Search

১৮ই মে সংখ্যা ।। ধারাবাহিক উপন্যাস ।। স্নেহা নাগ


ওজনের ওজন

স্নেহা নাগ


(পর্ব-৩)

"আমি জিজ্ঞেস করছি কার কাজ এটা?" ছাত্র ছাত্রীদের নীরবতা প্রফেসর দাসগুপ্তর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিলে তিন্নি এগিয়ে আসে এবং হাত জোড় করে ছলছল চোখে বলে,


"ছেড়ে দিন স্যার, আমরা সবাই তো বন্ধু। মজা করতে গিয়ে এমনটা হয়ে গেছে।"


তিন্নি যে কাউকে আড়াল করতে চাইছে,সেটা বুঝতে বাকি রইলো না মিস্টার দাসগুপ্তর। তবু সেই মুহূর্তের জন্য তিনি আর কিছু বললেন না শুধু তিন্নিকে উপদেশ দিলেন,



"অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারাটাও একটা আর্ট। পারলে শিখে নিও। কাজে দেবে।"


তারপর তিনি চলে গেলেন। প্রফেসর দাশগুপ্ত হলে মেডিকেল কলেজের সব থেকে ইয়ং এবং রাগী টিচার। ছাত্রী মহলে তার হ্যান্ডসাম লুকের জন্য তিনি যতোটা খ্যাত, ঠিক ততটাই ছাত্র মহলে তিনি পরিচিত তার মেজাজের জন্য। যদিও এই মেজাজ ছেলে মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই সমান। তাই তার সাথে তর্কে কেউ বিশেষ যেতে চায় না। তিনি চলে যাওয়ার পর তিন্নি প্রিয়াকে বলল,



"তুমি এটা কেন করলে প্রিয়া; আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি?"


উত্তরে প্রিয়া চোখ পাকিয়ে, দাঁত চিপে নিচু স্বরে তাকে বলল,


"আমার সাথে লাগতে এলে, এর থেকেও খারাপ হবে। খুব ফার্স্ট সিটে বসার সখ তাই না, নেক্সট টাইম নিজের এই চেহারা নিয়ে সোজা লাস্টে গিয়ে বসবে। কথাটা যেনো মাথায় থাকে।"


এই বলে সে ক্যান্টিন থেকে চলে গেল। একা দাঁড়িয়ে রইলো তিন্নি। তার বাড়িতে কেউ কোনোদিন তার সাথে এভাবে কথা বলেনি। সেখানে কলেজের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়ে দিতে লাগলো, যে পৃথিবীতে নিজের বাড়ির থেকে নিরাপদ স্থান বোধহয় আর কোথাও নেই। খাবার গুলো পড়ে ছিলো নিজের মতো। এই প্রথম তার আর খেতে ইচ্ছে করলো না। তাই ক্যান্টিনের কাকুকে খাবারের বিল মিটিয়ে সেখান থেকে চলে যাবে, তখনই একজন তাকে বলল,


"শুধু শুধু অন্যের রাগ খাবারের ওপর দেখাচ্ছ কেন? তার চেয়ে বরং খেয়ে নাও। এরপরে আমাদের আরো ক্লাস আছে।"


কথাটা শুনে তিন্নি চোখ মুছে জিজ্ঞেস করল,


"তোমার নাম কি?"


উত্তরে সে বলল,


"আমার নাম রূমঝুম। আমিও এখানে নতুন।"



এই প্রথম কেউ তিন্নির সাথে ভালো করে কথা বলল। যে তার ক্ষত বিক্ষত হৃদয়টাকে মোচড় দিয়ে উঠলে সে আবার ফুঁপিয়ে উঠলো। কিন্তু রূমঝুম তাকে সামলে নেয়। তারপর তারা খাবার খেয়ে ক্লাসের জন্য বেরিয়ে পড়ে।


