Search

শ্যামাপূজা সংখ্যা ।। প্রবন্ধ ( রাম মনোহর লোহিয়া ) ।। ধিরাজ সাউ


রাম মনোহর লোহিয়া : বর্ণ বৈষম্য এর বিরুদ্ধে মতামত ও ভূমিকা ।

ধিরাজ সাউ



রাম মনোহর লোহিয়া ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও তীক্ষ্ণ স্পস্ট বক্তা । যিনি ১৯৬৭ সালে মৃত্যু হওয়ার কয়েক দশক পরেও বিশেষ সমাজতান্ত্রিক নেতাদের মধ্যে পরিগনিত হন । শুধু ডক্টর আম্বেদকর বা মহাত্মা গান্ধী নন । স্বাধীন ভারতের একজন তৃতীয় নেতা রাম মনোহর লোহিয়ার উত্তরাধিকার জাত-পাত অসাম্য বৈষম্য ,সামাজিক ন্যায় বিচারের জন্য উগ্র সংগ্রামের প্রতীকী হিসাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত ।



ডক্টর আম্বেদকর ও ডক্টর রাম মনোহর লোহিয়া ,তাঁরা জীবন কে সম্পূর্ণ ভাবে উৎসর্গ করেছিলেন তৎকালীন সমজস্থ জাতিভিত্তিক অন্যায় ও অসমতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য – একটি ভারতীয় সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে ,যা জনকল্যাণ ও উন্নয়নের দিক নির্দেশ করেছিল । তবে অন্যান্য সমসাময়িক সমাজতান্ত্রিক নেতাদের বিপরীতে ,এটি শ্রেণী নয় যা ডক্টর লোহিয়ার অসমতা সম্পর্কে বোঝার ভিত্তি তৈরি করেছিল – তবে বর্ণ এবং লিঙ্গ তার জন্য ,উল্লেখিত – যে ‘ বর্ণ সুযোগ কে সীমাবদ্ধ করে, সীমিত সুযোগ ক্ষমতা কে সীমাবদ্ধ করে , ও সংকীর্ণ ক্ষমতা সুযোগ কে আরো সীমাবদ্ধ করে থাকে অর্থাৎ যেখানে বর্ণ বিরাজমান সেখানে সুযোগ এবং ক্ষমতা জনগণের চির সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে ।



যেমন , ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পূর্বে এস পি সভাপতি অখিলেশ যাদব ও বি এস পি প্রধান মায়াবতির কাছ থেকে ভারতীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা প্রবল দেখা দিয়ে ছিল এরূপ প্রসঙ্গে জন সাধারণের মনে রাখা দরকার যে কীভাবে রাম মনোহর লোহিয়া সমাজতন্ত্রের সাথে সামাজিক ন্যায় বিচার করে ছিলেন ।



যা লোহিয়ার জীবনের প্রায় ২৩ মার্চ ১৯১০-১২ অক্টবর ১৯৬৭ সাল এই সময়কাল একটি যোগ সূত্র হিসাবে পরিলক্ষিত হয় যা গান্ধী ,আম্বেদকর ও ১৯৬০ সালের পরবর্তীকালের বিশেষ বিষয়াদি ও ঘটনা গুলিকে যুক্ত করে । সমতার লড়াই এর অর্থ অবশ্যই শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম এর মধ্যে আবদ্ধ থাকবে । অসমতার দিক গুলো হল বর্ণ ভীতিকরণ ,ইংরেজি শিক্ষা এবং সম্পদ ।, কেন না ভারতের প্রায় ৯০% এর ও বেশি শাসক শ্রেণীতে সম্পদ ও ইংরেজি শিক্ষার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল । এবং এটি জাত ব্যবস্থার উপাদান হিসেবে যা পুরো পরিস্থিতি কে আসাহীন অপ্রতিরোধ্য করে তোলে ।

নাগরিক অবাধ্যতার গান্ধী ভাবনার প্রভাব ,লোহিয়া কে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করে এবং তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে সমৃদ্ধতর অংশগ্রহণ করে ,এবং ঠিক এই সময় থেকে লোহিয়া স্বাধীন ভাবে আন্দোলনে সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া জন গোষ্ঠী ,নারী, দরিদ্র ,কৃষক ,এবং শ্রমিক শ্রেণী কে সম্প্রিক্ত করতে শুরু করেন এবং তাঁর সামাজিক পরিবর্তন আনার চিন্তা ভাবনার পথ প্রস্তত হয় । জাত বা বর্ণ সম্পর্কে তাঁর চিন্তা চেতনা নিগড়ে রয়েছে তার The Caste System (1964) And Wheel of History (1955) ।,



