Search

শ্যামাপূজা সংখ্যা ।। ভ্রমণ ( দেব দীপাবলি ) ।। শুভজিৎ তোকদার


দেব দীপাবলি @ বেনারস (উত্তরপ্রদেশ)

                                                                                 শুভজিৎ তোকদার

                                                                                                             


দীপাবলি যে অমাবস্যাতে হয় তার ঠিক পরের পূর্ণিমায় অর্থাৎ রাস পূর্ণিমাতে (উত্তর প্রদেশে বলে কার্তিক পূর্ণিমা, বা গুরু নানকের জন্মদিন তিথিতে মনে রাখার সুবিতার্থে) সকল বেনারসবাসী মনে করেন যে স্বয়ং মহাদেব অন্যান্য দেবদেবী সহ গঙ্গায় অবগাহন করেন । তাই সমস্ত ঘাট, ফুল এবং প্রদীপ দিয়ে সাজানো হয় । আলপনা দেওয়া হয় । এই উৎসবের নামই দেব দীপাবলি ।




★★★ দেব দীপাবলি বা ত্রিপুরারি পূর্ণিমা বা কার্তিক পূর্ণিমার পৌরাণিক কাহিনী:


পুরানে তারকাসুরের তিন পুত্র : তারকাক্ষ, কমলাক্ষ ও বিদ্যুন্মালী - এক সঙ্গে ত্রিপুরাসুর বলে পরিচিত। এঁরা ময়-দানব নির্মিত তিনটি বিমাননগরীতে বাস করতেন, যাদের একটি স্বর্ণের, একটি রৌপ্যের ও একটি কৃষ্ণলৌহের। প্রথমটি থাকতো স্বর্গে, দ্বিতীয়টি অন্তরীক্ষে আর তৃতীয়টি পৃথিবীতে। তিন নগরীতে সমস্ত প্রকারের অভিষ্ট বস্তু ছিল। ব্রহ্মার বরে দেব, দানব, যক্ষ, রাক্ষস, কেউই এঁদের বিনষ্ট করতে পারতেন না।



অস্ত্রশস্ত্র বা ব্রহ্মশাপেও এই পুরীগুলির কোনও ক্ষতি করা যেত না। শুধু সহস্র বছর বিচরণ করার পর এই তিনপুর যখন এক হয়ে যাবে তখন যে দেবশ্রেষ্ঠ এক বাণে এই ত্রিপুর ভেদ করতে পারবেন, তিনিই ত্রিপাসুরদের বধ করবেন - এই ছিল ব্রহ্মার বর। এই বর পাবার পর দেবগণ কর্তৃক বিতাড়িত কোটি কোটি দৈত্য তিন পুরীতে আশ্রয় নিতে শুরু করল। আর এই তিন অসুর ইচ্ছানুসারে বিচরণ করে সকলকে উৎপীড়ন করতে লাগলো। তখন ব্রহ্মার উপদেশে তিন পুর একত্র হবার আগে দেবতারা মহাদেবকে তাঁদের অর্ধ তেজ দিলেন। সেই তেজে মহাদেব আরও বলিয়ান হলেন। তারপর সেই তিন পুর একত্র হতেই, মহাদেব পাশুপত অস্ত্র নিক্ষেপ করে ত্রিপুর ধবংস করলেন।


"রাস পূর্ণিমা" বা "কার্তিক পূর্ণিমা"র দিনেই মহাদেব ত্রিপুরাসুরকে বধ করেন তাই রাস পূর্ণিমাকে "ত্রিপুরারি পূর্ণিমা" নামেও অভিহিত করা হয়। কথিত আছে ত্রিপুরাসুর বধের আনন্দে কার্তিক পূর্ণিমার দিনে তেত্রিশ কোটি দেবদেবী বারাণসীর ঘাটে নেমে আসেন এবং দীপাবলি পালন করেন। তাই এই দিনটি "দেব দীপাবলি " নামে খ্যাত।




★★★দেব দীপাবলিতে বেনারস:


বেনারসের শ্রেষ্ঠ উৎসব এই দেব দীপাবলি । এই উৎসব উপলক্ষ্যে সারা ভারত এমনকি সুদূর দক্ষিণ থেকেও লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম হয় বেনারসে ওই দিন । সত্যি বলতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না । হোটেল গুলো একসাথে দুতিনদিনের প্যাকেজ করে নেয় এবং তিন চার গুন ভাড়া বাড়িয়ে দেয় । দেব দীপাবলিতে বেনারস এলে আগে থেকে হোটেল বুক না করে এলে বোকামী । যাইহোক, দেব দীপাবলির দিন দশার্ধমেদ ঘাট রাজেন্দ্র প্রসাদ ঘাট ছাড়াও কেদার ঘাট, অসি ঘাট সহ বিভিন্ন ঘাটে সন্ধ্যা আরতি হয় । এই সন্ধ্যা আরতি অবশ্যই স্পেশ্যাল । বছরের বাকিদিন সাতজন পুরোহিত একসাথে সন্ধ্যা আরতি করলেও এইদিন একসাথে একুশজন পুরোহিত সন্ধ্যা আরতি করে ।




দুপুর দুটো থেকেই সমস্ত ঘাটে ঘাটে মাটির প্রদীপ সাজানো, আল্পনা রঙ্গোলি দেওয়া শুরু হয়ে যায় । সূর্য্য ডোবার সাথে সাথে মাটির প্রদীপ জ্বালানো শুরু হয়ে যায় । একসাথে লাখ লাখ মাটির প্রদীপের সজ্জা । দেখবার মতো সেই জিনিস । সন্ধ্যা থেকে ঘন্টা তিনেক পর্যন্ত মাটির প্রদীপ গুলো জ্বলতে থাকে । এইসময় নৌকাগুলোর ঘাট ভ্রমনের রেট দশ বিশ গুন বেড়ে যায় । এমনকি বিশ হাজার টাকাও হতে দেখেছি, আগে থেকে নৌকা বুকিং করে রাখে অনেকে । ফটোগ্রাফার দের জন্য এই দিনটি একটি আদর্শ দিন ।


★★★এইবছর অর্থাৎ ২০২১ সালের দেব দীপাবলির দিন ১৯ শে নভেম্বর । অসামান্য একটা দিন অবশ্যই ওইদিন বেনারসে কাটান ।


পরিশেষে বলি, বর্তমানে কলকাতা, হাওড়ার গঙ্গার ঘাটে বিশেষ করে রামকৃষ্ণপুর ঘাটে বেনারসের দেব দীপাবলির অনুকরণে প্রদীপ জ্বালানো, সন্ধ্যা আরতি (সন্ধ্যা আরতি সারা বছরই হয়) দেওয়া শুরু হয়েছে স্বল্প পরিসরে ।



21 views0 comments