Search

১৮ই মে সংখ্যা ।। ধারাবাহিক উপন্যাসিকা ।। শ্যামাপ্রসাদ সরকার


চিরাগনামা


শ্যামাপ্রসাদ সরকার


ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্নাইলাইহে রাজেউউউউউনন...."  বিবিজানের কন্ঠধৃত  উচ্চারণের মনকেমনিয়া সুরটা এতক্ষণে ওর কানে আসতেই আবছায়া আলো আঁধারিতে দাফন্ বাগের অশ্রুধোয়া চাতাল ঢেকে যেতে থাকল।

আসরফী দেখল কখন যেন বিবিজান ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন হাতে একটা মাটির চিরাগ। লুফি বিবিজান আল্লাহ্ শরীফের নামে      অস্ফূটে এবার খানিক  ধন‍্যবাদ দিয়ে মাটিতে ঝুঁকে পড়েছে যেন নামাজ সারতে বসেছেন ।



বিবিজান বললেন যে খবর এসেছে যে পনেরদিন আগে এখনকার নতুন নবাব মীরজাফরের নির্দেশে ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে  প্রাক্তন নবাব মির্জার  মা আমিনা বেগম ও মাসি ঘসেটি বেগমকে কায়দা করে বন্দী রেখেছিল। সবাই বলছে যে অবশেষে তাদের একটি নৌকায় তুলে নৌকাটি ইচ্ছে করে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে দিয়েছে তার পুত্র মীরণ।

দিন তিনেক হল এ মুলুকে এই খবরটা এসেছে। তবে অবাক ব‍্যাপার এই যে ঘটনার অল্প দিন পরে সেই কুচক্রী  মীরণও এক নিদারুণ বজ্রপাতে নিহত হয়েছে।

আসলে খোদার রাজত্বে বসে কেউ যদি জাহান্নামের পাপের আগুন একবার জ্বালায়  তবে তার  নিজেকেও সেই আগুনে একদিন  জ্বালিয়ে দিতে হয়। এটাই বোধহয় দিন-দুনিয়ার খুদা-ই-মালিকের ইচ্ছা।

.....

এতক্ষণে ও বুঝল  এই খবরের কথাটাই  বিবিজান বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। এবার খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বিবিজান ওর কাছে একটা কাজ করে দেবার আর্জি পেশ করল। তখন  আসরফী দেখল যে এই লুফি বেগমের দুটি চোখ এক করুণ অশ্রুস্নানে যেন  ভিজে আছে।

বিবিজান এবারে ওর হাতে একটা নারকেলের খালি হয়ে যাওয়া  মালা ধরিয়ে দিয়ে বলল যে ও যদি দরগাহ্ থেকে কাল একটু সিমাই এই পাত্রে করে এনে  দিতে পারে! কাল মির্জার নামে এই বিবিজান নাকি রসুলের কাছে একটু প্রার্থনা করবে। তাই যদি একটু সিমাই এর সাথে যদি ওর হতভাগ‍্য মির্জার নামে সে  দোয়া চায় তাহলে  বিবিজান  আসরফীর কাছে বড় কৃতজ্ঞ থাকবেন।



এই বিবিজানের কন্ঠস্বরে এমন কিছু একটা  যাদু আছে যা আসরফীও  সহজে অস্বীকার করতে পারেনা। কিন্তু ওর মনে প্রশ্ন জাগল যে  কিন্তু কে এই মির্জা ? বিবিজানের ছেলে? না মরদ? ঠিক কার জন‍্য দোয়া চাইবে বিবিজান?

আসরফীর বুকের ভেতরটা এবারে এক অজানিত আশংকায় ধুকপুক করতে থাকে।

ও তাও বুঝতে পারে তামাম হিন্দুস্তানের সামনে যে ভয়ানক দিনের প্রস্তুতি  যে আজকাল শুরু হয়ে গেছে, এ যেন তারই  রহস‍্য ইঙ্গিতের সাথে আস্তে আস্তে জুড়ে যাচ্ছে, এমনকি সেটা ওর অজানিতেই।

.......                   

কমলিকা অনেকক্ষণ ধরে আজ চুপ করে আছে। সামান‍্য কর্নফ্লেক্স বা দুধ এর কোনওটাই সকাল থেকে গলায় ঢালেনি। খালি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে আর দু একবার " লুফি বিবি" বলে অদৃশ‍্য অথবা কাল্পনিক কাউকে ডেকে তার কাছে  নিজের অগোছালো  মনটাকে সঁপে দিয়ে থম্ মেরে আছে। মাঝেমাঝে ওর এই অস্থিরতাটা  দেখলে মনে হয় যেন কোন  একটা মর্মান্তিক কাহিনীর শেষটুকু শোনার জন‍্য  সমস্ত স্নায়বিক উত্তেজনাটাকে ও যেন নিজের এই সদ‍্য কৈশোরত্তীর্ণ আধারটায় উন্মুখ করে রেখেছে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে গেলেও এই অসমাপ্ত শ্রুতিবেদন কথিকার খোঁজটিকে সে  নিজের কাছে, নিজের মনের মাঝে  আজও সুতীব্র যন্ত্রণার সাথে তুলে রেখেছে।


.....

সিস্টার কাজরী এসে ওকে আদর করে নাম ধরে ডাকেন। কিন্তু সে ডাক কমলিকার কানে এসে পৌঁছায় না। দিন পাঁচেক হল এটা কমলিকার একটা নতুন সিম্পটম্ ধরা পড়েছে, তা হল " ইমোশনাল ইগনোরেন্স "!

ফাদার অতনু  নিজেও দেখতে এসে তার এই অবস্থায় বিশেষ কিছু সুবিধা করে উঠতে পারেন নি।

....

( ক্রমশ...)

9 views0 comments