Search

৪ঠা জুন সংখ্যা ।। ধারাবাহিক উপন্যাস ।। স্নেহা নাগ


ওজনের ওজন


চতুর্থ পর্ব


স্নেহা নাগ


পরের দিন তিন্নি নতুন উদ্যমে তার দিন শুরু করল। গত কাল দিনটা খারাপ হলেও সন্ধ্যে টা তার বেশ ভালোই কেটেছিল। রূমঝুম সত্যি খুব ভালো মেয়ে। তার সাথে তিন্নি সময় যে কি ভাবে কেটে গেলো তা বোঝাই গেলো না। তাই পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিন্নির মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেলো। কিন্তু এই মেজাজ বেশিক্ষন স্থায়ী হলো না তার। ঘুম থেকে উঠে রুমের বাইরে পা দিতেই তিন্নির চোখ দুটো কোপালে উঠে গেলো। কারন সকলে কে আগে বাথরুমে যাবে সেই নিয়ে সিনিয়রদের সাথে জুনিয়রদের কুরুক্ষেত্র বেঁধে গেছে। চনের ঘরের সামনে লম্বা লাইন। তিন্নিকে দেখে রূমঝুম বলল,



"কি দেখছো! হোস্টেলে এইরকমই হয়। তাই বেশি না ভেবে জলদি চলো লাইনে দাঁড়াই। না হলে আজ আর চান খাওয়া কিছুই হবে না"


কিন্তু তিন্নি তো কারোর সাথে উঁচু গলায় কথা বলার মেয়েই নয়। তাই বালতি নিয়ে দাঁড়ালেও সিনিয়রদের চোখ রাঙানীতে ভয়ে সে প্রায় কোনঠাসা হয়ে গেলো এবং অবশেষে চান খাওয়া কিছুই হলো না তার। তাই এক প্যাকেট বিস্কুট খেয়েই সে বেরিয়ে পড়ল ক্লাসের উদ্দেশ্যে।


*****



সেদিন প্রথমেই প্রফেসর দাসগুপ্তর ক্লাস। ক্লাসে এসে থেকে সব মেয়েদের মধ্যে গুনগুন শুনতে শুনতে তিন্নির মাথা ধরে গেলো। সবাই ভীষণ এক্সসাইটেড। গতকালের তুলনায় সবাই যেন একটু বেশি সেজে এসেছে। যদিও তিন্নি এসব নিয়ে কোনোদিন বেশি ভাবেনি। তবে গতকাল প্রোফারসর দাসগুপ্ত যেভাবে তার পাশে দাঁড়ালো, তাতে এই অল্প সময় তিন্নির মনের তার প্রতি একটা সুপ্ত অনুভূতির সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে অন্য সকলের মতো তার বহিঃপ্রকাশ না করেই মাথা নামিয়ে একদম শেষ ডেস্কে এসে বসলো। তাই দেখে রূমঝুম বলল,


"কি হলো তিন্নি, শেষে এসে বসলে যে? প্রিয়া তো এখনো আসেনি, তবে....!"


উত্তরে সে বলল,


"না থাক। শুধু শুধু অশান্তি করে কি লাভ বলো। প্রিয়ার তো কিছু হবে না বরং আমারই মান যাবে।"


বলতে বলতেই প্রিয়া এসে হাজির। এই একদিনের মধ্যেই সে নিজের তসামদকারী বেশ কয়েকজনকে জুটিয়ে ফেলেছে। তাই ক্লাস রুমে এসেই তিন্নিকে লাস্টে বসতে দেখে বাঁকা হাসি হেসে প্রিয়া তার এক সঙ্গীকে বলল,


"দেখ দেখ, হাতিটা আজ লাস্টে বসেছে।"


সে কি হাসি তার। তাই দেখে তার বান্ধবী উত্তরে বলল,



"ঠিক কিরেছিস প্রিয়া, যে ওকে টাইট দিয়েছিস। প্রথম দিন খুব উড়ছিলো। আজ মাটিতে এসে গেছে।"


অপরজন বলে,


"ছাড় বাদ দে তো। এই এখুনি প্রফেসর দাসগুপ্ত চলে আসবেন। তাই যে যার নিজের জায়গা নিয়ে নে।"


প্রফেসর দাসগুপ্তর নাম শুনেই প্রিয়ার গালটা কেমন যেনো লাল হয়ে উঠলো। এটা বুঝতে কারোর বাকি ছিল না, যে প্রিয়া প্রথম দিনেই এই আঁতেল মানুষটির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।


যাইহোক বেশ কিছুক্ষনের মধ্যেই প্রফেসর দাসগুপ্ত এসে হাজির। হোয়াইট শার্ট, ব্লু ফিটিং জিন্স সাথে তার রিমলেস ফ্রেম। ক্লাসে ধিকার সাথে সাথেই পুরো পরিবেশটা নিমেষে বদলে গেলো। তার পারফিউমের গন্ধ ইতিমধ্যে অনেকেরই বুকের ভিতর ঝড় তুলে দিয়েছে। সকলের মনের অবস্থা জানা সত্ত্বেও ডক্টর দাসগুপ্তর কিন্তু কোনো হেলদোল নেই। নিজের দেমাকেই তিনি ক্লাস শুরু করলেন। বোর্ডে 'ইন্ট্রোডাকশন' লিখে মার্কারটা হাতে নিয়েই এগিয়ে এসে টেবিলে তেড়ছা করে বসে ক্লাসের উদ্দেশ্যে বললেন,



