Search

বইপত্রের আলোচনায় আকাশ সাহা


বইয়ের রিভিউ - নুড়ি পাথরের দিনগুলি।

লেখক- প্রচেত গুপ্ত।

প্রকাশনী - আনন্দ পাবলিশার্স।

দাম- ২০০ টাকা।

আলোচক- আকাশ সাহা।


জীবন আমাদের যেভাবে যেদিকে নিয়ে যায় আমরাও সময়ের সাথে সাথে ঠিক সেভাবেই নিজেদের মানিয়ে চলতে থাকি, তবে সব কি ভুলে থাকা যায়? জীবনের সমস্ত সিদ্ধান্ত কি সবসময় ঠিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়? জীবন কি আমাদের ফাঁকি দিয়ে অন্য কোনো সত্যি মিথ্যের এক পৃথিবীতে মাঝে মাঝে আমাদের একা দাঁড় করিয়ে দেয় না? প্রেম, যৌবন, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, শরীরের আবেগ, মোহ কিংবা চাহিদা এই সমস্ত কিছু ছাপিয়ে বাস্তব কঠিন ও কঠর হয়ে দাঁড়ায় আমাদের সামনে, সমস্ত কিছু গুলিয়ে যায় আমাদের, ঠিক কি করা উচিত মানুষের আর ঠিক কি করলে আজীবন একজন মানুষ সুখে থাকতে পারে এই নিয়ে দ্বিধা কাজ করে ভিতরে, কেউ কেউ সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে কেউ আবার এই গোল বৃত্তে আজীবন ঘুরেই মৃত্যুকে শেষ পর্যন্ত বেছে নেয়।


আহিরী আমাদের মতোই এক সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে যে ভালো পরিবার ভালো বাবা মা ভালো মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠেছে একজন কলেজের প্রফেসর হয়ে ছাত্রদের মানুষ করার দায়িত্ব পেয়েছে, কিন্তু এই উপন্যাসে তার জীবনের ভিতরে ঘটে চলে অজস্র ছোট ছোট কাহিনী তার বাবা কমলেশ রায় একজন নামী সফল চার্টাড অফিসার, একজন ধীর স্থির স্বভাবের মানুষ, তার মেয়ে আহিরী মনে করে তার বাবা জীবনে কখনো কোনো ভুল করতেই পারেন না কিন্তু কমলেশ রায় জানেন তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল আজও তাকে ভিতরে ভিতরে নাড়িয়ে তোলে বারবার, আসলে জীবনের কিছু ভুল আসলে কোনো পরিপূর্ণ করা যায় না, এই সময় হঠাৎ একদিন কমলেশ রায় তারই অফিসের কর্মরত একজন ছেলের সাথে পরিচয় ঘটে, যার নাম সৌহার্দ্য বসু, জানতে পারে তার মায়ের নাম শ্রীকনা বসু, চমকে ওঠে কমলেশের মন, মনে পড়ে যায় জীবনের সমস্ত পুরনো ঘটনা যা কখনো কেউ কোনোদিন জানতে পারে নিই, এদিকে আহিরীর জীবনে ঘটে চলে আর একরকম ঘটনা সে প্রেমে পড়ে বিতান নামে একটি ছেলের যে একজন ফুলটাইম বেকার ছেলে যার নিজেস্ব বাড়ি পর্যন্ত নেই, বন্ধুর ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে, জীবন সম্পর্কে সে যথেচ্ছ উদাসীন, তার বাবা প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন আর নতুন মা ও তার মেয়ে আসার পরে একরকম বিতানকে বাড়ি থেকে বের করে দেন কিন্তু বিতান সব জেনেও আহিরর প্রেমে ক্রমাগত জড়িয়ে পড়তে থাকে, একদিকে জীবনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝামেলা অন্যদিকে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিপর্যয় সমস্ত কিছু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত কি মিল হবে বিতানের সাথে আহিরীর, আর তার বাবার পুরনো কোন সম্পর্কই বা ছিলো সৌহার্দ্যর মা শ্রীকনার সাথে? এসব অজস্র প্রশ্ন ভিড় করে চলে "প্রচেত গুপ্তের" "নুড়ি পাথরের দিনগুলো" উপন্যাসের মধ্যে৷


