন্যাচারাল হ্যাবিটস আমাদের গা-সওয়া যেমন প্রেম-ভালোবাসা-বিয়ে এসব অলমোস্ট সকলের জীবনকে একটা ডেফিনিট সুরে বাঁধতে চায় কিন্তু এইই কি সব? শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দাও পাস করো নতুন ক্লাসে ওঠো- এই আপগ্রেডেশন-এর শেষ কোথায়? একটা রাডিক্যাল ধাঁচের বাইরে আমরা কেউই বেরোতে পারিনা। এটা ভীষণ রিডিকিউলাস। একটা নিশ্চিত সেফ লাইফ সবাই চায়। হয়তো আমিও, হয়তো কেন ডেফিনিটলি চাই। কিন্তু এই নিরাপদ জীবন কি জীবনকে ভার্সেটাইল করে তুলতে পারে?

( ক্রমশ... )

67 views1 comment