"তোমরা সকলেই এখানে আমার সামনে বসে আছো তার মানে তোমরা সকলেই নিজের নিজের ফিল্ডে যথেষ্ট যোগ্য। আজ তবে আমি তোমাদের বেশ কিছু প্রশ্ন করবো যা দিয়ে আমাদের মধ্যে আজ থেকেই একটা বন্ডিং তৈরি হবে।


তারপর তিনি একে একে প্রশ্ন করা শুরু করলেন। অনেকে উত্তর দিতে পারলো তো আবার কেউ বোকার মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর তিনি উত্তরের ভিত্তিতে সকলের সকলের স্থান পরিবর্তন করতে শুরু করলেন। উত্তরদাতারা চলে এলো সামনে, আর নিরুত্তর শিক্ষার্থীদের স্থান হলো লাস্টে। এবার ছিলো প্রিয়ার পালা উত্তর দানের। তাকে দেখে প্রফেসর দাসগুপ্ত জিজ্ঞেস করলেন,


"তুমি বলো, মাইনর হার্ট আটকের প্রাথমিক চিকিৎসা কি ?"


প্রশ্ন শুনে তো প্রিয়া যেন আকাশ থেকে পড়ল। বোকার মতো দাঁড়িয়ে বার বার চুল ঠিক করতে লাগলো, এই ভেবে যদি তার রূপে মুগ্ধ হয়ে তিনি তাকে ছাড় দেন। কিন্তু সে গুড়ে বলি। তিনি তেমনটা করলেন না। তারপর একই প্রশ্ন এসে দাঁড়ালো তিন্নির কাছে। সে তো অনেকক্ষন ধরেই উসখুস করছিলো উত্তর দেওয়ার জন্য। তাই সুযোগ পেয়ে সে বিন্দু মাত্র সময় নষ্ট না করে হুরহুর করে উত্তর দিয়ে একগাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। তার উত্তর শুনে ডক্টর দাশগুপ্ত বললেন,


"বাহঃ, একদম সঠিক উত্তর দিয়েছো। তা তুমি ওই কোনে গিয়ে কেন বসেছো? সামনে এগিয়ে এসো।"


তার কথায় প্রিয়া আবার বাঁকা হাসি হেসে মুখ বেকিয়ে  মৃদু স্বরে বলল,


"সামনে বসবে কি করে এমন গতর নিয়ে। হাতি একটা!"


সে ভেবেছিলো তার কথা কারোর কানে যাবে না। কিন্তু সে তখনো ডক্টর দাসগুপ্তকে চেনে নি। তার পঞ্চ ইন্দ্রিয় এতটাই তুখর যে, প্রিয়ার সেই কথা ঠিক তার কানে এসে ধাক্কা মারলো। সেদিন বোধহয়, প্রিয়ার দিনটাই খারাপ ছিলো। তাই তো তার কথার প্রত্যুত্তরে তিনি তিন্নিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,


"আচ্ছা একটা কাজ করো, তুমি মিস প্রিয়ার ডেস্কে এসো, আর প্রিয়া তুমি ওর জায়গায় যাও।"



তার কথা শুনে তো প্রিয়া তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো এবং উঁচু গলায় বলল,


"আমি;আমি বসবো লাস্টে! ওই হাতিটার কোনো যোগ্যতা আছে প্রথমে বসার?"


প্রিয়ার এই বেয়াদবি সহ্য করা ডক্টর দাসগুপ্তর পক্ষে সহজ ছিলো না। তাই তো রেগে গিয়ে তিনি বললেন,


"যোগ্যতা কোনোদিন কোটার দ্বারস্থ হয় না। কিন্তু বাহ্যিক গঠন কোটার শরণাপন্ন হয়। এটা তোমার জানা দরকার মিস প্রিয়া।"


প্রিয়া যে এই কলেজে কোটা থেকে এডমিশন পেয়েছিলি তা জানতে আর কারোর বাকি রইলো না।

তাই আর কথা না বাড়িয়ে সে মাথা নামিয়ে লাস্ট ডেস্কে গিয়ে বসলো আর তিন্নি এলো প্রথমে। সে প্রথমে এলে প্রফেসর দাসগুপ্ত তাকে বলল,


"শোনো, তুমি এবার থেকে এখানেই বসবে।"


তারপর ক্লাস শুরু হলো জোর কদমে। কিন্তু তাতে কি হবে, এই অপমান প্রিয়া ভোলার পাত্রী ছিলো না। তাই তো নিজের মনে তিন্নিকে শায়েস্তা করার জন্য নতুন ফন্দি আটতে শুরু করে দিলো।