জীবন কখনো কারুর জন্য থেমে থাকে না তবুও জীবনের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত শেষ অব্ধি আমাদের পুরো জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে উপন্যাসের শেষ দিকে আমরা জানতে পারি কমলেশ রায়ের সাথে শ্রীকনা বসুর প্রেমের সম্পর্ক ছিলো যে প্রেম একদিন ভেঙে দিয়ে কমলেশ রায় বিদেশে চলে গিয়েছিলেন নতুন জীবন শুরু করতে আর শ্রীকনা সারাজীবন এক সাধারণ স্কুল শিক্ষকের মুখ লজ্জা খেয়ে গেলো, তবে তার ছেলে সৌহার্দ্য এসবের প্রতিষোধ নিতে চায়, কিন্তু কমলেশের সেই এক শরীরের রক্ত বইছে তার মেয়ে আহিরীর মধ্যে সেও বাবার মতো একই ভুল করতে যাচ্ছিলো উপন্যাসের একদম শেষ দিকে বিতানকে ছেড়ে দিয়ে অন্য কেউকে বিয়ে করতো কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবাই নিজের জীবনে বয়ে চলা ভুল শুধরে মেয়েকে সঠিক জায়গায় আত্মসমর্পণ করেন, জীবন আসলে এমনই আমরা যা চাই তা কখনো পাইনা কিন্তু ভেবে দেখলে দেখা যায় সুখে থাকার জন্য আহামরি কিছু দরকার হয়না দরকার হয় সৎ সাহস আর দুজনের পরিপূর্ণ ভরসা ও বিশ্বাস, তাহলে কি লেখক সমাজের এই বিশ্বাস সরে যাওয়ার দিকটি আমাদের চোখে আঙুল তুলে ধরিয়ে দিতে চেয়েছেন? নাকি "প্রেমেন্দ্র মিত্রের" সেই "তেলেনাপোতা আবিস্কার" গল্পের মতো আঘাত এনেছেন শহরের উচ্চবিত্ত সমাজের উপর - যারা শুধু প্রেম কর‍তে পারেন কিন্তু মানুষের কাছে কোনো কথা দিয়ে কথা রাখার মতো ক্ষমতা তাদের নেই।


উপন্যাসের শেষে এসে লেখকের একটি অসাধারণ মিলিত উক্তি তুলে দেওয়া যায়-


"একটু পরেই সন্ধে নামবে।

মূর্তি নদীর ধারে পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কমলেশ আর তার বর্তমান স্ত্রী নবনী।আহিরী আর বিতান হানিমুনে গেছে জুলুক। ওরা ট্রেক করবে, ক্যাম্পে থাকবে, বনফায়ার করে মুরগির মাংস খাবে, জীবন যেনো সবার এখানেই পরিপূর্ণ। "


"আনন্দবাজারে রবিবাসরীয়তে" ধারাবাহিকভাবে মোট ১৯ টি অধ্যায়ে প্রচেত গুপ্তের এই উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিলো, গল্প কিংবা প্লট কোনোটাই নতুন না হলেও এই উপন্যাস মানুষের কথা বলে, বলে যায় ভেঙে যাওয়া প্রেম, অভিসম্পাত, দুঃখ, দুর্দশা, বিশ্বাসঘাতকতা আর মূর্তি নদীর পারে দাঁড়ানো নুড়ি পাথর কুড়িয়ে নিয়ে আসা কিছু মানুষের কথা, যে মানুষ হয়তো আমি আপনি কিংবা আপনার পাশে দাঁড়ানো অজানা নাম না জানা কোনো এক একা মানুষ, যে আপনাকে ধরে কাঁদতে চায় কিন্তু কখনোই কাঁদতে পারেনা সমাজ তাকে বারবার অবসন্ন করে তোলে।

8 views0 comments