Search

১৮ ই মে সংখ্যা ।। ধারাবাহিক উপন্যাস ।। সুদীপ ঘোষাল


অজয়পাড়ের উপকথা


সুদীপ ঘোষাল


নবম পর্ব



খেনী চোখের জলে অন্য ঘরে চলে গেলো।তার সংসারের চিন্তায় মন খারাপ হয়ে গেলো।আজ রাতে গান নেই।তাই ছুটি। বাড়িতেই আছে।তবু রাতে বৌ এর কাছে না থেকে বাগানে বাঁশি বাজায় সুমন।তার সুর শুনে খেনীর ভয় হয়।এই আপদ বাঁশি তার সংসার ভেঙ্গে দেবে না তো? এই চিন্তায় খেনী রাত কাটায়। আর সুমন সারা রাত রূপসীকে মনে রেখে বাঁশি বাজায় ক্ষণে ক্ষণে।তারপর রাত পোহালেই চা, মুড়ি খেয়ে বেরিয়ে পরে সুমন।আজ যাত্রা আছে।মীরার বঁধুয়া।মুরা রী বাঁশি মুখে ধরে থাকবে আর আড়াল থেকে বাজবে সুমনের বাঁশি।আজ কৃষ্ণ সাজবে মুরা রী। মীরা মুগ্ধ হবে সুরে।রূপসী আজ মীরা সাজবে।কত লোকে হাততালি দেবে।পুরষ্কার পাবে মুরারী।রূপসী জানে, দলের সবাই জানে বাহাদুর বংশীবাদকের বাহাদু। তবু মুরারী নামের কাঙাল সেজে কপটতা করে।সুমনের তর উপর রাগ হয় না।



কৃপা হয়। রূপসীর পিছন পিছন ঘুর ঘুর করে মুরারী।কিন্তু রূপসীর মন পায় না। রূপসী আড়ালে সুমনকে বলে,ডিম,দুধ খাবে।আমার কাছে আসবে।আমি দেবো।

---আমার বেশি খেলে বদহজম হয়।হাল্কা মুড়ি আমার প্রিয়।

----না না।মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে।

----বেশি খেলে আমার বাজাতে কষ্ট হয়।

----ঠিক আছে।আমার কাছে এসে তুমি যখন বাঁশি বাজাও আমার মনটা কেমন হারিয়ে যায়।

----জানি আমি।তোমার জন্য আমি বাঁশি বাজাই।তুমি আমার বাঁশি শুনলেই হবে।আর কাউকে চাই না।

সুমন বাঁশি বাজানোর সঙ্গে কোনো আপোষ করে না। তাতে না খেয়ে থাকতে হলেও থাকবে।কোনো আপত্তি নেই।অপরদিকে রাবণ অপেরা এদের প্রতিদ্বন্ধি।তারা সুমন কে নিজেদের দলে আনার জন্য নানারকম রাজনীতি করে। কিন্তু সুমন দল ছাড়বে না। মুরারী অপেরায় তার প্রিয়া রূপসী আছে। তাকে ছেড়ে কি করে সে বাঁশি বাজাবে।রাবণ অপেরার ম্যানেজার বললো , তোমার খুব অহংকার। আচ্ছা তোমাকে আমরা দ্বিগুণ টাকা দেবো।আমাদের দলে এসো।

----না আমি পারবো না। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

---আচ্ছা তোমাকে দেখে নেবো।



নিরহঙ্কার সুমনের লোভ নেই। সে সুরে সুরে মহাসুরের সঙ্গে মিলতে চায়।সুমনের ছয় ছেলের মধ্যে এখন শুধু বেঁচে আছে কালো।একবার গ্রামে ওলাউঠা হয়েছিলো।সেই মহামারিতে মরে গেছে সুমনের পাঁচ সন্তান। খেনীর এখন একমাত্র ভরসা এই কালো।সে ভাবে,তাকে মানুষ করতে হবে।বাবার মত বাউন্ডুলে যেনো না হয়।ভাগীদার গণেশ হাজরা জমি দেখাশোনা করে। সুমন ছমাসে,নমাসে একবার বাড়ি আসে। টাকা পয়সা মাঝে মাঝে পাঠায়। এইভাবে সময়ের তালে তালে কালো পড়াশোনা শিখে বড় হতে থাকে।কেতুগ্রামের মেনকা সম্পর্কে খেনীর আত্মীয়।রূপে,গুণে,সংগীতে মেনকার জুড়ি মেলা ভার।পড়াশোনায় তার সমকক্ষ কেউ নেই।মেনকা গ্রামের আপদে বিপদে সকলের আগে এগিয়ে যায়। গ্রামের লোকেরা খুব ভালোবাসে মেয়োটিকে।ক্ষ্যান্তবুড়ি মরে গেলে মেনকা চাঁদা তুলে পাড়ার দাদাদের নিয়ে তার শবদাহ করেছিলো।গ্রামের বয়স্ক লোকেরা তাকে দুহাত তুলে আশীর্বাদ করেছিলেন।মেনকা নিজে একজন স্বাধীনচেতা তরুণী। নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে সমাজের মঙ্গল করাই তার লক্ষ্য।তার জন্য তিলে তিলে নিজেকে সে উপযুক্ত করে তোলে।এই গ্রামে এক সুদখোর লোক ছিলো।গরীবদের কাছে সে দশ শতাংশ হারে সুদ নিত।দেনা শোধ না করতে পারলে জমি জায়গা সোনাদানা কেড়ে নিত।মেনকা এই লোকটাকে দেখতে পারত না। তাকে দেখলেই রাগ হয়ে যেত।জব্দ করার ফন্দি আঁটত দিনরাত।মেনকা কৃষক পরিবারের সন্তান।সে হাঁস পুষত।তার হাঁসগুলো যখন ডানা ঝাপটে জলে নেমে ডুব দিত তখন সেও হাঁস হয়ে ডুব দিত অতল জলে।মক্ত খোঁজার আশায় তার ডুব। ডুবে ডুবে কখনও তার বেলা বয়ে যেত।কিন্তু মুক্ত তার অধরা রয়ে যেত। রাতে সে শিক্ষা নিত চাঁদের বাগানে।তার শিক্ষক বলতেন,চাঁদের বুকে অই যে কালো কালো দাগ দেখছো অইগুলো কলঙ্ক।তবু একটা তৃণ অবধি পৌঁছে যায় তার আলো।কাউকে বাদ দেয় না সে।তিনি মেনকাকে বলতেন, জীবনে যতই বাধা আসুক। এগিয়ে যাবার পথ থেকে সরে আসবে না। একদিন ঠিক সফলতা তোমার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটবে।তারপর সকালে উঠেই মেনকা বই হাতে যায় শিক্ষকের বাড়ি। সঙ্গে ছাগল,ভেড়া, হাঁস।তাদের যথাস্থানে রেখে তারপর শিক্ষকের বাড়ি যায় ।


সুদখোর মহাজন মেনকাকে দেখে বললো,এই সুন্দরী শোন। এদিকে আয়।

মেনকা বলে,কি বলছেন বলুন?

-----একবার দুপুর বেলায় আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে দেখা করিস তো।


( ক্রমশ...)

35 views0 comments