*****


ক্লাসের পর ক্লান্ত তিন্নি তার বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে অবশেষে এসে পৌছালো হোস্টেলের রুমে। প্রথম দিনেই কলেজে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার স্বাদ পেয়েছিলো তিন্নি, তাতে হোস্টেলের অন্যান্যদের কাছ থেকে তার বিশেষ কিছু ভালোর আশা ছিলো না। তাছাড়া বরাবরই সে কম কথা বলে, তাই হোস্টেলে যখন সবাই সবার সাথে পরিচয় করতে ব্যস্ত, তিন্নি নিজের রুমে একা বসেছিলো।


পায়রার খুপরির মতো ছোট একটা রুম, তার দুদিকে দুটো ছোট ছোট চৌকি পাতা আর ঘরের দুই কোন দুটি ভাঙা টেবিল। দেওয়াল থেকে রঙ চোটে গেছে আর তা ঢাকতে কোথাও পেন্সিল দিয়ে কিছু লেখা অথবা সিনেমা আর্টিস্টের ছেড়া ছবি। দেখে বোঝা যাচ্ছিলো যে, এই ঘরের পূর্ব বাসিন্দা যথেচ্ছ অত্যাচার চালিয়েছে এই ঘরে। এসব দেখে তো তিন্নির বুকের ভিতরটা হুহু করে উঠলো। মনে মনে বলতে লাগলো,


"এ কেমন জায়গায় এসে পড়লাম আমি....কি করে থাকবো এখানে..."


সেই সাথে তার রুম মেট কেমন হবে তা ভেবেই তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। যদি সে প্রিয়ার মতো হয়! বা, সেও যদি তিন্নিকে বিরক্ত করে! ইত্যাদি নানান চিন্তায় মগ্ন তিন্নি অসচেতন হয়ে ধপ করে রুমের বাম দিকের চৌকিতে বসে পড়ল আর সাথে সাথে চৌকিটা তার ওজন সইতে না পেরে ক্যাচ ক্যাচ শব্দে আর্তনাদ করতেই সে ভয়ে উঠে পড়ল। তখনই দরজার বাইরে থেকে কেউ বলল,

"হোস্টেলের বেড এইরকমই হয়। ভয় নেই ভাঙবে না।"


পরিচিত স্বর শুনে ফিরে দেখতেই তিন্নি দেখে রূমঝুম দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে তিন্নি একগাল হেসে বলল,


"তুমি এখানে থাকবে? আমার সাথে?"


উত্তরে সে বলল,



"হ্যাঁ, তুমি নোটিশ বোর্ড দেখোনি? ওখানে তো সবার রুম নাম্বার আর রুম পার্টনারের নাম লিস্ট করে দেওয়া আছে...?"


"ও...না গো আমি খেয়াল করিনি। এখানে আসার পর একজন বলল আমার রুম এটা। তাই আমিও দেরি না করে চলে এলাম"


"ও ঠিক আছে।"


তারপর তারা নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে ঘরটিকে নিজেদের মনের মতো করে নিলো। তিন্নির মা বারবার একটাই কথা বলতো,


"যদি হই সুজন, তেঁতুল পাতায় দুজন"


আগে এর মর্মার্থ বুঝতে না পারলেও, রুমঝুমের সঙ্গ পেয়ে তিন্নি এই অর্থ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছিল।


*****


অন্যদিকে বাড়ি ফিরে, নির্বাণ বাবু করার সাথে কথা না বলেই ঘরে ঢুকলেন। নন্দা দেবীর বারংবার প্রশ্ন যেনো তার কানের পাশ কাটিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছিলো। তিনি মুখে রা টুকু না কেটে ঘরের দোর দিলেন। তার মতো রাশভারী মানুষকে কোনোদিন এভাবে মিয়ে যেতে দেখেননি নন্দা দেবী। তাই চিন্তায় ও ভয়ে তিনি তাড়াতাড়ি তার কাছে এলেন এবং দরজার কড়া নেড়ে ডাকতে গেলে বন্ধ দরজা নিজেই খুলে গেলো। তারপর তিনি আস্তে আস্তে ঘরে এসে দেখলেন নির্বাণ বাবু মাথা নীচু করে চেয়ারে বসে আছেন। তিনি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করতেই তিনি মাথা তুলে বললেন,


"আমার ঘরখানা খালি হয়ে গেলো গিন্নী। ছেলে মেয়ের বাবা হওয়া সত্যি খুব কঠিন। তুমি তো পারলে নিজের কষ্টটা চোখ দিয়ে ভাসিয়ে দিতে কিন্তু আমার যে সে অধিকার নেই গো.... আমায় তো মেয়েটাকে একা রেখে সেই শক্ত পাথরের মত করে কঠিন হয়ে চলে আসতে হলো...."