*****


প্রথম দিনেই প্রফেসর দাসগুপ্তর সহানুভুতি তাকে তিন্নির মনে অনেক ওপরে তুলে দিয়েছিলো। তারপর আজ যা হলো, তাতে তিন্নি সত্যি তার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু তাই দিয়ে তো আর ওয়েট ভরে না। একেই সকাল থেকে কিছু খাওয়া নেই। তাই ক্লাস শেষ হতে না হতেই তার পেট থেকে গুড়গুড় আওয়াজ হতে শুরু করে দিলো। এখন কি করা যায়! পরের ক্লাসের মাঝে বেশ কিছুক্ষণ সময় বাকি আছে আর এই সুযোগটাই কাজে লাগলো তিন্নি। রুমঝুমকে সাথে নিয়ে সোজা চলে এলো ক্যান্টিনে। কিন্তু তার ভাগ্য খারাপ। ক্যান্টিনে তখনও খাবার রেডি হয়নি। সুতরাং কি করবে ভেবে না পেয়ে সে সোজা কলেজের গেটের দিকে ধাওয়া করলো। যদি কলেজের বাইরে কিছু পাওয়া যায়! এই ভেবে। কিন্তু আবারও সে ভাগ্যের পরিহাসের সামনে পড়ল। কারন পথে প্রফেসর দাসগুপ্তর  মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো তিন্নি। অনেক চেষ্টা করেছিল নিজেকে আড়াল করার কিন্তু তার গঠন তো লুকোনোর জিনিস নয়। তাই তাকে এক ঝলকে চিনে নিয়ে ডক্টর দাসগুপ্ত সোজা এগিয়ে এলেন তাদের দিকে, বললেন,


"তোমরা, কোথায় যাচ্ছ? ক্লাস নেই তোমাদের?"


উত্তরে কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না তিন্নি। শব্দ যেন গলায় এসে আটকে যাচ্ছে তার। তারওপর বুকের ভিতর ধুকপুকানি যেন বেড়ে গেছে। বেশ কিছু সময় কিছু উত্তর না পেয়ে তিনি বললেন,


"কলেজে এসেই পাখনা গজিয়ে গেছে দেখছি, শুরুতে ক্লাস ডুব দিলে ভবিষ্যত অন্ধকার।"


তার কথা শুনে নিমেষে বলে উঠলো তিন্নি,


"না না স্যার। আসলে সকালে কিছু খাওয়া হয়নি। ক্যান্টিনটাও বন্ধ। তাই বাইরে যাচ্ছিলাম কিছু খেতে। খুব খিদে পেয়েছে"


তার উত্তরের সাক্ষী হিসেবে তার পেট বাবাজিও গুড়গুড় করে তাকে সমর্থন করতেই প্রফেসর দাসগুপ্তর হোহো করে হেসে উঠলেন। তারপর অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললেন,


"খিদে পেয়েছে, এসো আমার সাথে।"


বলে তিনি তাদের সঙ্গে করে নিজের কেবিনে নিয়ে আসলেন। অগত্যায় পড়ে তিন্নিও তার পিছু নিলো। তারপর ঠান্ডা রুমে ঢুকে তিনি তাদের বসতে বললেন এবং একটা লাঞ্চ বক্স তিন্নিকে দিয়ে বললেন,


"নাও, খেয়ে নাও।"


এভাবে স্যারের টিফিনে ভাগ বসতে ভীষণ সংকোচ হচ্ছিলো তিন্নির। তাই দেখে তিনি বললেন,


"ডোন্ট হেজিটেট, খেয়ে নাও।"



সম্মতি পেয়ে আর একটুও দেরি করলো না তিন্নি। বক্স খুলে কপকপ করে খেতে লাগলো। তাই দেখে প্রফেসর দাসগুপ্ত বললেন,


"একটা কথা বলছি, মন দিয়ে শোনো; এই পৃথিবীতে কেউ কোনোদিন তোমায় থালায় সাজিয়ে একটা দানাও দেবে না। তোমার যতটুকু প্রাপ্য, তা তোমায় নিজেকে আদায় করে নিতে হবে।"


তার কথা শুনে তিন্নি একটু থমকে গেলো এবং ছলছল চোখে বলল,


"কি করে করবো স্যার। আমি মোটা বলে সবাই আমায় নিয়ে মজা করে। কতো জনের সাথে লড়ব আমি। তাছাড়া আমি তো না খেয়ে থাকতেই পারি না। যে ডায়েট করে ওদের মুখ বন্ধ করে দেব।"


উত্তরে প্রফেসর দাসগুপ্ত বললেন,


"একটা কথা বলবো, শুনবে?"


"হ্যাঁ বলুন।" তিন্নি উত্তর দিলো।


তারপর তিনি বললেন,


"অন্যের জন্য নিজেকে কোনোদিন পাল্টে ফেলো না। সব সময় মনে রাখবে, তুমি নিজেকে যত পাল্টাবে এই দুনিয়া তোমার ততো পাল্টানোর চেষ্টা করে যাবে। তাই পকড়াশোনায় মন দাও। কারন যোগ্যতা কোনোদিন ওজনের বিচার করে না।"


( ক্রমশ...)



1 view0 comments