তবে এক সময় ইংরেজি শিক্ষার ও বর্ণ ,সম্পদ প্রভিতি লোহিয়ার ইংরেজ বিরোধী পদক্ষেপ ও নীতি গুলি ,দলিত বিরোধী হিসাবে পরিলক্ষিত হতে থাকে কারণ দ্বিজা ( Dwija Castes ) জাতির তাঁদের ছেলে মেয়েদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠাতো শিক্ষা লাভের উদ্দেশে , এক কথাই বলতে হলে এটা বলা যায় যে তৎকালীন সম্ববত সকল পরিস্থিতির বিধ্বংসই বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দেশের শাসক শ্রেণীতে পিছিয়ে পড়া এবং নিম্ন বর্ণের একটি সীমিত অংশের উত্থান । পরবর্তীকালে দেখা যায় যখন ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাকে বেসরকারি খাতে বিস্তার লাভের অনুমতি দেয় তখন, লোহিয়ার ‘ হিন্দি হিন্দুস্তানী ‘ প্রচার-অভিযান এখন ‘ হিন্দু, হিন্দি ও হিন্দুস্তানী ‘ হিসাবে ব্যবহার করেছে । এটি মনে করা হয় যে ‘ হিন্দি গর্ব অভিযান – উত্তর ভারতীয় শূদ্র ,ও বি সি ও দলিত বাহিনীর সংখ্যাগরিষ্টতা কে অচল ও অনুন্নত থাকতে বাধ্য করে ছিল তাই লোহিয়া বৈষম্য দুরিকরনের উদ্দেশে ,প্রথম প্রস্তাব করে ছিলেন ‘ আইনি সমতার নীতি ‘ যেখানে আইনের সম্মুখে সকল পুরুষ সমান যা আম্বেদকর এর মতোই বলা হয়েছিল ,এক মানুষ এক ভোট এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্যতার নীতি ।



জয়প্রকাশ নারায়ণ , আচার্য নরেন্দ্র দেব এবং অনন্যাদের. মতো লোহিয়া চেষ্টা করে ছিলেন যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে কংগ্রেস সমাজতান্ত্রিক গঠনের দিকে প্রভাবিত ও পরিচালিত করতে । ও ১৯৪৮ সালে গান্ধির মৃত্যুর পর ,লোহিয়া নেহেরু এবং সর্দার প্যাটেল এর থেকে পৃথক হয়ে দাঁড়ান ,নিজের দল গঠন করেন এবং নানান সামাজিক পরিবর্তন সাধনের উদ্দেশে মনোনিবেস করেন । স্বাধীন ভারতে লোহিয়ার ভিন্ন রাজনীতির রূপ পরিলক্ষিত হতে থাকে তিনি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রিত্ব করার সাথে সাথে সমসাময়িক ভারতের ক্ষমতা ব্যবস্থায় বৈষম্য ,বর্জন এবং শোষণ কে বোঝা বা স্পস্ট দিক নির্দেশ এর খাতিরে একটি বিচ্ছিন্ন্তাবাদি দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে তার অবদান সমৃদ্ধতর । লোহিয়া বলেছিলেন “ দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সমস্ত যুদ্ধ একটি জালিয়াতি, যদি না এটি একই সঙ্গে এই দুটি পৃথকীকরণের বিরুদ্ধে একটি সচেতন এবং টেকসই যুদ্ধ হয় “ । লোহিয়ার মতে, জাতিভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস ব্যবস্থার ধ্বংসসাধন ই গণতন্ত্র কে টিকিয়ে রাখতে পারে ,এবং যা ঠিকই । তিনি তৎকালীন বারানসিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির ওপর বিশেষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ,ঘটনাটি ছিল ২০০ জন ব্রাহ্মণ এর প্রকাশ্যে পা ধোঁয়া বা গোসল করানো ,তখন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ এর সময়কাল ছিল । লোহিয়ার কার্য বা মন্তব্য বলা যেতে পারে ,বিশেষ মন্তব্য গুলো ক্ষমতাপ্রাপ্ত শাসনের প্রতিশ্রুতি পরিমাপ বা তুলে ধরার জন্য মানদন্ড হিসাবে ব্যবহার করা যায় ।