তার দুচোখ দিয়ে অঝোরে নোনা জলের ধারা ছলকে পড়ছে। সকলের সামনে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মনের ভিতরে এই নরম স্তরের সন্ধান তো নন্দা দেবীরও ছিলো না। এই জন্যই বোধহয় বলে, মেয়েরা বাবার প্রাণ ভোমরা হয়।


নন্দা দেবীর নিজেরই মন ভালো ছিলো না, তবু স্বামীকে সামলানোর জন্য তিনি সেই মুহূর্তে নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখলেন, তবু বাঁধ মানলো না তার চোখের জল। অবাধে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। তখনই বুবাই ছুটে এসে ঘরে ঢুকলো, বলল,


"বাপী, বোন ফোন করেছে..."


খবরটা শুনে সজাগ হয়ে চোখের জল মুছে সোজা হয়ে বসলেন দম্পতি আর বুবাই স্পিকারে ফোন টা অন করলো। সাথে সাথে বিপরীত দিক থেকে তিন্নি বলল,


"বাপী কি করছে রে দাদা?"


বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠছিলো উভয় পক্ষের কিন্তু সবাই নিজের মনের চোরা কুঠিরে কান্না লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলছিল। তাই নির্বাণ বাবু বললেন,


"এই তো মা, চা খাচ্ছি। আচ্ছা আজ তোমার দিন কেমন কাটলো? বন্ধু হলো কেউ?"


সকালের তিক্ত অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে শুধু শুধু বাড়ির লোককে চিন্তায় ফেলতে চায়নি তিন্নি, তাই তো জীবনে প্রথম মিথ্যের আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো এবং বলল,


"আমি ভালো আছি বাপী, এখানে সবাই খুব ভালো। তুমি চিন্তা করো না।"


তিন্নি পড়াশোনায় ভালো হতেই পারে, তবে মিথ্যে বলার কৌশল এখনো সে রপ্ত করতে পারেনি। তাই তো তার কথার অপটু মিথ্যেকে চট করে ধরে নিয়ে নির্বাণ বাবু বললেন,


"বাহঃ, আমার মেয়েটা তো একদিনেই অনেক কিছু শিখে গেছে! বাপীকে মিথ্যে বলছে?"


এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলো না তিন্নি। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে বলতে গেলো,


"বাপী....বাপী..."


কিন্তু তার কথা শেষ করতে দিলো না নির্বাণ বাবু। তার আগেই তিনি বললেন,



" থাক মা, তোমায় কিছু বলতে হবে না। আমি জানি কি হয়েছে। তবে তোমায় একটা কথা বলি মন দিয়ে শোনো, আজকাল জীবনে চলতে গেলে মানুষ নিজেদের বেশ কিছু মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে, যাতে অন্যকেউ তাদের দুর্বলতা জানতে না পারে অথবা সে নিজে অন্যের দুর্বলতা প্রত্যক্ষ করতে পারে। এভাবে তারা নিজেদের আসল রূপটাই হারিয়ে ফেলে। তুমি কিন্তু এমনটা করো না মা। তুমি যা, তুমি তাই। নিজেকে কারোর জন্য কোনোদিন বদলাবে না। বরং নিজের নিজস্বতাকে বজায় রেখে নিজের যোগ্যতা প্রমান করবে। হ্যাঁ, কাজটা বেজায় কঠিন। তবে আমি জানি আমার মেয়ে পারবে।"


নির্বাণ বাবুর কথায় অনেকটা ভরসা পেলো তিন্নি। সকালের ঘটনার পর এই জোড়টাই তো তার দরকার ছিলো আগামী দিনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য.....


( ক্রমশ...)



3 views0 comments