লোহিয়া নিম্ন বর্ণের প্রতি সহাস্নুভুতিসিল ছিলেন । তিনি নিজেই বনিয়া জাত থেকে উঠে এসেছিলেন । কিন্তু তিনি দুর্ভাগ্যবসত কোনও একটি শিক্ষা বেবস্তা পরিকল্পনা করতে পারেননি । যদি তা হত ,তাহলে নিপীড়িত জাতিরা শাসক হতে পারত । তখন শূদ্র রা মূলত সংস্কৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল । লোহিয়া সর্বদা যুক্তি ব্যক্ত করেছেন যে মানুষ কে অবশ্যই সাবেকি বর্ণ নীতি কে উপেক্ষা করে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের একটি নতুন বর্ণের দিকে আগমন করা উচিত এগিয়ে এসে সমাজে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করা উচিত । এবং এটি দলিত,আদিবাসী,সংখ্যা লঘু, নারী,কৃষক, এবং শ্রমিক শ্রেণীর দিকে বিশেষ করে দিক নির্দেশ করেছিল । পরবর্তী কালে লোহিয়ার কারণেই , উত্তর ভারতীয় বহু বনিয়া জাতগুলি ওবিসি তালিকায় নিজেদের তালিকাভুক্ত করে ও মন্ডল আন্দোলন বিজয়ী লাভ করতে শুরু করে । তবে মূলত তার নির্দেশাবলীর মধ্যে বিশেষ উল্লেখিত হল – সংখালঘুদের মধ্যে শূদ্র, দলিত,মহিলা,উপজাতি,দারিদ্র ও নিম্নবর্ণের জন্য ৬০% কোটা ,জাতি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আন্ত জাতি বিবাহ ,গনমুক্ত শিক্ষা ,হিন্দি এবং স্থানীয় ভাষা প্রচার ,ও তার আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক সমাজতন্ত্র ।



বিএসপি প্রতিষ্ঠাতা কাংসিরাম লোহিয়ার ধারণাটির দ্বারা বিশেষ প্রভাবিত ছিলেন । মুলায়ম সিং যাদব এবং এবং শারদ এর প্রচেষ্টা ও অনুসারনে এর কারণের রাজনৈতিক নেতা হিসাবে লোহিয়ার নাম স্পষ্ট পরিস্ফুত হয়ে আছে । কিন্তু তার আম্বেদকর এর সঙ্গে কথপোকথন ও দলিত দের জন্য ,বিশেষ মন্তব্য গুলোকে বর্তমানে প্রায় উপেক্ষিত হতে দেখা যায় ,কেন না উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় – এস পি পার্লামেন্টে এস সি ও এস টি পদোন্নতির যে কথা বলে হচ্ছিল ও তা সংরক্ষনের যে বিল ছিল ,সেই বলের বিরোধিতা করেছিলেন । যা ২০১২ সালে দলিত দের জন্য বিশেষ সম্যসা ও চিন্তার বিষয় ছিল । এছাড়া ২০১০ সালে লোহিয়ার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে রাজনৈতিক ভাষাকার য়গেন্দ্র যাদব উপলব্ধি করেছিলেন যে ,যেভাবে লোহিয়ার উত্তরাধিকার কে দেখা উচিত ঠিক তেমনিভাবে জোর দেওয়া হচ্ছে না বরং উপেক্ষা করা হয়েছে ,এবং পরে তা আম্বেদকর এর জন্মশতবার্ষিকীতে পুনর্জীবিত হতে দেখা গিয়েছে ।


Reference | তথ্য ঋণ

• The author is an LLM student at Harvard Law School. He tweets at @anuragbhaskar_ . anuragbhaskar_

• The fifth volume in the 'Rethinking India Series' by Kancha Illaiah and team explores the marginalised status of Shudra castes.

• A. Kumar, (2010) ‘Understanding Lohia’s Political Sociology: Intersectionality of Caste, Class, Gender and Language

Issue’, in Economic and Political Weekly .

• asiaville.in|remembering-lohia-the-socialist-who-sought-caste-justice-3451

26 views0 comments